আমি এখনো স্বপ্ন দেখি : বিদিশা এরশাদ
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই একটা বার্তা এসেছিল ফোনে। অপরিচিত একটি মেয়ের নাম্বার থেকে। লেখা ছিল, ‘আপু, আমি জানি না আপনি পড়বেন কিনা। কিন্তু আজকের দিনে শুধু একটু বলতে চাইলাম, আপনি আছেন বলে আমি এখনো স্বপ্ন দেখি।’
বার্তাটি পড়ে আমি কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। কোনো কথা বললাম না, কোনো উত্তর পাঠালাম না। শুধু ভাবলাম, এই মেয়েটি জানে কি, আমার নিজের জীবনে এমন কতগুলো সকাল এসেছিল, যেদিন স্বপ্ন দেখার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না?
আজ ৮ মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ ফুল দেওয়া হচ্ছে, বক্তৃতা হচ্ছে, আলোচনা সভা হচ্ছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে উদযাপনের আড়ালে একটা প্রশ্ন বারবার ভেতরে এসে ধাক্কা দেয়, যে মেয়েটি গভীর রাতে একা বসে কাঁদে, তার কাছে এই দিনটির মানে কী?
আমি জানি সেই উত্তর। কারণ একসময় আমি নিজেই সেই মেয়েটি ছিলাম। মানুষ বাইরে থেকে যা দেখে, সেটা সবসময় পুরো সত্য হয় না। আমাকে দেখে অনেকে ভাবে, এই মানুষটি বোধহয় কখনও ভাঙেননি। কিন্তু যে গাছটি ঝড়ের পরেও দাঁড়িয়ে থাকে, সে কি কখনও কাঁপেনি? কাঁপে। ভেতর থেকে কাঁপে। তবু শিকড় আঁকড়ে থাকে।
আমার জীবনে সমালোচনা এসেছে এমনভাবে, যেন একসঙ্গে অনেকগুলো পাথ
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই একটা বার্তা এসেছিল ফোনে। অপরিচিত একটি মেয়ের নাম্বার থেকে। লেখা ছিল, ‘আপু, আমি জানি না আপনি পড়বেন কিনা। কিন্তু আজকের দিনে শুধু একটু বলতে চাইলাম, আপনি আছেন বলে আমি এখনো স্বপ্ন দেখি।’
বার্তাটি পড়ে আমি কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। কোনো কথা বললাম না, কোনো উত্তর পাঠালাম না। শুধু ভাবলাম, এই মেয়েটি জানে কি, আমার নিজের জীবনে এমন কতগুলো সকাল এসেছিল, যেদিন স্বপ্ন দেখার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না?
আজ ৮ মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ ফুল দেওয়া হচ্ছে, বক্তৃতা হচ্ছে, আলোচনা সভা হচ্ছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে উদযাপনের আড়ালে একটা প্রশ্ন বারবার ভেতরে এসে ধাক্কা দেয়, যে মেয়েটি গভীর রাতে একা বসে কাঁদে, তার কাছে এই দিনটির মানে কী?
আমি জানি সেই উত্তর। কারণ একসময় আমি নিজেই সেই মেয়েটি ছিলাম। মানুষ বাইরে থেকে যা দেখে, সেটা সবসময় পুরো সত্য হয় না। আমাকে দেখে অনেকে ভাবে, এই মানুষটি বোধহয় কখনও ভাঙেননি। কিন্তু যে গাছটি ঝড়ের পরেও দাঁড়িয়ে থাকে, সে কি কখনও কাঁপেনি? কাঁপে। ভেতর থেকে কাঁপে। তবু শিকড় আঁকড়ে থাকে।
আমার জীবনে সমালোচনা এসেছে এমনভাবে, যেন একসঙ্গে অনেকগুলো পাথর ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভুল বোঝাবুঝি এসেছে। কঠিন সময় এসেছে। এমন মুহূর্ত এসেছে, যখন মনে হয়েছে হয়তো থেমে যাওয়াই ভালো। কিন্তু তখন কোথা থেকে যেন একটা শক্তি আসে। সেই শক্তিটা কোথা থেকে আসে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি দীর্ঘদিন খুঁজেছি। এখন জানি। সেই শক্তি আসে আত্মসম্মান থেকে। সেই বোধ থেকে, যেটা বলে, তুমি যা, সেটার জন্য তোমার লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।
আজ যখন কোনো তরুণী আমাকে বলে সে আমাকে জীবনের অনুপ্রেরণা ভাবে, আমি একটু থমকে যাই। এই ভালোবাসা আমার কাছে সুখ নয়, দায়িত্ব। কারণ একটি মেয়ে যাকে দেখে স্বপ্ন দেখতে শেখে, সেই মানুষটি যদি একদিন মাথা নত করে নেয়, তাহলে সেই মেয়েটির ভেতরেও কিছু একটা ভেঙে পড়ে।
তাই আমি মাথা নত করতে শিখিনি। এটা অহংকার নয়। এটা বেঁচে থাকার একটি সিদ্ধান্ত।
আজকের বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নারীরা কাজ করছে, উদ্যোগ নিচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন তবুও থেকে যায়। সত্যিকার অর্থে কি নারী নিরাপদ? শুধু ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও?
উত্তরটা সহজ নয়। তবে এটুকু বলা যায়, যতদিন একটি মেয়ে ভয়ে নিজের মত চেপে রাখে, যতদিন একজন নারীকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় শুধু নারী বলেই, ততদিন উদযাপনের পাশে প্রশ্নটা থেকেই যাবে। আর এই প্রশ্নটাকে বেঁচিয়ে রাখাটাও একটা কাজ।
আমি স্বপ্ন দেখি এখনো। এই বয়সে এসেও। হয়তো বেশি দেখি।
আমি বিশ্বাস করি, এই দেশকে আমার দেওয়ার মতো এখনও অনেক কিছু আছে। এই বিশ্বাসটাই আমাকে প্রতিদিন সকালে উঠিয়ে দেয়।
আর সেই অপরিচিত মেয়েটির কথায় ফিরে আসি। সে লিখেছিল, আমি আছি বলে সে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আসল সত্যটা হলো উল্টো। ওই মেয়েটির মতো লাখো তরুণীর স্বপ্নই আমাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে। তাদের চোখের ভেতরে আমি নিজের শক্তি খুঁজে পাই।
একজন শক্তিশালী নারী শুধু নিজের জীবন বদলায় না, এই কথাটি আমি অনেকবার বলেছি। কিন্তু আজকের দিনে মনে হচ্ছে, কথাটির আরেকটি দিক আছে। একটি সমাজও তখনই বদলায়, যখন সেই সমাজের মানুষেরা নারীর শক্তিকে ভয় না পেয়ে স্বাগত জানায়।
সেই দিন কি আসবে?
আসবে। আমি জানি আসবে। কারণ আজকের যে মেয়েটি প্রশ্ন করতে শিখেছে, সে কালকে উত্তর তৈরি করবে।
আজ নারী দিবসে আমার একটাই কথা। নিজের শক্তিকে ছোট করো না। নিজের স্বপ্নকে লুকিয়ে রেখো না। এবং মনে রেখো, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকাটা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা তোমার অধিকার।