অরাজকতার দুষ্টচক্র: সমাজে দুর্নীতি, ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান
কোনো দেশে যদি সুশাসন দুর্বল হয়, আইনের শাসন কার্যকর না থাকে এবং দুর্নীতি ও ঘুষ সামাজিক ও প্রশাসনিক নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি ‘অনিয়মের সংস্কৃতি’ (Culture of Illegality) গড়ে উঠতে পারে। এতে সৎ ও নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তিরা অসুবিধায় পড়েন, আর অনিয়মকারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হন। ফলে তাদের প্রভাব, সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক চিন্তাবিদ ও গবেষক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, এটি শুধু দুর্নীতির বিস্তার নয়; বরং অরাজকতা থেকে লাভবান হওয়া একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান। আমরা সাধারণত মনে করি, অরাজকতা, দুর্নীতি ও আইনের শাসনের দুর্বলতা একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার লক্ষণ। ধারণাটি আংশিকভাবে সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীরে গেলে দেখা যায়, অরাজকতা সব সময় কেবল ব্যর্থতার ফল নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক পরিবেশও সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, যেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ন্যায়বিচারের সংকটে ভোগে, সেখানে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি একই পরিস্থিতি থেকে সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক
কোনো দেশে যদি সুশাসন দুর্বল হয়, আইনের শাসন কার্যকর না থাকে এবং দুর্নীতি ও ঘুষ সামাজিক ও প্রশাসনিক নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি ‘অনিয়মের সংস্কৃতি’ (Culture of Illegality) গড়ে উঠতে পারে। এতে সৎ ও নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তিরা অসুবিধায় পড়েন, আর অনিয়মকারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হন। ফলে তাদের প্রভাব, সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক চিন্তাবিদ ও গবেষক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, এটি শুধু দুর্নীতির বিস্তার নয়; বরং অরাজকতা থেকে লাভবান হওয়া একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান।
আমরা সাধারণত মনে করি, অরাজকতা, দুর্নীতি ও আইনের শাসনের দুর্বলতা একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার লক্ষণ। ধারণাটি আংশিকভাবে সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীরে গেলে দেখা যায়, অরাজকতা সব সময় কেবল ব্যর্থতার ফল নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক পরিবেশও সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, যেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ন্যায়বিচারের সংকটে ভোগে, সেখানে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি একই পরিস্থিতি থেকে সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাব অর্জন করে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের প্রবণতা বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়। তবে এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। ইতিহাসে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ, আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশেও একই ধরনের প্রক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। তাই অরাজকতার সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
সুশাসনের অবক্ষয় ও অনিয়মের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
কোনো রাষ্ট্রে অনিয়ম একদিনে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। প্রথমে আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা দেয়। এরপর নিয়মভঙ্গকারীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে শুরু করে। কিছুদিন পর ঘুষ ও প্রভাবের ব্যবহার ব্যতিক্রম নয়, বরং ‘কাজের স্বাভাবিক নিয়ম’ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পর্যায়ে Patron–Client Network বা পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যক্তির দক্ষতা বা যোগ্যতার পরিবর্তে তার রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার নেটওয়ার্কও শক্তিশালী হতে থাকে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, মধ্যস্থতা কিংবা ঘুষকে বেশি কার্যকর মনে করে। এটি কেবল ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতার ফল নয়; বরং দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতির প্রতিফলন।
অরাজকতার উদ্যোক্তা (Entrepreneurs of Disorder)
অরাজকতা নিজে নিজে স্থায়ী হয় না। এর সঙ্গে এমন কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী যুক্ত থাকে, যারা এই পরিস্থিতি থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লাভবান হয়। এদের ‘অরাজকতার উদ্যোক্তা’ (Entrepreneurs of Disorder) বলা যেতে পারে।
সুশাসনের সংগ্রাম কেবল ঘুষবিরোধী অভিযান কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তির নয়, আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; আনুগত্য নয়, যোগ্যতা মূল্য পাবে; এবং রাষ্ট্রের দুর্বলতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হয়ে উঠবে না। একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে, যখন সুশাসন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
এই গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগী, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অবৈধ অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ চক্র, ভূমিদস্যু, কালোবাজারি, পাচারকারী এবং প্রভাবশালী অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তারা সাধারণত দুর্বল আইনব্যবস্থা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সীমিত জবাবদিহিকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করে।
তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তারা বিশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ দূর করতে চায় না। কারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ ও স্বচ্ছ পরিবেশে তাদের অতিরিক্ত সুবিধা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তারা এমন একটি পরিস্থিতি বজায় রাখতে আগ্রহী, যেখানে আইন আংশিক কার্যকর, প্রতিষ্ঠান আংশিক সক্ষম এবং নিয়মের প্রয়োগ নির্বাচিতভাবে হয়। সেখানে অরাজকতা তাদের কাছে কোনো সংকট নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
অনিয়ম থেকে ক্ষমতার উত্থান
দুর্নীতি কখনো শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে ক্ষমতার উৎসে পরিণত হয়। প্রথমে অবৈধ সুবিধার মাধ্যমে সম্পদ অর্জিত হয়। এরপর সেই সম্পদ ব্যবহার করে সামাজিক প্রভাব তৈরি হয়। সামাজিক প্রভাব রাজনৈতিক যোগাযোগ সৃষ্টি করে, আর রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করে। এভাবেই গড়ে ওঠে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতার চক্র।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন যোগ্য ও সৎ মানুষ। কারণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আর সমান থাকে না। যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য, সততার পরিবর্তে সুবিধাবাদ এবং নীতির পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি মূল্য পেতে থাকে। সমাজবিজ্ঞানে এটিকে Negative Selection বলা হয়—যেখানে সবচেয়ে যোগ্য মানুষ নয়, বরং ব্যবস্থাকে সবচেয়ে দক্ষভাবে অপব্যবহার করতে সক্ষম ব্যক্তিরাই ধীরে ধীরে নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে আসেন। ফলে রাষ্ট্রে দক্ষ নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিখ্যাত চিন্তাবিদদের ধারণা
সমাজে অরাজকতা থেকে লাভবান একটি শ্রেণির উত্থানের ধারণা নতুন নয়; ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বহু চিন্তাবিদ তাঁদের তত্ত্বে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
প্লেটো তাঁর The Republic গ্রন্থে লিখেছেন, যখন রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অযোগ্য ও অসৎ ব্যক্তিরা ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ করে এবং রাষ্ট্র ক্রমে অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়।
অ্যারিস্টটল Politics গ্রন্থে বলেছেন, যখন শাসকগোষ্ঠী জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন রাষ্ট্রের সুস্থ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি Discourses on Livy গ্রন্থে corruption–কে এমন একটি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে নাগরিক গুণাবলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। তখন আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা ক্রমশ কমে যায়।
থমাস হবস Leviathan গ্রন্থে বলেছেন, শক্তিশালী ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকলে মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত বৃদ্ধি পাবে।
ডগলাস নর্থ তাঁর Institutions, Institutional Change and Economic Performance গ্রন্থে দেখিয়েছেন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়ম Extractive Institutions সৃষ্টি করে, যেখানে উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবান ও সুযোগসন্ধানীরাই বেশি লাভবান হয়।
ড্যারন অ্যাসেমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন তাঁদের বিখ্যাত গ্রন্থ Why Nations Fail–এ দেখিয়েছেন, Extractive Institutions এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে আইন ও রাষ্ট্রক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। এর ফলে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান ঘটে, আর মেধাবী ও উৎপাদনশীল মানুষ পিছিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে আন্তোনিও গ্রামশি–র মতে, কোনো গোষ্ঠী শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ ঘুষ, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতিকে ‘এভাবেই চলে’—এই ধারণার মাধ্যমে সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলাও এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য।
বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন চিন্তাবিদ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করলেও তাঁদের বিশ্লেষণের মূল সুর একটিই—যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আইনের শাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যারা সেই দুর্বল ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার মধ্যেই নিজেদের স্বার্থ খুঁজে পায়।
কেন এই গোষ্ঠী সুশাসন চায় না?
অরাজকতা থেকে লাভবান শ্রেণির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তারা মৌলিক সংস্কারের বিরোধিতা করে, যদিও প্রকাশ্যে তারা সংস্কারের পক্ষেই কথা বলতে পারে। এর কারণ খুবই সহজ। স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অতিরিক্ত সুবিধা কমে যায়। তাই তারা প্রায়ই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ধীর করে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় অথবা এমন পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেয়, যা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে না।
ইতিহাসে রাশিয়ার ১৯৯০-এর দশকের অলিগার্কদের উত্থান দেখায়, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে অল্প কয়েকজনের হাতে বিপুল সম্পদ ও প্রভাব কেন্দ্রীভূত করতে পারে। একইভাবে ইতালির কিছু অঞ্চলে মাফিয়া নেটওয়ার্ক বহু বছর ধরে দুর্বল স্থানীয় প্রশাসন এবং ভয়ের সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে সমান্তরাল ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তুলেছিল। আবার নাইজেরিয়ার তেলসমৃদ্ধ কিছু অঞ্চলে সম্পদ, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং দুর্নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, অরাজকতা কেবল সামাজিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি অনেক সময় একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অরাজকতা থেকে লাভবান শ্রেণি
১. ব্যাংকিং খাত:
দেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্বল তদারকি, অস্বচ্ছ ঋণ অনুমোদন এবং প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা অর্জনের প্রবণতা বহু বছর ধরেই আলোচিত। খেলাপি ঋণ, সম্পদের একচেটিয়া দখল (Capture of Resources) এবং আর্থিক প্রভাব বিস্তার—এসবকে অরাজকতা থেকে লাভবান হওয়ার (Disorder Beneficiaries) উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
২. বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি (২০১৬):
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা শুধু একটি সাইবার অপরাধ ছিল না; এটি দেশের আর্থিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরও ঘটনাটি বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
৩. বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য:
সিন্ডিকেটের প্রভাব শুধু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা যখন বাজার, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। সিন্ডিকেট তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন বারবার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় অথবা একই ধরনের অভিযোগ বছরের পর বছর পুনরাবৃত্তি ঘটে। এতে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সিন্ডিকেট সাধারণত অস্বচ্ছ লেনদেন, প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের চেষ্টা করে। এর ফলে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে এবং সুশাসন আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অরাজকতার দুষ্টচক্র (Vicious Cycle)
দুর্বল প্রতিষ্ঠান → দুর্নীতির বিস্তার → অনিয়মের স্বাভাবিকীকরণ → অনিয়মকারীদের উত্থান → ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ → সুশাসনের আরও অবক্ষয় → আরও দুর্নীতি ও অরাজকতা
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট সব সময় দুর্নীতি নয়; বরং সেই পরিস্থিতি, যখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অরাজকতা একটি নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্ম দেয় এবং সেই শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখে। তখন রাষ্ট্রের সমস্যা আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকে না; বরং তা একটি কাঠামোগত রাজনৈতিক অর্থনীতিতে রূপ নেয়।
সুতরাং সুশাসনের সংগ্রাম কেবল ঘুষবিরোধী অভিযান কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তির নয়, আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; আনুগত্য নয়, যোগ্যতা মূল্য পাবে; এবং রাষ্ট্রের দুর্বলতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হয়ে উঠবে না। একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে, যখন সুশাসন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
লেখক: বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (বাইউস্ট)-এর রেজিস্ট্রার ও খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি।
কেএইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?