আরতি-পুষ্পাঞ্জলিতে বিদ্যাদেবীর আরাধনা, ‘মব’ রুখে দেওয়ার বার্তা

বিদ্যা ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভের আশায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির-মণ্ডপে বাণী অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলিতে আরাধনা করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে বাণী বন্দনা এবং পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর বন্দনা করা হয়। হাতে বীণা থাকে বলে সরস্বতীকে বীণাপাণিও বলা হয়। সাদা রাজহাঁস এ দেবীর বাহন। ঐতিহ্য অনুযায়ী এ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরোহিতের মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বিদ্যাদেবীর মন্দিরে সন্তানদের প্রথম বিদ্যার পাঠের হাতেখড়ির আয়োজন করেন। সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। প্রতি বছর এখানকার পূজা একটি বর্ণিল উৎসবে পরিণত হয়। এবারও হলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সরস্বতী পূজা চমৎকার এক উৎসবে পরিণত হয়। খেলার মাঠের চারিদিক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী দেবীর পূজার আয়োজন করা হয় এবারে। মণ্ডপের বেশিরভাগই বিভিন্ন বিভাগ এবং

আরতি-পুষ্পাঞ্জলিতে বিদ্যাদেবীর আরাধনা, ‘মব’ রুখে দেওয়ার বার্তা

বিদ্যা ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভের আশায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির-মণ্ডপে বাণী অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলিতে আরাধনা করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে বাণী বন্দনা এবং পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর বন্দনা করা হয়। হাতে বীণা থাকে বলে সরস্বতীকে বীণাপাণিও বলা হয়। সাদা রাজহাঁস এ দেবীর বাহন। ঐতিহ্য অনুযায়ী এ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরোহিতের মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বিদ্যাদেবীর মন্দিরে সন্তানদের প্রথম বিদ্যার পাঠের হাতেখড়ির আয়োজন করেন।

সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। প্রতি বছর এখানকার পূজা একটি বর্ণিল উৎসবে পরিণত হয়। এবারও হলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সরস্বতী পূজা চমৎকার এক উৎসবে পরিণত হয়। খেলার মাঠের চারিদিক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী দেবীর পূজার আয়োজন করা হয় এবারে। মণ্ডপের বেশিরভাগই বিভিন্ন বিভাগ এবং সমাজের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের ‘থিমের’ আদলে গড়া হয়। হল প্রশাসনের পূজা হলের উপাসনালয়ে এবং বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোর পূজা হলের মাঠে স্থাপিত নিজস্ব মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রতিবারের মতো এবারও হলের পুকুরে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা স্থাপন করেন দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা, যা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। আর প্রতিটি মণ্ডপেই শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে সকাল থেকে।

দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব’ রুখে দেওয়ার বার্তা ছড়িয়ে দিতে একটি মণ্ডপ বানিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা শুধু থেমে থাকা কলম কিংবা পোড়া সংবাদপত্রের কথা বলিনি। কথা বলতে চেয়েছি সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে। অস্পৃশ্য হরিজন থেকে রক্ত জল করে জীবনের শেষ জীবনীশক্তি নিংড়ে দেওয়া চা শ্রমিক, যিনি যোগ্য মজুরিটুকু পায় না কিংবা প্যালেস্টাইনে ভাঙা ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুর লাশ। সবকিছুকে ঘিরে একটা বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি- যুদ্ধ না, শান্তি; মব নয়, সুবিচার।

‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড’ তুলে ধরে মণ্ডপ বানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ। তাদের একজন বলেন, ‘মা সরস্বতী সবার। আমরা চাই, পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার কৃপা লাভ করুক। এ বিশ্ব শান্তিময় হোক।’

অন্যদিকে লাইব্রেরির আদলে সরস্বতীর মণ্ডপ বানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। এই বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, সরস্বতী বিদ্যার দেবী। বইও যেহেতু বিদ্যার প্রতীক, আমরা চেষ্টা করেছি সরস্বতী বিদ্যা দান করুক। আলোকিত মানুষ হতে হলে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।

জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজায় দর্শনার্থীদের ভিড়ও দেখা গেছে চোখে পড়ার মতো। বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ- সব বয়সের মানুষই এসেছেন। অনেকে পরিবার নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন এবারের সরস্বতী পূজা দেখতে। বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, হলের মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এ ছাড়া হলের উপাসনালয়সহ পুরো হলজুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়।

মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা সৌমেন মন্ডল কালবেলাকে বলেন, জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজার জন্য পুরো এক বছর ধরে আমরা অপেক্ষায় থাকি। এখানে এলে মনে হয়, এক অন্যরকম আবহ। এত সুন্দর করে সাজানো, আয়োজন, এত বিশাল জায়গা ভালো লাগে। তাই পরিবার নিয়ে এলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অন্যান্য বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সরস্বতী পূজা পালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হল প্রাধ্যক্ষ দেবাশীষ পাল। তিনি কালবেলাকে বলেন, এ বছর এখানে একসঙ্গে মোট ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজা হচ্ছে। খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এসব পূজা হচ্ছে। তবে সকাল থেকে এত লোকের জনসমাগম, আমি এর আগে কখনো দেখিনি। প্রথমে দুটি গেট রেখেছিলাম, পরে আরেকটি গেট খুলে দিতে হয়েছে মানুষের জনসমাগমের জন্য। সকাল থেকে এত মানুষ- আমি মনে করি, এবার আমাদের সরস্বতী পূজা গিনেস বুকে নাম লিখাবে। তিনি বলেন, এ উৎসবে আসা সব পুণ্যার্থীর শুভাগমনে জগন্নাথ হল সম্প্রীতির বন্ধনের এক অপূর্ব মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।

এবার জগন্নাথ হলে দু’দিনব্যাপি সরস্বতী পূজার আয়োজনে থাকছে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা এবং রক্তদান কর্মসূচি। এ ছাড়াও হলের ভেতরে দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের জন্য বেশ কিছু রাইড, খেলনা ও খাবার দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এবারের পূজায়। গত বছর হল অভ্যন্তরে হল প্রশাসনের পূজাসহ ৭৪টি মণ্ডপে বিদ্যার দেবীর পূজা হয়েছিল।

জগন্নাথ হলে ঐতিহ্যবাহী এই পূজা পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সহসভাপতি অ্যাডভোকেট তাপস কুমার পাল, যুগ্ম সম্পাদক শুভাশীষ বিশ্বাস সাধন।

এ ছাড়া ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা হয়েছে ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দির ও শ্রীমা আনন্দময়ী আশ্রমসহ ঢাকার বিভিন্ন মন্দিরেও। রমনা কালীমন্দির ও শ্রীমা আনন্দময়ী আশ্রমের পূজা পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অপর্ণা রায় দাস।

এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ, ২টি ইনস্টিটিউট এবং একমাত্র ছাত্রীহলসহ মোট ৩৯টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow