অপূর্ণ বর্ষা

জি বি এম রুবেল আহম্মেদ বর্ষাকাল। চারদিকে ঘন কালো মেঘের ঘনিভবন। সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ যেন তার সমস্ত সঞ্চিত জল একদিনেই ঢেলে দিতে বদ্ধপরিকর। এদিকে আকাশের কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। সকাল দশটার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে। বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় আধা ঘণ্টার পথ। রেইনকোট গায়ে চাপিয়ে সাড়ে নয়টায় বাইক নিয়ে রওয়ানা হলো সে। রাস্তা ভিজে পিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে তীব্র বজ্রপাত–মনে হয় যেন মাথার ওপরই আকাশ ভেঙে পড়ছে। তবুও দায়িত্ব আর অভ্যাসের টানে এগিয়ে চলা থামে না। আকাশ গাড়ি চালাচ্ছে আর ভাবছে, প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো কলেজ গেটে অপেক্ষা করছে উর্মি। আকাশ ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক, আর উর্মি বাংলা বিভাগের। দুজনই এ বছর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা থেকে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। মাত্র ছয় মাসের পরিচয়–অথচ সেই পরিচয়ের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে গভীর ভালো লাগা। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসায়। বিষয়টি দুই পরিবারই জানে এবং সম্মতিও আছে। এখন শুধু একটি সুন্দর দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার অপেক্ষা–তারপরই শুরু হবে তাদের নতুন জীবনের পথচলা। আরও পড়ুন ফারজানা অনন্যার গল্প: বীজ সেদিন সকালে উর্মি কলেজে যায়নি। আকা

অপূর্ণ বর্ষা

জি বি এম রুবেল আহম্মেদ

বর্ষাকাল। চারদিকে ঘন কালো মেঘের ঘনিভবন। সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ যেন তার সমস্ত সঞ্চিত জল একদিনেই ঢেলে দিতে বদ্ধপরিকর। এদিকে আকাশের কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। সকাল দশটার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে। বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় আধা ঘণ্টার পথ।

রেইনকোট গায়ে চাপিয়ে সাড়ে নয়টায় বাইক নিয়ে রওয়ানা হলো সে। রাস্তা ভিজে পিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে তীব্র বজ্রপাত–মনে হয় যেন মাথার ওপরই আকাশ ভেঙে পড়ছে। তবুও দায়িত্ব আর অভ্যাসের টানে এগিয়ে চলা থামে না।

আকাশ গাড়ি চালাচ্ছে আর ভাবছে, প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো কলেজ গেটে অপেক্ষা করছে উর্মি। আকাশ ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক, আর উর্মি বাংলা বিভাগের। দুজনই এ বছর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা থেকে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। মাত্র ছয় মাসের পরিচয়–অথচ সেই পরিচয়ের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে গভীর ভালো লাগা। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসায়। বিষয়টি দুই পরিবারই জানে এবং সম্মতিও আছে। এখন শুধু একটি সুন্দর দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার অপেক্ষা–তারপরই শুরু হবে তাদের নতুন জীবনের পথচলা।

সেদিন সকালে উর্মি কলেজে যায়নি। আকাশ ভেবেছিল–হয়তো বৃষ্টির জন্য দেরি হচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে কয়েকবার ফোন দিলো। ফোন বন্ধ। একটু অস্বস্তি হলো। দুপুরে খবর এলো, উর্মির বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ক্লাস শেষে ছুটে গেল হাসপাতালে।

হাসপাতালের করিডোরে ভেজা শাড়ি পরে বসে আছে উর্মি। চোখ দুটো লাল। আকাশকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল—‘বাবা খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন দীর্ঘ চিকিৎসা লাগবে।’
আকাশ পাশে বসে বলল—‘চিন্তা করো না। আমি আছি।’
উর্মি মৃদু হেসেছিল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আলো ছিল না।

দিন যেতে লাগল। উর্মি বদলে যেতে লাগল। ফোন কম, কথা কম। একদিন দেখা করে বলল—‘আকাশ, আমি বিয়ে করতে পারব না।’ আকাশ অবাক—‘কেন?’
উর্মি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল—‘আমার সংসার এখন বাবাকে নিয়ে। ছোট দুই বোন। আমি কাউকে বেঁধে রাখতে চাই না। তাছাড়া তুমি জানো আমার ভাই নেই। সংসারের বোঝা আমার ওপর।’
আকাশ অনেক বোঝালেন—‘আমরা একসাথে সামলাব।’
উর্মি মাথা নেড়ে বলল—‘সব ভালোবাসার পরিণতিতে সংসার হয় না। কিছু ভালোবাসা দায়িত্বের কাছে হেরে যায়।’
সেদিনই শেষ দেখা। কয়েক মাস পর উর্মি বদলি নিয়ে নিজ জেলা গাজিপুরে চলে গেল।

বহু বছর কেটে গেছে। এখনো বর্ষার দিনে কলেজে যেতে যেতে আকাশ মাঝে মাঝে গেটের দিকে তাকায়। মনে হয়, ভেজা শাড়ি পরে কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেখানে কেউ থাকে না। শুধু বৃষ্টি ঝরে। খোলা জানালায় বসে সবুজ ঘাসে বৃষ্টি পড়া দেখছে। আজও জানালার পাশে বসে প্রকৃতিতে বৃষ্টির শব্দ শুনছে। হাতে এক কাপ দুধ চা। চায়ের কাপে ধীরে চুমুক দিতে দিতে ভাবে—কিছু গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয় না। তবু একদিন গল্প শেষ হয়ে যায়।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow