অর্থনৈতিক সুফল দৃশ্যমান নয়, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় বড় উদ্বেগ
‘কাঠামোগত পরিবর্তন রাতারাতি হয় না, এর জন্য সময় প্রয়োজন। ছয় মাস তাই চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এই সময়ের কার্যক্রম, অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করলে আমি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে মিশ্র ফলাফলের সময় হিসেবেই মূল্যায়ন করবো।’ সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি। সরকারের প্রথম ছয় মাসকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ছয় মাস গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশি সময় নয়। তাই এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কিছুটা আগেভাগেই হয়ে যাবে। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে আমি মিশ্র ফলাফলের সময় হিসেবে মূল্যায়ন করবো। আরও পড়ুন জনপ্রশাসন সংস্কার / অন্তর্বর্তী সরকার পারেনি, এখন বিএনপিও ‘নীরব’ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমেছে। নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও পুনরায় শুরু হয়েছে। সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর
‘কাঠামোগত পরিবর্তন রাতারাতি হয় না, এর জন্য সময় প্রয়োজন। ছয় মাস তাই চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এই সময়ের কার্যক্রম, অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করলে আমি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে মিশ্র ফলাফলের সময় হিসেবেই মূল্যায়ন করবো।’
সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
সরকারের প্রথম ছয় মাসকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ছয় মাস গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশি সময় নয়। তাই এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কিছুটা আগেভাগেই হয়ে যাবে। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে আমি মিশ্র ফলাফলের সময় হিসেবে মূল্যায়ন করবো।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমেছে। নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও পুনরায় শুরু হয়েছে। সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এসব উদ্যোগের সুফল কি এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হয়েছে?
এখনো সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ। বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারও কম এবং প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়
এখনো সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ। বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারও কম এবং প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ব্যবসার উচ্চ ব্যয় ও দুর্বল রাজস্ব আহরণ এখনো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা কঠিন হবে।

ছয় মাসে সরকার ভিন্ন কিছু দেখাতে পারেনি
অর্থনীতির বাইরে সরকারের প্রতি মানুষের কোন ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে?
সুশাসন, জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। নির্বাচনের পর মানুষ শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখতে চায়। জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারের পরবর্তী অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। পাশাপাশি ব্যবসার আস্থা পুনরুদ্ধার করা। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও গ্যাসের সংকট, ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতির অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
সরকারকে তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাতকে সচল করার দিকে নজর দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নিয়ে ভালো ও উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে।
শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসার ব্যয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও অবকাঠামোয় কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করার অর্থ শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়; বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়- এই চার ক্ষেত্রেই গতি ফিরিয়ে আনা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতে সরকারের কৌশল কী হওয়া উচিত?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু উচ্চ সুদের হার বা কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ খাদ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রয়োজন সমন্বিত মুদ্রা, রাজস্ব ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নীতি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু উচ্চ সুদের হার বা কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ খাদ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রয়োজন সমন্বিত মুদ্রা, রাজস্ব ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংককে মূল্যস্ফীতি স্থায়ীভাবে কমার সুস্পষ্ট লক্ষণ না পাওয়া পর্যন্ত সতর্ক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিনিময় হারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি করা পণ্যের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। তবে চাহিদা সংকোচনের পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা না নিলে উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় পণ্যের সময়মতো আমদানি, শুল্ক-কর সাময়িকভাবে সমন্বয় ও বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক নজরদারি প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির বোঝা যেন শুধু ভোক্তা ও উৎপাদনশীল ব্যবসার ওপর না পড়ে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানি, যা নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ফেরাতে কী করা উচিত?
রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। তবে শুধু নগদ প্রণোদনা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্যয় কমানো, অর্থায়ন সহজ করা এবং নতুন বাজার ও পণ্যে প্রবেশে সহায়তা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। তবে শুধু নগদ প্রণোদনা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্যয় কমানো, অর্থায়ন সহজ করা এবং নতুন বাজার ও পণ্যে প্রবেশে সহায়তা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকরী মূলধন ও ট্রেড ফাইন্যান্স সহজলভ্য করতে হবে। বন্দর ও কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করলে ব্যবসার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কর ও ভ্যাট ফেরত দ্রুত দেওয়া এবং নীতিগত পরিবর্তনে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও জুতা, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, আইসিটিসহ অন্য সম্ভাবনাময় খাতের জন্য বাজার এবং পণ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন। এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে নতুন বাণিজ্য চুক্তি, বাজার বহুমুখীকরণ, মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অর্থাৎ সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘সাবসিডি দিয়ে রপ্তানি টিকিয়ে রাখা নয়, বরং উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করা।
আইএইচও/এএসএ
What's Your Reaction?


