চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত—সাধারণ মানুষের কাছে যেখানে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত—সেই আদালতকেন্দ্রিক একের পর এক অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। আদালতের অভ্যন্তরে কয়েকজন উমেদারের অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলেও অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। ব্যাংকার, আইনজীবী ও আদালতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নথি ব্যবস্থাপনা, আদেশ সংগ্রহ, ওয়ারেন্ট ও নিলাম কার্যক্রমে অনিয়ম, প্রভাবশালী যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে।
নথি ও আদেশ পেতে ‘প্রেশার টেস্ট’
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে একদল আইনজীবী ও ব্যাংক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নথি সংগ্রহ, আদেশ পাওয়া কিংবা ওয়ারেন্ট কার্যক্রম চালানো এখন এক ধরনের ‘প্রেশার টেস্ট’-এ পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মীর শফিকুল কবীর কালবেলাকে বলেন, ‘আমি নিয়মিত অর্থঋণ আদালতে মামলা পরিচালনা করি। উমেদারদের হাতে পুরো প্রক্রিয়া যেন জিম্মি। নথি চাইলেও টাকা দিতে হয়, আবার আদেশ তুলতে গিয়েও টাকা লাগে। টাকা ছাড়া সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এতে মক্কেলদের কাছে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।’
দীর্ঘদিনের প্রভাব, গভীর অভিযোগ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১ এ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা উমেদার নুরু (এজলাস) ও হারুন (সেরেস্তা) আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংকার ও আইনজীবীর অভিযোগ, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা ঋণ খেলাপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাদী পক্ষের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছেন।
এক ব্যাংক ব্যবস্থাপক কালবেলাকে বলেন, ‘ব্যাংকের স্বার্থে আদালতে গেলে উমেদারদের ধমক শুনতে হয়। আমরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারি না, এতে আমাদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’
কী কী অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, উমেদার নুরু ও হারুন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঋণ খেলাপিদের আদালতের আদেশ পাঠান, গুরুত্বপূর্ণ মামলা নথি লুকিয়ে রাখেন, ওয়ারেন্ট ও নিলাম কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেন। এছাড়াও ৭(১) ধারার বিজ্ঞাপন নথি সংযুক্ত না করা, নকল কাগজপত্র সরবরাহে গড়িমসি করাসহ নানা অনিয়মে তাদের যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের এক সহকারী বলেন, ‘দীর্ঘদিন চাকরির সুবাদে নুরু ও হারুন অনেক বিষয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করেন, যা বাদী পক্ষের জন্য সমস্যা তৈরি করে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, আদালতের নথি থেকে আদেশের ছবি তোলা, বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখা এবং হাসি-তামাশার অভিযোগও রয়েছে। এক আইনজীবীর ভাষ্য, ‘নথি চাইলে ধমক দেওয়া হয়। কখনো মোবাইলে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়। এতে বিচারিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
আদালতের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, উমেদার হারুনের বিরুদ্ধে প্রতিমাসে ব্যাংকার, আইনজীবী ও ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে, উমেদার নুরু ২০১৯ সালের আগে আদালতে কর্মরত থাকাকালে নথি বাসায় নেওয়া ও সমন বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। একটি প্রতারণা মামলায় সাজা পাওয়ার পর কয়েক বছর বাইরে থাকলেও সম্প্রতি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি আবার আদালতে যুক্ত হন।
এক সিনিয়র ব্যাংক প্যানেলভুক্ত আইনজীবী বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত কোর্ট ফি দেই। অথচ ঋণ খেলাপিরা উমেদারদের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে, ফলে বাদী পক্ষের মামলা পিছিয়ে যায়।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি হাসান আলী কালবেলাকে বলেন, আদালতের ভেতরে স্পষ্ট অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘উমেদারদের অনেকের বিরুদ্ধে স্পেশিফিক অভিযোগ ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং আদালত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তবে যাদের সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাদের নাম এই মুহূর্তে স্মরণে নেই। জেনে আপনাকে জানাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থঋণ আদালত থেকে উমেদারদের বিরুদ্ধে মৌখিক বা লিখিত কোনো অভিযোগ এখনও পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। অভিযোগ আসলে বার ও বেঞ্চে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবে আদালতপাড়ায় উমেদারদের কার্যক্রম নিয়ে কথাবার্তা রয়েছে।’
হাসান আলী বলেন, ‘যারা উমেদার, তারা সরকারি কর্মচারী নন। তারা পেশকার ও সেরেস্তাদারের সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আদালতে এত বেশি প্রেসার থাকে যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সামলানো কঠিন হয়ে যায়। তাই তাদের ব্যক্তিগত সহযোগিতার জন্য উমেদারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ গেলে জেলা জজ প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’
আদালতের ভেতরের জটিলতা ও উমেদারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অভিযুক্ত উমেদার নূর হোসাইন কালবেলাকে বলেন, ‘আমি সবাইকে সাহায্য সহযোগিতা করি। যারা আসে, যেভাবে দেওয়ার দরকার সেভাবে দেই। অনেকে দেখা যায়, নথি চেম্বারে আছে, আদেশ হয়নি। এভাবে যদি দেই, তারা খুশি হয়। আদালতের আদেশের ছবি আগে ভাগে খেলাপিদের পাঠানোর অভিযোগ সত্য নয়। আদেশের কপি আইনজীবী বা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজেই সংগ্রহ করে। সবাইকে খুশি করতে পারি না। বদনাম করার জন্য এসব অভিযোগ ওঠেছে। আমি চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত–১ এ দায়িত্বে আছি।’
আরেক অভিযুক্ত উমেদার হারুন-উর-রশীদ বলেন, ‘এত বড় জায়গায় বসে এসব করা কী সম্ভব? আমি সবসময় সেবা দিয়ে আসছি। জজ, অ্যাডভোকেটদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি অসহযোগিতা করছি কিনা। এসব অভিযোগ বানোয়াট। আমার পেশাগত মান ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তৈরি হচ্ছে।’
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল হক আখন্দ (বাহার) বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি জানান, আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। অর্থঋণ আদালতের অফিসার আলাদা, আদালত আলাদা। এসব বিষয় অর্থঋণের জজরা বলতে পারবেন।
তবে খোঁজে জানা গেছে, অর্থঋণ আদালতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই, যা অভিযোগ মোকাবিলা ও তদারকিতে বড় ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি করছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, উমেদারদের নিয়োগ কাঠামো ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব, আদালতভিত্তিক চাপ এবং নথি-প্রক্রিয়ার জটিলতা চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতকে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ব্যাংক, আইনজীবী ও আদালতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য অনুসারে, অভিযোগগুলো কার্যকর তদন্তের প্রয়োজন যা না হলে বিচার প্রক্রিয়া ও ঋণ আদায় দীর্ঘসূত্রতায় পড়বে।