অবকাঠামো নির্মাণে গুণগত মান নিশ্চিত করতে অর্থবছর ‘এপ্রিল-মার্চ’ করার প্রস্তাব

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় দেশের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করা, নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়ন এবং সরকারি অর্থ সম্পদের অপচয় রোধে প্রচলিত অর্থবছর বা প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ‘জুলাই-জুন’-এর পরিবর্তে ‘এপ্রিল-মার্চ’ করার যুগোপযোগী এক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ এক বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ১. বাংলাদেশে প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থ (বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা) উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অধীনে বাস্তবায়নের নিমিত্তে বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজে বরাদ্দ থাকে। বর্ণিত উন্নয়ন কার্যক্রম প্রচলিত ‘জুলাই থেকে জুন’ পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়নকাল শুরুতেই ৩ মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এবং শেষে ৩ মাস (এপ্রিল-জুন) প্রচুর মৌসুমী বৃষ্টিপাতের মুখোমুখি হচ্ছে।  ২. উন্নয়ন প্রকল্পের প্ল্যানিং, ডিজাইন, প্রাক-দরপত্র কার্যক্রম, দরপত্র কার্যক্রম, অর্থছাড় ইত্যাদি পেপার ওয়ার্কস কার্যাদি সম্পন্ন করে কাজ শুরু করতেই ৩-৪ মাস লেগে

অবকাঠামো নির্মাণে গুণগত মান নিশ্চিত করতে অর্থবছর ‘এপ্রিল-মার্চ’ করার প্রস্তাব

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় দেশের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করা, নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়ন এবং সরকারি অর্থ সম্পদের অপচয় রোধে প্রচলিত অর্থবছর বা প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ‘জুলাই-জুন’-এর পরিবর্তে ‘এপ্রিল-মার্চ’ করার যুগোপযোগী এক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ এক বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

১. বাংলাদেশে প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থ (বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা) উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অধীনে বাস্তবায়নের নিমিত্তে বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজে বরাদ্দ থাকে। বর্ণিত উন্নয়ন কার্যক্রম প্রচলিত ‘জুলাই থেকে জুন’ পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়নকাল শুরুতেই ৩ মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এবং শেষে ৩ মাস (এপ্রিল-জুন) প্রচুর মৌসুমী বৃষ্টিপাতের মুখোমুখি হচ্ছে। 

২. উন্নয়ন প্রকল্পের প্ল্যানিং, ডিজাইন, প্রাক-দরপত্র কার্যক্রম, দরপত্র কার্যক্রম, অর্থছাড় ইত্যাদি পেপার ওয়ার্কস কার্যাদি সম্পন্ন করে কাজ শুরু করতেই ৩-৪ মাস লেগে যায়। নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পের কাজে পূর্ণ গতি লাভ করে। এভাবে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পেরোতেই আবার এপ্রিলে শুরু হয় বৃষ্টিপাত, যা অর্থ বছরের শেষ অর্থাৎ জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ফলে একদিকে যেমন ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ কাজের সম্ভাবনা দেখা দেয়, অন্যদিকে এডিপি বরাদ্দ অব্যয়িত থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। উপরন্তু কাজ বাস্তবায়নে দুর্নীতির সুযোগও সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো কাজ বাস্তবায়নের চেয়ে এডিপি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, এভাবে প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটের  সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। উল্লেখ্য, নির্মাণ প্রকল্পের সুষ্ঠু ফিনিশিং নিশ্চিতকল্পে অনুকূল আবহাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

৩. গণপূর্ত অধিদপ্তর/জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ মূলত ভবন নির্মাণ ও মেরামত কাজ করে থাকে। অর্থ বছরের শেষ ভাগের বৃষ্টিপাতে ভবনের সুপার-স্ট্রাকচার তথা- ছাদ ঢালাই, ইটের কাজসহ প্লাস্টার, রং, স্যানিটারি-ওয়াটার সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, সীমানা দেয়ালের কাজ ইত্যাদির যথাযথ মান নিশ্চিত করা যায় না। ফলে অসময়ে রং উঠে যায় এবং ভবনে ড্যাম্পনেস সৃষ্টি হয়। এ ধরনের ভবন ব্যবহার স্বাস্থ্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, ড্যাম্পযুক্ত ভবনকে একেবারে ১০০% ড্যাম্পমুক্ত করা কখনো সম্ভব নয়। অতি বৃষ্টিতে টেকসই মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করাও দুরূহ হয়ে পড়ে।

৪. পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হয়। বাঁধ নির্মাণকাজে যথাযথ মাটির ব্যবহার ও যথাযথ কম্পেকশন করা যায় না, ফলে সামান্য পানির চাপে বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ফসলহানিসহ বন্যা দেখা দেয়, পানির নিচে চলে যায় কৃষকের স্বপ্ন! কোথাও কোথাও স্থানীয় জনগণ রাত জেগে বাঁধ পাহারা দেয়। আধুনিক বিশ্বে রাত জেগে বাঁধ পাহারা দেওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়কও বটে! এছাড়া এপ্রিল-জুন মাসে ভরপুর বর্ষায় শহর রক্ষা বাঁধের মেরামত কাজও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং থাকে। 

৫. ‘জুলাই-জুন’ অর্থ বছরের এর শেষ ভাগের মৌসুমী বৃষ্টিপাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার যথাযথ মান নিশ্চিত করা যায় না, কার্পেটিং এ ব্যবহৃত বিটুমিনের শত্রু হলো পানি। কাজেই বৃষ্টিপাতে নির্মিত রাস্তার বিটুমিন খুব দ্রুতই বন্ডিং ছেড়ে দেয়। এছাড়া রাস্তার বিভিন্ন স্তর বা লেয়ারে যথাযথ রোলিং ও  কম্পেকশন নিশ্চিত করা যায় না। ফলে এডিপি বাস্তবায়ন শ্লথ হয়, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। বৃষ্টিপাতে আরসিসি রাস্তা কিংবা ব্রিজ-কালভার্ট কাজের ঢালাইয়ের মানও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

৬. স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি’র আওতাধীন রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, বাঁধ, ভবন ইত্যাদি নির্মাণ কার্যও বৃষ্টির থাবা থেকে মুক্ত নয়। অর্থ বছরে নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪ মাস নির্মাণবান্ধব সময়। অন্য সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়ায় যেমনি কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি টেকসই নির্মাণকাজও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে এলজিইডি’র মতো প্রতিষ্ঠানের বিশাল বাজেটের নির্মাণ কার্যাদিও অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃতির গতি-প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে।

৭. অন্যদিকে বিশ্বে বহু দেশে আবহাওয়া ও জলবায়ু অনুকূল বিবেচনায় ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ পর্যন্ত অর্থ বছর চালু রয়েছে। জাপান, যুক্তরাজ্য, ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দেশগুলো ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ অর্থবছর ব্যবহার করে। এছাড়া জাইকাসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী অর্থ বছর হিসেবে ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ অনুসরণ করে। আইএমএফ ‘মে থেকে এপ্রিল’ পর্যন্ত অর্থ বছর অনুসরণ করে থাকে। কাজেই, এসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালেও আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশের সহায়তা পেয়ে থাকে।

৮. ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ অর্থবছর ব্যবস্থায় প্রথম ৩ মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক পেপার ওয়ার্কস ও দরপত্র কার্যাদি শেষে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের মোবিলাইজেশন সম্পন্ন করে অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু করা সম্ভব। বলা বাহুল্য অর্থ বছরের শেষ অর্থাৎ মার্চ পর্যন্ত একই গতি নিশ্চিত করে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। শুকনো মৌসুমে নির্মাণ প্রকল্পের সব স্তরের কাজসহ ফিনিশিং কাজের প্রকৌশলগত চাহিদা এবং গুণগত মানও যথাযথভাবে নিশ্চিত করে টেকসই নির্মাণকাজ সম্ভব। একইসঙ্গে কাজের লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতিও অর্জন করা সহজ হয়। 

৯. ‘জুলাই থেকে জুন’ অর্থ বছরে কার্যকর ও অনুকূল নির্মাণ সময় ৪/৫ মাস, অন্যদিকে ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ অর্থ বছরে এ সময় ৬/৭ মাস। কাজেই টেকসই ও মানসম্পন্ন এডিপি বাস্তবায়নে ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ সময়কালই বাংলাদেশের জন্য অধিকতর উপযোগী। উল্লেখ্য, অনুকূল আবহাওয়ায় গুণগত মানসহ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে প্রকল্পের মেরামত ব্যয়ও বহুলাংশে সাশ্রয় হয়।

১০. এপ্রিল-মার্চ চক্রে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এতে পুরো একটি জলবায়ু চক্র কভার হয়, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও বাস্তবসম্মত হয়। বর্ষা শেষে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে বাধাহীনভাবে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া যায় এবং মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার সুযোগ থাকে। মাঝপথে মৌসুমী বাধার কারণে কাজ থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

১১. চ্যালেঞ্জ: প্রকল্প বাস্তবায়নকাল পরিবর্তন করতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে, যেমন:  

   - সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়
   - প্রাথমিক দিকে অর্থবছর ও প্রকল্প বাস্তবায়নকাল  হিসাব-নিকাশের জটিলতা
   - জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যস্ততার পরিবর্তন
   - বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সমন্বয়
   - এপ্রিল-মার্চ পর্যন্ত ৪ কিস্তি অর্থ ছাড়ে IBAS++ সিস্টেম সমন্বয় সাধন
   - প্রথম বছর সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি)-তে মার্চ মাস পর্যন্ত  প্রকল্প বাস্তবায়নকাল দেখাতে হবে

১২. সামগ্রিকভাবে, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করে জাতীয় বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর করার জন্য ‘এপ্রিল থেকে মার্চ’ সময়কাল চালু করা একটি অতি যুগোপযোগী উদ্যোগ হতে পারে। এতে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারের পাশাপাশি জনগণ দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল ভোগ করতে পারবে। এছাড়া একাধারে এডিপি বাস্তবায়ন হার বাড়বে, আবহাওয়াজনিত ‘রিস্ক’ কমবে এবং দুর্নীতির সুযোগ হ্রাস পাবে।

১৩. এপ্রিল-মার্চ মাসভিত্তিক এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল পরিবীক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হতে পরিবেক্ষণ সেল পরিচালনা করা যেতে পারে।

লেখা: মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অব.), গণপূর্ত অধিদপ্তর।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow