আনার চাষে সফল শিবলী সাদিক, বাগানে আছে ৩০০ গাছ

বাগানে আছে প্রায় ৩০০টি আনার গাছ প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বিক্রি বছরে কয়েক লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার একটি ছোট্ট গ্রাম। চারদিকে সবুজের সমারোহের মাঝখানে সারি সারি লালচে আনারের বাগান। কোথাও মৌমাছির গুঞ্জন, কোথাও আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার নজরদারি। কৃষির প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা শিবলী সাদিক শুভ। বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো একটি আনার গাছ থেকে শুরু হওয়া তার স্বপ্ন আজ রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক সফলতায়। দেড় বিঘার কিছু বেশি জমিতে গড়ে তোলা আনার বাগান এখন শুধু তার আয়ের উৎস নয় বরং স্থানীয় তরুণদের কাছেও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি গ্রামের বাসিন্দা শিবলী সাদিক শুভ কয়েক বছর আগে ভারত থেকে একটি আনার গাছ নিয়ে এসে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন। কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই আশাব্যঞ্জক ফলন দেয়। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন বাণিজ্যিকভাবে আনার চাষ করার। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি আনার বাগান। বর্তমানে তার

আনার চাষে সফল শিবলী সাদিক, বাগানে আছে ৩০০ গাছ
  • বাগানে আছে প্রায় ৩০০টি আনার গাছ
  • প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বিক্রি
  • বছরে কয়েক লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার একটি ছোট্ট গ্রাম। চারদিকে সবুজের সমারোহের মাঝখানে সারি সারি লালচে আনারের বাগান। কোথাও মৌমাছির গুঞ্জন, কোথাও আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার নজরদারি। কৃষির প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা শিবলী সাদিক শুভ।

বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো একটি আনার গাছ থেকে শুরু হওয়া তার স্বপ্ন আজ রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক সফলতায়। দেড় বিঘার কিছু বেশি জমিতে গড়ে তোলা আনার বাগান এখন শুধু তার আয়ের উৎস নয় বরং স্থানীয় তরুণদের কাছেও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি গ্রামের বাসিন্দা শিবলী সাদিক শুভ কয়েক বছর আগে ভারত থেকে একটি আনার গাছ নিয়ে এসে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন। কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই আশাব্যঞ্জক ফলন দেয়। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন বাণিজ্যিকভাবে আনার চাষ করার। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি আনার বাগান। বর্তমানে তার বাগানে আছে প্রায় ৩০০টি আনার গাছ।

শিবলী সাদিক জানান, আনার চাষে সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রতিটি গাছের পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাণিজ্যিক সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেন।

তার বাগানে বছরে দুই মৌসুমে আনার উৎপাদন হয়। শীতকালীন মৌসুমে একটি ফল পরিপক্ব হতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগে, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে সাড়ে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। আবহাওয়া ও পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে ফলের আকার, স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখা হয় বলে জানান তিনি।anar

প্রযুক্তিগত শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিবলী তার বাগানে স্থাপন করেছেন এআই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা। এই ক্যামেরার মাধ্যমে বাগানের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে নিরাপত্তা ব্যয় কমেছে, পাশাপাশি দূরে থেকেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাগানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন তিনি। কৃষিতে প্রযুক্তির এমন ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

শুধু লাভের হিসাবেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে শিবলীর এই উদ্যোগ। তার বাগানে নিয়মিত কলম তৈরির কাজে দুইজন শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া বাগানের পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ফল সংগ্রহ এবং অন্যান্য কাজে প্রতিদিন আট থেকে দশজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

স্থানীয় শ্রমিকদের মতে, এই বাগান তাদের নিয়মিত আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। আনার চাষে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরাগায়ন এবং ফুল ঝরে যাওয়ার সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবিলায় শিবলী বেছে নিয়েছেন প্রাকৃতিক পদ্ধতি। তিনি বাগানে স্থাপন করেছেন মৌমাছির বাক্স। এর ফলে মৌমাছির মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফলনের পরিমাণও বেড়েছে।

উদ্যোক্তা শিবলী সাদিক বলেন, ‌‘পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রায় ৪৯০ কেজি আনার বিক্রি করেছি। প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় হয়েছে।’

তার হিসাব অনুযায়ী, একটি গাছ থেকে বছরে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার আনার উৎপাদন সম্ভব। সেই হিসেবে দেড় বিঘার কিছু বেশি জমি থেকে বছরে কয়েক লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা আছে। শিবলীর এই উদ্যোগ এরই মধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।

প্রতিবেশী মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই আনার চাষ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু এখন শিবলীর বাগানের সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই নতুন করে ফল চাষের বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতেও যে সফল উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন শিবলী।’anar

বর্তমানে শিবলী আরও একশটি আনার গাছ নিয়ে নতুন বাগান তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের ছোট পরিসরে শুরু করে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের পরামর্শ দিচ্ছেন। তার বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অধ্যবসায় থাকলে কৃষিই হতে পারে তরুণদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পেশা।

প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রাকৃতিক পরাগায়ন ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত পরিচর্যার সমন্বয়ে আনার চাষে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছেন শিবলী সাদিক শুভ। তার এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয় বরং এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক কৃষি হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি। তার এই সফলতার গল্প হয়তো আরও অনেক তরুণকে কৃষিকে নতুনভাবে ভাবতে এবং উদ্ভাবনী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করবে।

চারঘাট উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আল মামুন হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সাদিক শুভকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সারসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কৃষি উপকরণও সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি নিজেই হারভেস্টিং যন্ত্র তৈরি করেছেন। ফলে একদিকে উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচও কমেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আনার বাগানে রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব উপাদানের ব্যবহার বেশি করায় পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ছাড়া বাগানের প্রুনিং (শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই) বিষয়ে কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই পরামর্শ অনুসরণ করায় তার বাগান আগের তুলনায় আরও সুপরিচর্যিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে।’

মো. আল মামুন হাসান বলেন, ‘সাদিক শুভ দেশের জন্য অনুকরণীয় একজন উদ্যোক্তা। তিনি নিজে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি তার প্রতিষ্ঠানে কয়েকজনের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তরুণরা যদি শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে এগিয়ে আসেন, তাহলে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং বেকারত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।’

anar

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিদওয়ানুল কারিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আনার একটি উচ্চমূল্যের ফল, যার বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা বাংলাদেশে দিনদিন বাড়ছে। সঠিক জাত নির্বাচন, নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম সার প্রয়োগ, প্রুনিং এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ ফসল থেকে ভালো ফলন ও লাভ পাওয়া সম্ভব। নতুন উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ নিয়ে আনার চাষে এগিয়ে এলে দেশের ফল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

এমওএইচএম/এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow