আদালতে ম্যারাডোনার মৃত্যুর আগে শেষ দিনগুলোর করুণ বর্ণনা
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর শেষ দিনগুলো কেমন ছিল, আদালতে তার একটি হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন তার ম্যাসাজ থেরাপিস্ট নিকোলাস তাফারেল। তার দাবি, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন, শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে পা ফুলে গিয়েছিল, খেতেও চাইতেন না। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত পরিচর্যার প্রতিও তার কোনো আগ্রহ ছিল না। ২০২০ সালের নভেম্বরে ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে আর্জেন্টিনায় চলমান মামলায় সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। অবশ্য অভিযুক্তরা নিজেদের কোনো দায় স্বীকার করেননি। বৃহস্পতিবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তাফারেল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। বিছানা থেকে উঠতে চাইতেন না তিনি, খাবারের প্রতিও অনীহা ছিল। এমনকি গোসল বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মতো স্বাভাবিক কাজও করতে চাইতেন না। তাফারেলের ভাষায়, ‘তিনি বিছা
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর শেষ দিনগুলো কেমন ছিল, আদালতে তার একটি হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন তার ম্যাসাজ থেরাপিস্ট নিকোলাস তাফারেল। তার দাবি, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন, শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে পা ফুলে গিয়েছিল, খেতেও চাইতেন না। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত পরিচর্যার প্রতিও তার কোনো আগ্রহ ছিল না।
২০২০ সালের নভেম্বরে ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে আর্জেন্টিনায় চলমান মামলায় সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। অবশ্য অভিযুক্তরা নিজেদের কোনো দায় স্বীকার করেননি।
বৃহস্পতিবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তাফারেল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। বিছানা থেকে উঠতে চাইতেন না তিনি, খাবারের প্রতিও অনীহা ছিল। এমনকি গোসল বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মতো স্বাভাবিক কাজও করতে চাইতেন না।
তাফারেলের ভাষায়, ‘তিনি বিছানা থেকে উঠতেন না, খেতে চাইতেন না, গোসল করতে চাইতেন না, নিজের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতারও যত্ন নিতে চাইতেন না।’
ম্যারাডোনার এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে চিকিৎসকদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তাফারেল। আদালতে তার পাঠানো একটি অডিও বার্তাও শোনানো হয়, যেখানে তিনি চিকিৎসক দলের সদস্যদের আরও নিয়মিত ম্যারাডোনার কাছে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তার দাবি, ম্যারাডোনার দেখভালের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের তিনি বলেছিলেন, তারা যেন প্রতিদিন তাকে দেখতে যান। কিন্তু তার অভিযোগ, বিষয়টি জানানোর পরও তিনি দ্রুত বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাননি।
‘আমি তার মধ্যে যে সমস্যাগুলো দেখেছিলাম, সেগুলো জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বাস্তব পদক্ষেপ বা দ্রুত সমাধান দেখতে পাইনি,’ আদালতে বলেন তাফারেল।
এরপরই ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার আরও ভয়াবহ বর্ণনা দেন তিনি। জানান, পানি জমে ম্যারাডোনার শরীর ফুলে গিয়েছিল, বিশেষ করে তার পা ছিল অস্বাভাবিকভাবে ফোলা। ‘তিনি ফুলে গিয়েছিলেন, তার পা দুটোও ফুলে গিয়েছিল,’ বলেন তাফারেল।
চিকিৎসকদের বিষয়টি জানালে তারা তাকে শান্ত থাকতে বলেছিলেন বলেও আদালতে জানান তিনি। চিকিৎসকদের আশ্বাসে তিনিও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা করেছিলেন।
তাফারেল বলেন, ‘চিকিৎসকরা আমাকে শান্ত হতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, এসব উপসর্গ চলে যাবে। আপনি যখন উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন চিকিৎসকদের ওপরই আস্থা রাখেন। নিজেকে বোঝান, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি।’
ম্যারাডোনার মৃত্যুর আগের দিন, অর্থাৎ ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বরের একটি ঘটনাও আদালতে তুলে ধরেন তাফারেল। সেদিন তিনি ম্যারাডোনাকে তার সঙ্গে বসে ‘মাতে’ নামের একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় পান করার জন্য বাইরে আসতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ম্যারাডোনা তাতে রাজি হননি।
তাফারেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ম্যারাডোনা তাকে বলেছিলেন, ‘আমি কিছু চাই না, তাফিতা, এটাই।’
ম্যারাডোনার কথার অর্থ বুঝতে না পেরে তাফারেল তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা বলতে কী বোঝাচ্ছেন?’ জবাবে ম্যারাডোনা শুধু বলেন, ‘কিছু না, এটাই।’
স্প্যানিশ ভাষার ‘ya está’ কথাটির অর্থ প্রসঙ্গভেদে ‘ঠিক আছে’ কিংবা ‘সব শেষ’- দুইভাবেই বোঝানো যায়। তাফারেলের বর্ণনায় সেই মুহূর্তটি যেন মৃত্যুর ঠিক আগের এক অস্বস্তিকর ইঙ্গিত হয়ে উঠে এসেছে।
পরদিন, ২৫ নভেম্বর, নিজ বিছানায় একা অবস্থায় মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র পালমোনারি এডিমা- অর্থাৎ ফুসফুসে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছিল তার।
ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর থেকেই তার চিকিৎসা ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায়ই সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে এই বিচার চলছে। অভিযোগ, তাদের সম্ভাব্য অবহেলা ম্যারাডোনার মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অভিযুক্তদের কেউই অভিযোগ স্বীকার করেননি। তাদের অধিকাংশের দাবি, তারা নিজ নিজ বিশেষায়িত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ম্যারাডোনার মৃত্যুর সরাসরি চিকিৎসাগত কারণের সঙ্গে তাদের ভূমিকার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
আদালতে তাফারেলের সাক্ষ্য তাই মামলাটিতে নতুন করে আবেগ ও গুরুত্ব যোগ করেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে ম্যারাডোনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা ফুটবলবিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই কিংবদন্তির শেষ সময়কে আরও করুণ করে তুলেছে।
বিশ্বকাপজয়ী ম্যারাডোনার মৃত্যু পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তার শেষ দিনগুলোর চিকিৎসা, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো আদালতের রায়ের অপেক্ষায়। বিচারপ্রক্রিয়া চলতি মাস পেরিয়েও গড়াতে পারে।
আইএইচএস/
What's Your Reaction?