আটষট্টি হাজার গ্রামের প্রতিটি স্কুল কি এমন হতে পারে না?

থেমে গেলে চলবে না, শুধু একটি স্কুলকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে বছরের পর বছর প্রশংসার ঢোল পেটালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং এখন সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করার। কেন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় একইভাবে শিশুদের জন্য স্বপ্নের জায়গা হয়ে উঠছে না? আমি ঈর্ষান্বিত নই, বরং গভীরভাবে গর্বিত। কারণ মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমার ভাগ্নীর হাত ধরেই আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকার সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। প্রতিদিন নতুন চিন্তা, নতুন উদ্যোগ এবং নতুন মানবিক শিক্ষা দিয়ে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, যদি সেখানে দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্ব থাকে। কিন্তু এখানেই রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন তৈরি হয়। কেন এই ব্যতিক্রম শুধুই একটি বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে? কেন বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনও শুধু উপস্থিতির খাতা, পরীক্ষার নম্বর আর পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে? কেন একটি শিশুর শিক্ষাজীবন নির্ভর করবে সে কোন এলাকায় জন্ম নিয়েছ

আটষট্টি হাজার গ্রামের প্রতিটি স্কুল কি এমন হতে পারে না?

থেমে গেলে চলবে না, শুধু একটি স্কুলকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে বছরের পর বছর প্রশংসার ঢোল পেটালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং এখন সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করার। কেন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় একইভাবে শিশুদের জন্য স্বপ্নের জায়গা হয়ে উঠছে না?

আমি ঈর্ষান্বিত নই, বরং গভীরভাবে গর্বিত। কারণ মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমার ভাগ্নীর হাত ধরেই আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকার সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। প্রতিদিন নতুন চিন্তা, নতুন উদ্যোগ এবং নতুন মানবিক শিক্ষা দিয়ে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, যদি সেখানে দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্ব থাকে।

কিন্তু এখানেই রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন তৈরি হয়। কেন এই ব্যতিক্রম শুধুই একটি বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে? কেন বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনও শুধু উপস্থিতির খাতা, পরীক্ষার নম্বর আর পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে? কেন একটি শিশুর শিক্ষাজীবন নির্ভর করবে সে কোন এলাকায় জন্ম নিয়েছে তার ওপর?

আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, শিক্ষা শুধু বই মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়া। সকাল নয়টার মধ্যেই শিশুরা ডিজিটাল আইডি কার্ড স্পর্শ করে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। নিয়মিত উপস্থিতি প্রায় শতভাগ। অভিভাবকদের জন্য রয়েছে আনন্দ পাঠাগার, যেখানে অপেক্ষার সময় মায়েরা বই পড়েন এবং বাড়ি গিয়ে সন্তানদের গল্প শোনান। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নেই, পরিবারকেও যুক্ত করা হয়েছে শিক্ষার সঙ্গে।

বিদ্যালয়ের দেয়ালে কৃত্রিম ঘাস দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের মানচিত্র। শিশুরা হাতে কলমে ভূগোল শেখে। আছে ‌‘মহানুভবতার দেয়াল’, যেখানে যাদের প্রয়োজন নেই তারা কাপড় রেখে যায়, আর যাদের প্রয়োজন তারা নিয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা শিখছে মানবতা, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ।

আছে ‘আলোকিত আচরণ সংগ্রহশালা’, যেখানে ভালো কাজ করা শিক্ষার্থীদের ছবি প্রকাশ করা হয়। প্রতিদিন শিক্ষকরা নিজেরাও শপথ নেন, তারা শুধু পাঠদান নয়, নৈতিকতা ও মানবিকতা শেখাবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংস্কৃতি কেন দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে নেই?

বিদ্যালয়টিতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম রয়েছে, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে, অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম রয়েছে, এমনকি রয়েছে বিক্রেতাবিহীন “My Shop”, যেখানে শিশুরা নিজেরাই জিনিস নিয়ে মূল্য রেখে যায়। এটি শুধু দোকান নয়, এটি একটি নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতে শেখানো হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যালয়টি শিশুদের হীনমন্যতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। শাখার নাম ‘ক’ বা ‘খ’ নয়, বরং পদ্মা, মেঘনা, যমুনার নামে। দেয়ালে স্থানীয় ইতিহাস, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ শিশুরা নিজের মাটি ও পরিচয় সম্পর্কে জানছে।

বিদ্যালয়টির কিছু শিক্ষাধারা নর্ডিক দেশগুলোর শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ভাবনার সঙ্গে বিস্ময়কর মিল তৈরি করে। ফিনল্যান্ড বা সুইডেনের মতো দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যবই নির্ভর রাখা হয়নি। সেখানে শিশুর মানসিক বিকাশ, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতাকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা পুরো দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের মান কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে একটি ভালো স্কুল ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কি এখনও কয়েকটি ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়ের গল্প শুনে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি প্রতিটি শিশুর জন্য একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাইব?

এখন প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আসল বাধা কোথায়?

সমস্যা অর্থের অভাবে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের অনেক বিদ্যালয়ে ভবন আছে, বরাদ্দ আছে, প্রকল্প আছে, কিন্তু নেই দূরদর্শী নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা, প্রশিক্ষণ এবং উদ্ভাবনী স্বাধীনতা। আমরা এখনও এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছি যেখানে সৃজনশীলতাকে উৎসাহের বদলে অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়। একজন শিক্ষক নতুন কিছু করতে চাইলে তাকে প্রশাসনিক জটিলতা, সীমিত ক্ষমতা এবং কখনও কখনও অনাগ্রহের দেয়ালের সামনে দাঁড়াতে হয়।

আরও বড় সমস্যা হলো, আমরা সফল উদাহরণকে জাতীয় নীতিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ। একটি বিদ্যালয় ভালো করলেই আমরা ছবি তুলি, সংবাদ করি, পুরস্কার দিই। কিন্তু সেই মডেলকে গবেষণা করে সারা দেশে বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা তৈরি করি না। ফলে ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই থেকে যায়।

রাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি শুধু কয়েকটি ‘মডেল স্কুল’ দেখিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, না কি সত্যিকার অর্থে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলাতে চায়। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন ভবন নয়, নতুন শিক্ষা দর্শন। এমন শিক্ষা, যেখানে শিশুকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যেখানে শিক্ষক শুধু চাকরিজীবী নন, সমাজ নির্মাতা হবেন। যেখানে বিদ্যালয় শুধু পাঠদান কেন্দ্র নয়, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হবে।

মাগুরার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা থাকলে সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেও বিশ্বমানের পরিবর্তন সম্ভব। এখন দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারা কি এই আলোর প্রদীপকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত, নাকি একটি উদাহরণকে ঘিরেই বছরের পর বছর একই প্রশংসা পুনরাবৃত্তি করে যাবে?

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow