চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের পাকা রোড ফেইলন ও বলাকা রোলিং মিল মাঠ সংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অনুমোদন, ইজারা প্রক্রিয়া, রাজস্ব আদায়, জনদুর্ভোগ এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি রিট পিটিশন নং ৬৮২৫/২০২৬-এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে গড়ালে হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট স্থানে অনুমোদনবিহীন হাট পরিচালনা বন্ধে রুল জারি করেন বলে রিটকারীর আইনজীবী প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করেছেন।
রিট আবেদনটি দায়ের করেন মো. ফজলে আলম চৌধুরী। এতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনারসহ মোট ৯ জনকে বিবাদী করা হয়। আবেদনে বলা হয়, বলাকা রোলিং মিল মাঠ ও পাকা রোড ফেইলন এলাকায় কোনো বৈধ অনুমোদন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই অস্থায়ী পশুর হাট পরিচালিত হচ্ছে, যা শিল্পাঞ্চল, মহাসড়ক সংযোগ এবং জনবসতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
হাইকোর্ট বিভাগের আদালত নং-২০ (মেইন)-এ ২১ মে ২০২৬ তারিখে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি গ্রহণ করেন বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন এবং অনুমোদন ছাড়া সংশ্লিষ্ট স্থানে গরুর হাট পরিচালনা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন বলে রিটকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ আলী হোসাইনের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
রিট পিটিশনকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলী হোসাইন বলেন, 'অবৈধভাবে একটি শিল্পাঞ্চলে এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়কের পাশে পশুর হাট পরিচালনা হওয়ায় ব্যাপক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনজীবন, যান চলাচল এবং পরিবহন ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে আমার মক্কেলের পক্ষে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছি। আশা করছি হাইকোর্ট বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে জনভোগান্তির কথা মাথায় রেখে ওই অস্থায়ী পশুর হাটটি বন্ধের নির্দেশ প্রদান করবেন।'
সরেজমিনে হাট এলাকায় গিয়ে খামারি ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে আসা গরুবাহী ট্রাকগুলো একাধিক ক্ষেত্রে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে না পেরে হাট এলাকায় থামতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
কুষ্টিয়া থেকে আসা খামারি আলাউদ্দিন বলেন, ‘১১টি গরু নিয়ে চট্টগ্রামে আসার পর তার ট্রাক নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে না দিয়ে হাট এলাকায় থামিয়ে রাখা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত মৌলিক সুবিধা নেই, পানির ব্যবস্থা নেই এবং দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। এভাবে অবস্থান করতে হলে কীভাবে ব্যবসা করব বুঝতে পারছি না, আমরা খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।'
দিনাজপুর থেকে আগত খামারি রফিক মিয়া জানান, তিনি ১৪টি গরু নিয়ে এসে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ‘হাট এলাকায় পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে এবং দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই, পানি নেই, শৌচাগার নেই, আমরা খুব সমস্যায় আছি।'
একাধিক খামারি অভিযোগ করেন, হাট এলাকায় মৌলিক সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় তারা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের প্রভাবে ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন গরুবাহী ট্রাক প্রবেশ করায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগ সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় জনজীবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
হাট পরিচালনার স্থানে স্থাপিত সাইনবোর্ডে ‘ইউনুছ মার্কেট মামা ভাগিনার মাঠ ও ভাগিনার মাঠ’ যৌথ উদ্যোগে হাট পরিচালনার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ইজারাদার হিসেবে হাজী মোহাম্মদ ইউনুছ মিয়া, সাজ্জাদ হোসাইন, খোরশেদ আলম এবং নাজিম উদ্দিনের নাম পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করেন, পূর্বে এ নামে কোনো নিয়মিত হাট ছিল না। উল্লিখিত হাটের নাম, স্থান ও বাস্তব অবস্থান নিয়ে অসংগতি রয়েছে। তাদের মতে, এটি পূর্বে কোনো পরিচিত হাট ছিল না এবং শিল্পাঞ্চল ও জনবসতির মাঝামাঝি এলাকায় হাট বসানোর ফলে পরিবেশ ও জনজীবনে চাপ তৈরি হচ্ছে।
১৪ মে উপজেলা প্রশাসনের স্মারকে জানানো হয়, ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে ‘হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী সলিমপুর ইউনিয়নের ১০ নম্বর এলাকায় ড্রিম স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের মাঠে অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
স্মারকে ইজারা ও রাজস্ব কাঠামো বিষয়ে বলা হয়, ইজারালব্ধ অর্থের ২০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চালানের মাধ্যমে তা পরিশোধ করতে হবে।
স্মারকে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রধান সড়ক থেকে ন্যূনতম ১০০ গজ দূরে হাট পরিচালনা করতে হবে, মহাসড়কে পশু কেনাবেচা বা যানবাহন থামানো যাবে না, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ পৃথক রাখতে হবে, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে, জালনোট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রাখতে হবে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজার এলাকা নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার রাখতে হবে। শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রশাসন যেকোনো সময় অনুমোদন বাতিল করতে পারবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ পাওয়া যায়, ইজারা প্রক্রিয়া এবং রাজস্ব আদায়ের কাঠামো নিয়ে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, উন্মুক্ত টেন্ডার ব্যবস্থার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে প্রথমবারের মতো হাট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের ২০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার শর্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন, তদারকি এবং হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান স্বাক্ষরিত ১৭ মে স্মারকে বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সীতাকুণ্ডের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ড্রিম স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের মাঠে অস্থায়ী পশুর হাট পরিচালনার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে এবং তা বিধিমালা অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে কার্যকর থাকবে।
তবে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাটের ইজারা বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার হাজী মোহাম্মদ ইউনুছ মিয়া বলেন, 'এই প্রথম আমরা ইজারা নিয়েছি। কোনো গাড়ি জোরপূর্বক থামানো হচ্ছে না। যাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও পরিচয় রয়েছে, তাদেরই এখানে আনা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'হাইকোর্টের রিট সম্পর্কে অবগত নন। পানির সংকট প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ইতোমধ্যে পানির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও ভালো রয়েছে।'
জোরপূর্বক গরুবাহী গাড়ি থামিয়ে সড়ক অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, 'ঈদের সময়ে সড়কে হাট বসে বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে হাটের ইজারাদারদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।'
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়, আদালতের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং হাটের অনুমোদন, ইজারা প্রক্রিয়া ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা হবে।