আদালতের জট কমাতে বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ঠেকানোর পরামর্শ

দেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই নিষ্পত্তির তুলনায় প্রায় এক লাখ বেশি নতুন মামলা যুক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা নিয়ন্ত্রণ, মামলা দায়েরের আগে কার্যকর স্ক্রুটিনি (প্রাথমিক যাচাই) এবং বিদ্যমান জরিমানা-সাজার বিধান প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন আইনজীবীরা।  আইনজীবীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান বাস্তবায়ন এবং মামলা দায়েরের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা গেলে মামলাজট অনেকটাই কমানো সম্ভব। মামলার সবশেষ অবস্থা: ছবি এআই সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে রয়েছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি। মামলাজট বিচার বিভাগের অন্যতম বড় সমস্য

আদালতের জট কমাতে বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ঠেকানোর পরামর্শ

দেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই নিষ্পত্তির তুলনায় প্রায় এক লাখ বেশি নতুন মামলা যুক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা নিয়ন্ত্রণ, মামলা দায়েরের আগে কার্যকর স্ক্রুটিনি (প্রাথমিক যাচাই) এবং বিদ্যমান জরিমানা-সাজার বিধান প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন আইনজীবীরা। 

আইনজীবীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান বাস্তবায়ন এবং মামলা দায়েরের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা গেলে মামলাজট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

jagonews24মামলার সবশেষ অবস্থা: ছবি এআই

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে রয়েছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি।

মামলাজট বিচার বিভাগের অন্যতম বড় সমস্যা। এ সংকট নিরসনে বার ও বেঞ্চকে একযোগে কাজ করতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় রিট ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের নিরুৎসাহিত করতে হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন আদালতে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৬ হাজার ৫৩৬টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৭ হাজার ৭৩৯টি এবং অধস্তন আদালতে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

একই সময়ে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭৫টি। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৩ হাজার ৯৫৮টি, হাইকোর্ট বিভাগে ২২ হাজার ৯৯৯টি এবং অধস্তন আদালতে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৮টি মামলা নতুন করে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসেই নিষ্পত্তির তুলনায় ৯৫ হাজার ৫১৬টি বেশি নতুন মামলা হয়েছে, যা মামলাজট বৃদ্ধির প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

বাঁধ যত বড়ই বানান, যদি পানি ঢোকা বন্ধ করতে না পারেন, তাহলে কোনো লাভ হবে না। একইভাবে, নতুন মামলা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু বিচারক বাড়িয়ে মামলাজট কমানো সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মামলা দায়েরের হার নিষ্পত্তির তুলনায় বেশি হওয়াই মামলাজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি বিচারকের তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক বেশি, জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ১০৫ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগে রয়েছেন ৪ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন। অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকের সংখ্যা ২ হাজার ২৩৪ জন। তবে এ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

jagonews24নিম্ন আদালতে ভিড়: ছবি এআই

মামলাজট কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে বলেন, বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও আদালতের সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬ বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগও অব্যাহত রয়েছে।

জট বাড়ার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। একদিকে নতুন মামলা দায়ের ঠেকানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। শুধু মুখে মামলাজট কমানোর কথা বললে হবে না, মূল সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি জানান, সরকার সম্প্রতি ৬৫০টি সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ আদালত, ৪০৬টি যুগ্ম দায়রা জজ আদালত এবং ২০৪টি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব আদালতের জন্য নতুন বিচারকের পদ সৃষ্টির বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে মামলার নিষ্পত্তির গতি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিচারক বাড়ানোর সুপারিশ

মামলাজট নিরসনে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে আইন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। তবে শুধু বিচারক নিয়োগ নয়, নতুন মামলা নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান।

jagonews24উচ্চ আদালত: ফাইল ছবি

গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মামলাজট নিরসনসহ ৩২টি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বাধীন কমিশন মামলাজট কমাতে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের বিচারকের সংখ্যা অন্তত ৬ হাজারে উন্নীত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট আইন কমিশনও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমানোর লক্ষ্যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার জটের পাঁচটি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে বিচারকের ঘাটতি, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবল সংকট এবং দুর্বল অবকাঠামো। কমিশন পর্যায়ক্রমে অধস্তন আদালতের বিচারকের সংখ্যা ৫ হাজারে উন্নীত করারও সুপারিশ করে।

সমন ও নোটিশ জারিতে দীর্ঘ বিলম্ব, শুনানি পেছানোর প্রবণতা এবং সাক্ষীদের অনুপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘ করছে। আইনজীবীদের সময় প্রার্থনারও একটি যৌক্তিক সীমা থাকা প্রয়োজন।

বার-বেঞ্চকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান

মামলাজট কমাতে বার ও বেঞ্চের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলাজট বিচার বিভাগের অন্যতম বড় সমস্যা। এ সংকট নিরসনে বার ও বেঞ্চকে একযোগে কাজ করতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় রিট ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের নিরুৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিচারক নিয়োগ, জনবল বৃদ্ধি এবং আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।’

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা 

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, মামলাজট কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলাজট বাড়ার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। একদিকে নতুন মামলা দায়ের ঠেকানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। শুধু মুখে মামলাজট কমানোর কথা বললে হবে না, মূল সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তার মতে, বিচারকের সংখ্যা অন্তত তিন গুণ বাড়ানোর পাশাপাশি আদালতের লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মামলা কমাতে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।

নীতিগত পরিবর্তনের পরামর্শ

সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি কম হওয়াই জট বৃদ্ধির মূল কারণ।

তিনি বলেন, ‘সমন ও নোটিশ জারিতে দীর্ঘ বিলম্ব, শুনানি পেছানোর প্রবণতা এবং সাক্ষীদের অনুপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘ করছে। আইনজীবীদের সময় প্রার্থনারও একটি যৌক্তিক সীমা থাকা প্রয়োজন।’

তার মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারক নিয়োগ, এজলাস সংকট দূর করা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে মামলাজট কমানো সম্ভব।

সব মামলা উচ্চ আদালতে আসা প্রয়োজন নেই

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, বিচারকের তুলনায় মামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সে হারে বিচারক নিয়োগ হচ্ছে না। ফলে মামলাজটও বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘এমন অনেক মামলা রয়েছে, যেগুলোর নিষ্পত্তি অধস্তন আদালতেই সম্ভব। কিন্তু সেগুলোও শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে চলে আসে। বিশেষ করে অনেক জামিন আবেদন নিম্ন আদালতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলেও তা হাইকোর্টে আসছে। কোন ধরনের মামলার শুনানি কোন আদালতে হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভিত্তিহীন রিট আবেদন বা আইনগত ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান কার্যকর করা গেলে অপ্রয়োজনীয় মামলা অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোও সময়ের দাবি।’

থামাতে হবে নতুন মামলার স্রোত 

মামলাজট নিরসনে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি হলেও সেটিই একমাত্র সমাধান নয় বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুল আলম উজ্জ্বল। তার মতে, নতুন মামলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাজারো নতুন বিচারক নিয়োগ করেও মামলাজট কমানো সম্ভব হবে না।

এমন অনেক মামলা রয়েছে, যেগুলোর নিষ্পত্তি অধস্তন আদালতেই সম্ভব। কিন্তু সেগুলোও শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে চলে আসে। বিশেষ করে অনেক জামিন আবেদন নিম্ন আদালতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলেও তা হাইকোর্টে আসছে। কোন ধরনের মামলার শুনানি কোন আদালতে হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘মামলাজট কমাতে হলে একদিকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরও কমাতে হবে। শুধু বিচারক বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।’

তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘বাঁধ যত বড়ই বানান, যদি পানি ঢোকা বন্ধ করতে না পারেন, তাহলে কোনো লাভ হবে না। একইভাবে, নতুন মামলা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু বিচারক বাড়িয়ে মামলাজট কমানো সম্ভব নয়।’

তার ভাষ্য, বর্তমানে এমন প্রবণতা তৈরি হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রেই মামলা করার প্রয়োজনীয়তা বা আইনগত ভিত্তি ভালোভাবে যাচাই না করেই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হচ্ছে। এতে আদালতের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়ছে।

মিথ্যা মামলায় জরিমানা ও সাজা

ব্যারিস্টার সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা গেলে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

বিশেষ করে মিথ্যা ফৌজদারি মামলায় আসামি খালাস পেলে বাদীর বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে হয়রানিমূলক মামলা অনেকটাই কমে যাবে।

তিনি বলেন, কেউ যদি জেনে-শুনে মিথ্যা মামলা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান কার্যকর হওয়া উচিত। এতে মানুষ অকারণে মামলা করার আগে কয়েকবার ভাববে।

তার মতে, অনেক দেশেই ভিত্তিহীন মামলা করলে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপ্রয়োজনীয় মামলার প্রবণতা কমবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আইনগত ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও রিট আবেদন করা হলে চূড়ান্ত শুনানিতে তা খারিজ হওয়ার পর জরিমানার বিধান থাকলে এমন আবেদনও অনেক কমে যাবে।’

মামলার আগে আইনগত ভিত্তি যাচাই

মামলা দায়েরের আগে আইনগত ভিত্তি যাচাইয়ের (স্ক্রুটিনি) ওপরও গুরুত্ব দেন এই আইনজীবী। তার ভাষায়, ‘আইনজীবী যদি শুরুতেই মক্কেলকে জানান যে মামলায় জেতার সম্ভাবনা কম এবং মামলা হেরে গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে, তাহলে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় মামলা করবেন না।’

তিনি বলেন, বিশেষ করে মিথ্যা ফৌজদারি মামলায় আসামি খালাস পেলে বাদীর বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে হয়রানিমূলক মামলা অনেকটাই কমে যাবে।

যে মামলা নিম্ন আদালতেই শেষ হতে পারে, তা উচ্চ আদালতে আনা উচিত নয়

ব্যারিস্টার সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, অনেক মামলা ও জামিন আবেদন অধস্তন আদালতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলেও সেগুলো উচ্চ আদালতে চলে আসে। এতে উচ্চ আদালতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, ‘যে মামলা বিচারিক আদালতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেটি অযথা উচ্চ আদালতে আনা উচিত নয়। কোন ধরনের মামলা কোন আদালতে নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।’

কার্যকর পদক্ষেপ

আইনজীবীদের মতে, মামলাজট কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অপ্রয়োজনীয় মামলা নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাদের মতে, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা নিরুৎসাহিত করতে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মামলা দায়েরের আগে কার্যকর স্ক্রুটিনি চালু করা এবং বিচারিক আদালতেই নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলো উচ্চ আদালতে আসা কমানো গেলে মামলাজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

 

এফএইচ/এসএইচএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow