আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্প

২৫ মে, সোমবার। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ক্যাথলিন শহরে চার দিনের আনন্দঘন অবস্থানের পর বিদায়ের ক্ষণ এসে গেল। সামনে দীর্ঘ সড়কযাত্রা। গন্তব্য প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দূরের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট লাফায়েত। পরিকল্পনা ছিল সকাল দশটার মধ্যেই শ্যালক লিটন দাসের বাড়ি থেকে রওয়ানা দেবো। পথে কয়েকবার বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতের আগেই পৌঁছে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতা এক হলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুঝলাম, এত সহজে বিদায় নেওয়া যাবে না। লিটন দাস ও তার সহধর্মিণী সুমা দাস যেন মনস্থির করেই রেখেছেন, অতিথিদের শুধু বিদায় নয়, স্মরণীয় কিছু উপহার দিয়েই বিদায় করবেন। সুমা সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। একের পর এক খাবারে ভরে উঠলো টেবিল। গরম লুচি, পরোটা, সবজি, ডিমভাজি, খাসির ভুনা, মুরগির ঝোল, নানা রকম ভর্তা, তারপর নিজের হাতে তৈরি নরম তুলতুলে রসগোল্লা, রসমালাই, ক্যারামেলের সুঘ্রাণে ভরা পুডিং, সঙ্গে বাগানের পাকা কাঁঠাল, তরমুজ, কমলা ও কলা। বিদেশের মাটিতে বসে এমন দেশি আপ্যায়নের কথা সত্যিই কল্পনারও অতীত। খাওয়া শেষ হতেই সুমা মুচকি হেসে বলল, ‌‘দাদা, আমেরিকায় তো ভালো মিষ্টি পাওয়া

আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্প

২৫ মে, সোমবার। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ক্যাথলিন শহরে চার দিনের আনন্দঘন অবস্থানের পর বিদায়ের ক্ষণ এসে গেল। সামনে দীর্ঘ সড়কযাত্রা। গন্তব্য প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দূরের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট লাফায়েত। পরিকল্পনা ছিল সকাল দশটার মধ্যেই শ্যালক লিটন দাসের বাড়ি থেকে রওয়ানা দেবো। পথে কয়েকবার বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতের আগেই পৌঁছে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতা এক হলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুঝলাম, এত সহজে বিদায় নেওয়া যাবে না। লিটন দাস ও তার সহধর্মিণী সুমা দাস যেন মনস্থির করেই রেখেছেন, অতিথিদের শুধু বিদায় নয়, স্মরণীয় কিছু উপহার দিয়েই বিদায় করবেন।

সুমা সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। একের পর এক খাবারে ভরে উঠলো টেবিল। গরম লুচি, পরোটা, সবজি, ডিমভাজি, খাসির ভুনা, মুরগির ঝোল, নানা রকম ভর্তা, তারপর নিজের হাতে তৈরি নরম তুলতুলে রসগোল্লা, রসমালাই, ক্যারামেলের সুঘ্রাণে ভরা পুডিং, সঙ্গে বাগানের পাকা কাঁঠাল, তরমুজ, কমলা ও কলা। বিদেশের মাটিতে বসে এমন দেশি আপ্যায়নের কথা সত্যিই কল্পনারও অতীত। খাওয়া শেষ হতেই সুমা মুচকি হেসে বলল, ‌‘দাদা, আমেরিকায় তো ভালো মিষ্টি পাওয়া যায় না। আমার বানানো আরেকটা রসগোল্লা নিন।’
আমি হেসে উত্তর দিলাম, ‘আরেকটা খেলে আজ আর ওয়েস্ট লাফায়েত পৌঁছানো হবে না।’
আমার কথা শুনে ঘরের সবাই হেসে উঠলো। আমার মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে পাত্রপক্ষ কনের বাড়িতে গেলে যেভাবে আন্তরিক আপ্যায়ন করা হয়, সেদিনের পরিবেশটাও যেন ঠিক তেমনই। এদিকে আমার ছোট্ট নাতনি বাঁশরী কখনো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে-নিচে দৌড়াচ্ছে, কখনো আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। তার হাসি আর চঞ্চলতায় পুরো বাড়ি যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। গল্প, হাসি, ছবি তোলা আর খাওয়া-দাওয়ার আনন্দে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, দুপুর দুইটা। অবশেষে বিদায়ের মুহূর্ত এলো। সবাইকে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির উঠান ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে দেখলাম, লিটন, সুমা এবং তাদের দুই সন্তান নিসু ও নৈসিক এখনো দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। গাড়ি যত দূরে এগোচ্ছিল; ততই মনে হচ্ছিল দূরত্ব বাড়ছে ঠিকই কিন্তু মানুষগুলো যেন হৃদয়ের আরও কাছে চলে আসছে।

ক্যাথলিন ছাড়ার পর আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল আটলান্টার রহমানিয়া হালাল মিট অ্যান্ড গ্রোসারি। বিদেশে থাকলেও বাঙালির মন একসময় না একসময় মাছ, ডাল, কাঁচামরিচ আর দেশি খাবারের খোঁজে এমন কোনো দোকানের দিকেই ছুটে যায়। গাড়ি পার্ক করেই চোখে পড়লো বাংলা অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড; যেখানে বাংলাদেশি গ্রোসারি ও হালাল মাংসের বিজ্ঞাপন। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, যেন মুহূর্তের জন্য আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশের কোনো পরিচিত বাজারে এসে দাঁড়িয়েছি। চারদিকে সাজানো প্রাণের চানাচুর, এনার্জি প্লাস বিস্কুট, বোম্বে সুইটস, রাধুনী মসলা, স্কয়ার ও আকিজের বিভিন্ন পণ্য, তেজপাতা, পাঁচফোড়ন, শুকনো মরিচ, সরিষার তেল, মুড়ি, চিঁড়া থেকে শুরু করে নারকেলের গুড় পর্যন্ত। বক্সফ্রিজে সারি সারি প্যাকেটজাত রুই, কাতলা, ইলিশ, মলা, কাচকি, বোয়াল, পাবদা, শিং ও মাগুর মাছ দেখে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের নদীগুলো যেন হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। আমরা রুই, মলা, কাচকি মাছ, মুরগির মাংস, এনার্জি প্লাস বিস্কুটসহ প্রয়োজনীয় কিছু বাজারসদাই কিনে নিলাম।

tour

বাংলায় কথা বলা শুনেই দোকানের মালিক আন্তরিকভাবে আলাপ জুড়ে দিলেন। জানতে পারলাম, তার বাড়ি বিক্রমপুরে। প্রায় পনেরো বছর আগে তিনি আমেরিকায় আসেন। প্রথম জীবনে একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ করলেও পরে কয়েকজন অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে এই বাংলাদেশি গ্রোসারিটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার কথায় জানা গেল, শুধু বাংলাদেশিরাই নন, ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ অনেক আমেরিকানও এখন এশিয়ান খাবার, বিশেষ করে বাংলাদেশি মাছ ও মসলার নিয়মিত ক্রেতা। দোকানের আরেক তরুণ কর্মচারীর বাড়ি নোয়াখালী। পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন দোকানে কাজ করেন। তার কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠলো, প্রবাসে কাজের ক্লান্তির মধ্যেও বাংলায় দুটো কথা বলার সুযোগ মানুষকে আপনজনের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দোকানের এক কোণে আগত এক মা তার ছোট ছেলেকে বাংলায় বলছেন, ‘এইটা ধরো না, পড়ে যাবে।’ এক মায়ের মুখে সন্তানের উদ্দেশে বাংলায় উচ্চারিত সতর্কবাণী শুনে আরও একবার অনুভব করলাম, প্রবাসে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি শেকড়ের সঙ্গে অদৃশ্য এক বন্ধন। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও মানুষ যে নিজের সংস্কৃতি, স্বাদ, ভাষা ও পরিচয় এত যত্নে বাঁচিয়ে রাখে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। গাড়িতে ফিরে মনে হলো, আমরা শুধু কিছু বাজারসদাই কিনিনি; সঙ্গে করে নিয়ে চলেছি বাংলাদেশের এক টুকরো গন্ধ, এক টুকরো ভাষা আর অনেকখানি আবেগ। এরপর আবার শুরু হলো দীর্ঘ সড়কযাত্রা।

সামনে দীর্ঘপথ। গন্তব্য ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট লাফায়েত। গুগল ম্যাপ জানিয়ে দিলো, এখনো ১০৫০ মাইলেরও বেশি পথ বাকি। হিসাব অনুযায়ী যাত্রা দশ থেকে এগারো ঘণ্টার হলেও বাস্তবে এত দীর্ঘ সফরে শুধু মাইল নয়, সঙ্গে যোগ হয় বিশ্রাম, খাবার, জ্বালানি, শিশুদের প্রয়োজন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নানা পরিস্থিতি। বিকেলের আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে। জামাই সুদীপ্ত স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে গাড়ি তুললো আমেরিকার বিখ্যাত ইন্টারস্টেট ৭৫ মহাসড়কে। ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রায় ৪৮ হাজার মাইল দীর্ঘ এ ইন্টারস্টেট নেটওয়ার্ক আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ, দ্রুত ও সুশৃঙ্খল সড়ক যোগাযোগের মেরুদণ্ড। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। দুপাশে বিস্তীর্ণ বনভূমি, ছোট ছোট শহর, গির্জার সুউচ্চ চূড়া, দূরের খামারবাড়ি আর সবুজ চারণভূমিতে ঘোড়া ও গরুর পাল মিলিয়ে পথের দৃশ্য যেন এক চলমান প্রাকৃতিক চিত্রপট।

তবে মনোমুগ্ধকর যাত্রার মাঝেই ছোট্ট এক বিপত্তি ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টা পর পেছনের সিটে বসা আমাদের নাতনি বাঁশরী কারসিটেই অসুস্থ হয়ে বমি করে ফেলে। মুহূর্তেই গাড়ির পরিবেশ বদলে যায়। টিস্যু, পানির বোতল ও অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে সবাই তাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে হলে রাস্তার পাশে দ্রুত থামিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যেত, কিন্তু আমেরিকার ইন্টারস্টেটে মূল লেনে গাড়ি থামানো আইনত নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সেখানে ঘণ্টায় ৬৫-৭৫ মাইল (প্রায় ১০৫-১২০ কিলোমিটার) গতিতে যান চলাচল করে এবং হঠাৎ থেমে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই সুদীপ্ত ঝুঁকি না নিয়ে হ্যাজার্ড লাইট জ্বালিয়ে পরবর্তী এক্সিটের গ্যাস স্টেশনের পার্কিংয়ে গাড়ি থামায়। এটি আমেরিকার সড়ক সংস্কৃতির নিয়ম মানার একটি উদাহরণ। পরে গ্যাস স্টেশনে বাঁশরীকে পরিষ্কার করে পোশাক বদলানো হয়, কারসিটও টিস্যু ও জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। বড় গ্যাস স্টেশনগুলোতে টয়লেট, ডায়াপার বদলানোর স্থান ও প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকায় দীর্ঘ যাত্রা সহজ হয়। কিছুক্ষণ পর বাঁশরী আবার স্বাভাবিক হয়ে হাসতে শুরু করে। মনে হয় ছোটদের মন খারাপ যেমন হঠাৎ আসে; তেমনই দ্রুত চলে যায়।

tour

আবার যাত্রা শুরু হলো। গাড়ি জর্জিয়া ছেড়ে টেনেসির দিকে এগোতেই দিগন্তজুড়ে ভেসে উঠল অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার দক্ষিণাংশ। কোটি কোটি বছর আগে গঠিত এই প্রাচীন পর্বতশ্রেণির চূড়াগুলো দীর্ঘ ক্ষয়ে সবুজ ঢেউয়ের মতো কোমল রূপ নিয়েছে। চাটানুগার কাছে পৌঁছালে প্রকৃতি আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। পাহাড় কেটে তৈরি মহাসড়কের একপাশে সুউচ্চ পাথরের দেওয়াল, অন্যপাশে গভীর সবুজ উপত্যকা; কোথাও পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে সরু ঝরনার রেখা। জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি, পাহাড়, বন, আকাশ ও আলো দিয়ে একের পর এক জীবন্ত ছবি আঁকছে। টেনেসি নদীর তীরে চাটানুগা একসময় রেলপথ ও শিল্পের কেন্দ্র ছিল, এখন এটি পর্যটন নগরী। লুকআউট মাউন্টেন, রুবি ফলস ও টেনেসি অ্যাকোয়ারিয়ামের জন্য বিখ্যাত শহরটি সময়ের অভাবে ঘুরে দেখা হলো না। একদিন শুধু এটিকেই দেখার জন্য আবার ফিরে আসতে হবে।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো। কমলা আর বেগুনি আকাশের নিচে আমাদের গাড়ি ছুটছিল ন্যাশভিলের দিকে। কান্ট্রি মিউজিকের বিশ্বখ্যাত রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ মিউজিক সিটির উঁচু ভবনগুলো রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোয় ঝলমল করে উঠলো। আমরা শহরে না ঢুকে বাইপাস ধরে এগিয়ে গেলেও দূরের স্কাইলাইন, নদীর সেতু আর গাড়ির লাল-সাদা আলোর স্রোত এক অপূর্ব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল। তখন মনে হচ্ছিল, দিনের আমেরিকা আর রাতের আমেরিকা যেন দুটি ভিন্ন পৃথিবী। টেনেসি পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম কেন্টাকিতে। বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ও নীলাভ ঘাসের জন্য ব্লুগ্রাস স্টেট নামে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্য ঘোড়ার খামার, চুনাপাথরের পাহাড়, গুহা ও বোর্বন শিল্পের জন্যও বিশ্বখ্যাত।

রাত যত গভীর হচ্ছিল, ইন্টারস্টেটও তত নীরব হয়ে উঠছিল। দিনের কোলাহল নেই, ট্রাফিকও অনেক কম। দূরে দূরে ট্রাকের সারি, মাঝে মাঝে বিশাল আঠারো চাকার ট্রেলার দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। হেডলাইটের সাদা আলো অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর লাল টেইললাইট ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশভরা তারা আর টায়ারের একটানা মৃদু শব্দে মনে হচ্ছিল, মহাসড়ক যেন নিজেই এক নীরব সুর বয়ে চলেছে। তখনো জানতাম না, সামনে অপেক্ষা করছে এই যাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, ভয়াবহ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। রাত তখন প্রায় দুইটা। ইন্ডিয়ানাপোলিস আর বেশি দূরে নয়। গভীর অন্ধকার ভেদ করে আমাদের গাড়ি ঘণ্টায় একশ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছুটে চলেছে। রাত তখন দুইটারও বেশি। কেন্টাকি পেরিয়ে আমরা অনেক আগেই ইন্ডিয়ানায় প্রবেশ করেছি। সামনে আর মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের পথ। এরপরই ইন্ডিয়ানাপোলিস, তারপর ওয়েস্ট লাফায়েত। গভীর রাতের আমেরিকান ইন্টারস্টেটের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

tour

সুদীপ্ত গভীর মনোযোগে গাড়ি চালাচ্ছিল। আমি তার পাশের আসনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝেমধ্যে গল্প করছিলাম, যাতে তার একঘেয়েমি না আসে। পেছন থেকে মেয়েও বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এত রাত পর্যন্ত গাড়ি চালানোর সময় চালকের পাশে বসা মানুষটির জেগে থাকা জরুরি। গাড়ি তখন ঘণ্টায় একশ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ রাস্তার ডানপাশের অন্ধকার বন থেকে বজ্রগতিতে একটি বিশাল হরিণ ছুটে এসে সরাসরি আমাদের গাড়ির সামনে পড়লো। সবকিছু ঘটলো এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে। ধাম! বিকট এক শব্দ। গাড়ির সামনের অংশ প্রবলভাবে কেঁপে উঠলো। ভেতরে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো। আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সুদীপ্ত যে স্থিরতা দেখাল, সেটি আজও আমার চোখে ভাসে। সে স্টিয়ারিং শক্তভাবে ধরে ধীরে ধীরে গতি কমাল। তারপর হ্যাজার্ড লাইট জ্বালিয়ে আরও কিছুটা সামনে গিয়ে নিরাপদ একটি এক্সিটে গাড়ি থামালো।

গাড়ি থামিয়ে নেমে দেখি গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে মহাসড়কে ছুটে চলা গাড়ির শব্দ। সামনে এসে আমরা কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখলাম সামনের বাম্পার ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে ঝুলছে। ডানপাশের হেডলাইটের কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বাল্বটি তখনো জ্বলছিল। ডানপাশের চাকা এবং গাড়ির গায়ে রক্তের ছোপ। হরিণটির আর কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। সম্ভবত আঘাতের পর রাস্তার ধারে গিয়ে পড়েছে। গাড়িতে ফিরে দেখি গাড়িতে বসা সবাই উদ্বিগ্ন, সামনে তখনো প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। সেই অবস্থায় প্রশ্ন জাগলো, এই গাড়ি নিয়ে যাত্রা কি নিরাপদ হবে?

সুদীপ্ত রেন্টাল কোম্পানিতে ফোন করলো। একবার রিং হওয়ার মাত্রই ভদ্রমহিলা ফোন ধরলেন, ‘হ্যালো’।
সুদীপ্ত বলল, ‘হাই। উই আর ড্রাইভিং অন ইন্টারস্টেট ৬৫ ইন ইন্ডিয়ানা। উই জাস্ট হিট এ ডিয়ার। দ্য ফ্রন্ট হুড ইজ ব্যাডলি ড্যামেজড অ্যান্ড দ্য রাইট হেডলাইট কভার ইজ ব্রোকেন।’
মহিলা বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আই অ্যাম সরি টু হিয়ার দ্যাট। ফার্স্ট অব অল, ইজ এভরিওয়ান ইন ইয়োর ভেহিকল সেফ?’
সুদীপ্ত বলল, ‘ইয়েস, থ্যাঙ্কফুলি এভরিওয়ান ইজ ফাইন। নো ওয়ান ইজ ইনজার্ড।’
‘দ্যাটস গুড টু নো। ইজ দ্য ভেহিকল স্টিল ড্রাইভেবল?’
‘ইয়েস। দ্য ইঞ্জিন সিমস ফাইন, অ্যান্ড দ্য কার ইজ মুভিং নরমালি। অনলি দ্য ফ্রন্ট বডি ইজ ড্যামেজড।’
‘ইফ ইউ বিলিভ দ্য ভেহিকল ইজ সেফ টু ড্রাইভ, ইউ মে কন্টিনিউ টু ইয়োর ডেস্টিনেশন। হাউএভার, ইফ ইউ ফিল ইটস আনসেফ, উই ক্যান অ্যারেঞ্জ রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্স অর উবার ট্রান্সপোর্টেশন।’
সুদীপ্ত একটু ভেবে বলল, ‘উই আর সেভেন পিপল। ওয়ান উবার উইল নট বি এনাফ।’
‘ইন দ্যাট কেস, উই উড অ্যারেঞ্জ টু উবার ভেহিকলস ইফ নেসেসারি।’
‘আই থিঙ্ক উই ক্যান কন্টিনিউ ড্রাইভিং কেয়ারফুলি। উইল রিপোর্ট দ্য ড্যামেজ হোয়েন উই রিটার্ন দ্য ভেহিকল।’
‘দ্যাট সাউন্ডস ফাইন। প্লিজ ড্রাইভ স্লোলি, কিপ ইয়োর হ্যাজার্ড লাইটস অন ইফ নিডেড, অ্যান্ড কল আস অ্যাগেইন ইফ দ্য সিচুয়েশন চেঞ্জেস। স্টে সেফ।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।’ ফোন রেখে সুদীপ্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

tour

রাত ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল। পূর্ব আকাশে নীলচে আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘ ক্লান্তি যেন ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভোর প্রায় পাঁচটার দিকে আমরা পৌঁছালাম ওয়েস্ট লাফায়েতের বাড়িতে। গাড়ি থামতেই সবার মুখে দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস। ভেতরে ঢুকেই মনে হলো, এক দীর্ঘ অভিযানের সমাপ্তি ঘটেছে। আজও সেই যাত্রার কথা মনে পড়লে হরিণের সংঘর্ষের ভয় নয় বরং একটিই অনুভূতি সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে, আমরা সবাই নিরাপদে পৌঁছেছিলাম। সেটিই ছিল সেই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow