অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মামলা

২০২৪ সালের ২৩ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে টানা কয়েকদিনের সহিংসতা ও কারফিউর মধ্যে সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও পরিস্থিতি ছিল থমথমে। একদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার, অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং মেসে মেসে তল্লাশি ছিল দিনের আলোচিত ঘটনা। এদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নিয়োগে ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ পদে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদ পূরণ করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সংশোধিত কোটা ব্যবস্থা কার্যকর হয়। তবে কেন্দ্রীয় এ সিদ্ধান্তের মধ্যেও রাজশাহীতে আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেসে অভিযান চালিয়ে তল্লাশি চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎ

অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মামলা

২০২৪ সালের ২৩ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে টানা কয়েকদিনের সহিংসতা ও কারফিউর মধ্যে সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও পরিস্থিতি ছিল থমথমে। একদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার, অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং মেসে মেসে তল্লাশি ছিল দিনের আলোচিত ঘটনা।

এদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নিয়োগে ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ পদে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদ পূরণ করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সংশোধিত কোটা ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

তবে কেন্দ্রীয় এ সিদ্ধান্তের মধ্যেও রাজশাহীতে আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেসে অভিযান চালিয়ে তল্লাশি চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবাসিক হলে ভাঙচুর ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২০ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ।

শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাইয়ুম মিয়া বাদী হয়ে নগরীর মতিহার থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

‘২১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাকে অন্তত আটবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। যেখানেই যেতাম, মনে হতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের খুঁজছে। সামান্য কোনো শব্দ বা নড়াচড়াতেই মনে হতো পুলিশ তল্লাশি করতে এসেছে। সেই দিনগুলোতে ভয় অবশ্যই ছিল, কিন্তু সেই ভয় আমাদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং সহপাঠীদের সাহস ও ঐক্য আমাদের আরও দৃঢ় করেছিল। দিন শেষে উপলব্ধি হয়েছিল, আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাসের অংশ, যেখানে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে অবদান রাখার চেষ্টা করেছি।’

মামলার এজাহার অনুযায়ী আসামিরা হলেন- ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সালাউদ্দিন আম্মার, অর্থনীতি বিভাগের তোফায়েল আহমেদ তপু, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের ফজলে রাব্বি, আরবি বিভাগের মাহাদী হাসান মাহির, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের মাহাদী হাসান মারুফ, সমাজকর্ম বিভাগের মেহেদী হাসান সজিব, দর্শন বিভাগের আশিকুল্লাহ মুহিব, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শাহ পরান, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের দেওয়ান বাঁধন, সিরামিকস বিভাগের তানভীর আহম্মেদ রিদম, অর্থনীতি বিভাগের মনিমুল হক, নেত্রকোনার আবুল কালাম, লোকপ্রশাসন বিভাগের আব্দুল্লাহ আল মেহেদি, অর্থনীতি বিভাগের আল মুহি ফেরদৌস, রসায়ন বিভাগের শাহরিয়ার পলাশ, ফার্মেসি বিভাগের আনারুল, নগরীর মির্জাপুর এলাকার নাইম ও হাসিবুল, বুধপাড়ার হাবিবুর, আশিকুর রহমান ও কাজলার শাহরিয়ার আহমেদসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেকেই।

এদিকে সারাদেশে ষষ্ঠ দিনের মতো ইন্টারনেট সেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে রাতের দিকে সীমিত পরিসরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয়। জরুরি সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ সংযোগ দেওয়া হলেও সাধারণ গ্রাহকদের বেশিরভাগই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেননি।

২৩ জুলাইও সারাদেশে সাধারণ ছুটি বহাল ছিল। কারফিউ অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় সরকার কারফিউ শিথিলের সময় বাড়ায়। তিন দিনের সাধারণ ছুটির পর সীমিত সময়ের জন্য সরকারি অফিস খুলে দেওয়া হয়। আন্তঃজেলা বাস ও লঞ্চ চলাচল আংশিকভাবে শুরু হয়। পাশাপাশি পরদিন ২৪ জুলাই থেকে চার ঘণ্টার জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মামলাকোটা সংস্কার আন্দোলনে রাবির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা/ ছবি: জাগো নিউজ

এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম দাবি উপস্থাপন করে বলেন, দাবি বাস্তবায়ন হলে সংলাপের পথ তৈরি হতে পারে।

দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- অবিলম্বে ইন্টারনেট চালু, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রত্যাহার করে আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে কারফিউর তৃতীয় দিনে রাজশাহী মহানগরীর পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক শান্ত। নগরজুড়ে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহলে ছিলেন। সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, সোনাদীঘি, মালোপাড়া, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট, রাণীবাজার, কুমারপাড়া, আলুপট্টি, তালাইমারি, ভদ্রা, কাজলা, বিনোদপুর, চৌদ্দপাই ও কাটাখালিসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করলেও বাস, ট্রাক ও ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বরং নগরীর কয়েকটি এলাকায় শিশু-কিশোরদের রাস্তায় ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতেও দেখা যায় সেদিন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি চলমান থাকে।

‘সেই সময়ের ঘটনাগুলো এখনো মনে পড়লে শিউরে উঠি। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আমাদের অনেকেই গ্রেফতার, নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছিল। তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসিনি। গণতান্ত্রিক অধিকার ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সেই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।’

তবে কেন্দ্রীয়ভাবে কোটা-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা, তল্লাশি অভিযান এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক উত্তেজনা আন্দোলন-পরবর্তী বাস্তবতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

শিক্ষার্থীরা জানান, কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, ২৩ জুলাইও তার প্রভাব কাটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মেসে মেসে তল্লাশি এবং ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মেস ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান, আবার কেউ কেউ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হননি।

তারা আরও জানান, কোটা নিয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও ক্যাম্পাসে তখনও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসেনি। মেসে তল্লাশি ও মামলার খবরে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও তাদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তখনও কাটেনি।

এ বিষয়ে তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের করা মামলার অন্যতম আসামি আশিকুল্লাহ মুহিব বলেন, মামলার পর থেকেই আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছি। কখন পুলিশ এসে গ্রেফতার করবে, সেই আশঙ্কায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরাও সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন ছিল। একটি মামলার আসামি হয়ে যাওয়ার মানসিক চাপ আমাদের ওপর অনেক বেশি ছিল। পড়াশোনা, পরীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আমাদের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেই সময়ের ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ আজও ভুলতে পারিনি। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ওই সময়টা আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি।

রাজশাহী সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ২১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাকে অন্তত আটবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। যেখানেই যেতাম, মনে হতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের খুঁজছে। সামান্য কোনো শব্দ বা নড়াচড়াতেই মনে হতো পুলিশ তল্লাশি করতে এসেছে। সেই দিনগুলোতে ভয় অবশ্যই ছিল, কিন্তু সেই ভয় আমাদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং সহপাঠীদের সাহস ও ঐক্য আমাদের আরও দৃঢ় করেছিল। দিন শেষে উপলব্ধি হয়েছিল, আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাসের অংশ, যেখানে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে অবদান রাখার চেষ্টা করেছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মানিক মিয়া বলেন, ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রথমে তালাইমারী এলাকার একটি মেসে উঠেছিলাম। কিন্তু সেখানে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়তে থাকায় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাজশাহী নগরীর শিরোইল এলাকায় এক বড় ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নিই। সেখান থেকেই প্রতিদিন আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতাম।

‘মামলার পর থেকেই আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছি। কখন পুলিশ এসে গ্রেফতার করবে, সেই আশঙ্কায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরাও সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন ছিল। একটি মামলার আসামি হয়ে যাওয়ার মানসিক চাপ আমাদের ওপর অনেক বেশি ছিল। পড়াশোনা, পরীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।’

তিনি বলেন, সেই দিনগুলোতে একদিকে যেমন খাবারের কষ্ট ছিল, অন্যদিকে ছিল গ্রেফতার ও তল্লাশির আতঙ্ক। প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটলেও আমরা হাল ছাড়িনি। দেশের স্বার্থে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে গেছি। তবে এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এত ত্যাগ ও সংগ্রামের পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের অনেক কিছুই অধরা রয়ে গেছে। অনেক সময় মনে হয়, ‘যেই লাউ সেই কদু’।

আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ২২ জুলাই র‍্যাবের হাতে আটক হন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক এবং বর্তমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান।

অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মামলা

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাকে খুঁজছিল। কয়েক দফায় তারা আমার বাড়িতে তল্লাশি চালায়। বিষয়টি জানতে পেরে আমি নিরাপত্তার স্বার্থে আগেই বাসা ছেড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিই। সেখান থেকেই আন্দোলনে অংশ নিতে বের হওয়ার সময় রাজশাহী নগরীর চকপাড়া নাদের হাজির মোড় এলাকায় র‍্যাব সদস্যরা আমাকে আটক করেন।

তিনি আরও বলেন, আটকের পর র‍্যাব আন্দোলনের পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, সমন্বয় এবং অন্যান্য গোপন তথ্য জানতে চেয়ে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু আমি কোনো তথ্য দিইনি। পরে তারা আমাকে মতিহার থানায় হস্তান্তর করে। ২৩ জুলাই, আদালতের মাধ্যমে আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমার বিরুদ্ধে দুটি বিস্ফোরক আইনের মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ ১৫ দিন কারাগারে থাকার পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন, ৬ আগস্ট রাত প্রায় ১২টার দিকে আমরা জামিনে মুক্তি পাই।

মেহেদী হাসান বলেন, সেই সময়ের ঘটনাগুলো এখনো মনে পড়লে শিউরে উঠি। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আমাদের অনেকেই গ্রেফতার, নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছিল। তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসিনি। গণতান্ত্রিক অধিকার ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সেই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।

২৩ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ ছিল একদিকে সরকারের কোটা-সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারি, অন্যদিকে আন্দোলন-পরবর্তী দমন-পীড়ন, গ্রেফতার, মামলা ও আতঙ্কের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তখনও ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু সেই দিনের অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই এখনো এক বেদনাদায়ক স্মৃতি।

ফিরে দেখা ২৩ জুলাই ছিল শুধু একটি তারিখ নয়; বরং জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আন্দোলনের গতিপথ, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবন এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।

এনএইচআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow