আসহাবে কাহাফের ঘটনা
কোরআনে বর্ণিত ঘটনাসমূহ পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনাবলী মুসলমানদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। এর উদ্দেশ্য মুসলমানদের সামনে কিছু শিক্ষা-নির্দেশনা তুলে ধরা, ইমান ও হেদায়াতের পথে অবিচল থাকতে উৎসাহ দেওয়া, পাশাপাশি বিভিন্ন জাতি ও রাসুলদের ধর্মীয় ইতিহাস সংক্রান্ত সত্য উন্মোচন এবং সেগুলোকে বিকৃতি ও কুসংস্কার থেকে রক্ষা করা। কোরআনের আয়াতগুলোতে তিন ধরনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে: এক. নবীগণের দ্বীন প্রচার, মোজেজা, তাদের কওমের অবস্থান—যারা বিশ্বাস করেছিল তাদের পুরস্কার এবং যারা কুফরি করেছিল তাদের পরিণতি। দুই. পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের অনুসারীদের সূত্রে মানুষের মধ্যে আলোচিত বড় বড় ঘটনাসমূহ; যেমন—কারুন, আসহাবে কাহাফ এবং হস্তিবাহিনীর ঘটনা। তিন. নবীজির (সা.) নবুয়্যত প্রাপ্তি, তাঁর দাওয়াত, যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা; যেমন—হুনাইনের যুদ্ধ, ওহুদের যুদ্ধ, বদরের যুদ্ধ, জিহারের ব্যাপারে এক নারীর বিতর্ক ইত্যাদি ঘটনা এবং এ সম্পর্কিত বিধিবিধান। আসহাবে কাহাফের পরিচয় ও কোরআনের বর্ণনা ‘আসহাবে কাহাফ’ অর্থ গুহার অধিবাসীগণ। কোরআনে ‘আসহাবে কাহাফ’ বলে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা ছিলেন সাত জন তরুণ যারা এমন
কোরআনে বর্ণিত ঘটনাসমূহ
পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনাবলী মুসলমানদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। এর উদ্দেশ্য মুসলমানদের সামনে কিছু শিক্ষা-নির্দেশনা তুলে ধরা, ইমান ও হেদায়াতের পথে অবিচল থাকতে উৎসাহ দেওয়া, পাশাপাশি বিভিন্ন জাতি ও রাসুলদের ধর্মীয় ইতিহাস সংক্রান্ত সত্য উন্মোচন এবং সেগুলোকে বিকৃতি ও কুসংস্কার থেকে রক্ষা করা।
কোরআনের আয়াতগুলোতে তিন ধরনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে:
- এক. নবীগণের দ্বীন প্রচার, মোজেজা, তাদের কওমের অবস্থান—যারা বিশ্বাস করেছিল তাদের পুরস্কার এবং যারা কুফরি করেছিল তাদের পরিণতি।
- দুই. পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের অনুসারীদের সূত্রে মানুষের মধ্যে আলোচিত বড় বড় ঘটনাসমূহ; যেমন—কারুন, আসহাবে কাহাফ এবং হস্তিবাহিনীর ঘটনা।
- তিন. নবীজির (সা.) নবুয়্যত প্রাপ্তি, তাঁর দাওয়াত, যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা; যেমন—হুনাইনের যুদ্ধ, ওহুদের যুদ্ধ, বদরের যুদ্ধ, জিহারের ব্যাপারে এক নারীর বিতর্ক ইত্যাদি ঘটনা এবং এ সম্পর্কিত বিধিবিধান।
আসহাবে কাহাফের পরিচয় ও কোরআনের বর্ণনা
‘আসহাবে কাহাফ’ অর্থ গুহার অধিবাসীগণ। কোরআনে ‘আসহাবে কাহাফ’ বলে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা ছিলেন সাত জন তরুণ যারা এমন এক রাজার হাত থেকে নিজেদের দ্বীন বা ধর্ম রক্ষার্থে পালিয়েছিলেন, যে মূর্তিপূজা করত এবং জনগণকে নিজের ধর্ম অনুসরণ করতে বাধ্য করত। ফলে ওই তরুণরা শহর ছেড়ে শহরের বাইরের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। অধিকাংশ বর্ণনা অনুযায়ী ওই তরুণরা ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ.) ধর্মের অনুসারী ছিলেন। আর সেই মুশরিক রাজার নাম ছিল 'দাকিউস' বা 'দাকানিউস' এবং ওই শহরের নাম ছিল 'আফসুস' বা 'তারসুস'। (তাফসিরে তাবারী, তাফসিরে কুরতুবী)
পবিত্র কোরআনে আসহাবে কাহাফকে অত্যন্ত চমৎকার বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে যা থেকে বোঝা যায় তারা দৃঢ় ইমানদার ছিলেন এবং তাদের ইমানের দৃঢ়তা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেছিলেন। আল্লাহ আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তোমার কাছে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা কয়েকজন তরুণ, যারা তাদের রবের প্রতি ইমান এনেছিল এবং আমি তাদের হেদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। (সুরা কাহাফ: ১৩)
পবিত্র কোরআনে তাদের সংখ্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিতর্ককারীরা বলবে, ‘তারা ছিল তিন জন, চতুর্থ হল তাদের কুকুর’। আর কতক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন, ষষ্ঠ হল তাদের কুকুর’। এসবই অজানা বিষয়ে অনুমান করে। আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাত জন; অষ্টম হল তাদের কুকুর’। বল, ‘আমার রবই তাদের সংখ্যা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত’। কম সংখ্যক লোকই তাদেরকে জানে। সুতরাং স্পষ্ট আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের ব্যাপারে বিতর্ক করো না। আর তাদের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে কারো কাছে জানতে চেয়ো না। (সুরা কাহাফ: ২২)
যে পরিস্থিতিতে আসহাবে কাহাফ গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন
আসহাবে কাহাফ বা গুহায় আশ্রয় নেওয়া তরুণরা ছিলেন অভিজাত পরিবারের, অনেকের মতে রাজপরিবারের সদস্য এবং বয়সে তারা ছিলেন তরুণ। তারা যে দেশে বসবাস করতেন, ওই দেশের রাজা দাকিউস ছিলেন মূর্তিপূজক এবং খৃষ্টধর্মের বিরুদ্ধে খুবই কঠোর, হজরত ঈসার (আ.) অনুসারী কাউকে পেলে তিনি হত্যা করতেন। অভিজাত পরিবারের ওই তরুণরা রাজার মূর্তিপূজার ধর্ম অনুসরণ করতে অস্বীকার করলে তাদেরকে রাজার সামনে হাজির করা হয়। রাজা তাদেরকে ইমান ত্যাগের জন্য চাপ দেন, হত্যার হুমকি দেন। কিন্তু তাদের দৃঢ়তা দেখে রাজা তাদের কিছুটা সময় দেন এই ভেবে যে, তারা হয়তো অল্প বয়সের কারণে এমন করছে এবং পরে তারা মূর্তিপূজার ধর্মে ফিরে আসবে।
ওই সময় রাজার হাত থেকে ছাড়া পেলেও তরুণরা বুঝতে পারেন এই শহরে বা লোকালয়ে থাকলে তাদেরকে আবার পাকড়াও করা হবে এবং মূর্তিপূজা করতে বাধ্য করা হবে। তাই কিছুদিন পর রাজা যখন সফরে বের হন, তরুণরা শহর ছেড়ে বের হয়ে যান এবং 'বাঞ্জলুস' নামক এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। সেখানে তারা দিনরাত ইবাদত ও জিকিরে মগ্ন হয়ে থাকতেন। খাবারের প্রয়োজন হলে তাদের একজন ছদ্মবেশে শহরে গিয়ে খাবার নিয়ে আসতেন। (তাফসিরে কুরতুবী, তাফসিরে বাগাভী, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
সুদীর্ঘ কালের ঘুম
রাজা ফিরে এসে তরুণদের খোঁজ করে জানতে পারেন তারা শহর ছেড়ে পালিয়েছেন। তিনি তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। রাজার সৈন্য ও অনুচররা ওই গুহা এবং তরুণদের সন্ধান পেয়ে যায়। রাজা তখন সসৈন্যে ওই গুহার কাছে যান এবং গুহার মুখ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন যেন তারা ভেতরেই মারা যান। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তারা দীর্ঘকালের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন এবং জীবিত থাকেন।
দীর্ঘকাল পর যখন ওই দেশের শাসনক্ষমতায় একজন ইমানদার শাসক ছিলেন, আল্লাহর নির্দেশে একজন রাখাল তার ভেড়া রক্ষার জন্য গুহার মুখ খুলে ফেলে। তখন আল্লাহর ইচ্ছায় তরুণদের ঘুম ভেঙে যায়। তারা নিজেদের মধ্যে কত সময় ঘুমিয়েছেন তা নিয়ে তর্ক করেন। এরপর একজনকে খাবার আনতে শহরে পাঠানো হয়। তিনি শহরে গিয়ে দেখেন, সব কিছু কেমন অচেনা হয়ে গেছে। যখন তিনি পুরনো আমলের মুদ্রা বের করেন, মানুষ অবাক হয়ে তাকে রাজার কাছে নিয়ে যায়। তিনি রাজাকে সব ঘটনা খুলে বলেন। রাজা ও ওই শহরের বাসিন্দারা তখন গুহায় গিয়ে আল্লাহর অলৌকিক এই নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। যে তরুণ শহরে গিয়েছিলেন তিনি গুহায় ফিরে বন্ধুদের সব কিছু খুলে বলেন। এরপর আল্লাহর ইচ্ছায় তারা সবাই মৃত্যুবরণ করেন। তাদের স্মরণে সেখানে একটি গির্জা নির্মাণ করা হয়। (তাফসিরে তাবারী)
কোরআনে এই ঘটনা অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট
রাসুলের (সা.) নবুয়্যতের সত্যতা প্রমাণ এবং মক্কার মুশরিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এই সুরা নাজিল হয়। মক্কার মুশরিকরা নজর ইবনে হারিস ও উকবা ইবনে আবি মুআইতকে মদিনার ইহুদি পন্ডিতদের কাছে পাঠিয়েছিল নবীজি (সা.) সম্পর্কে জানতে। ইহুদিরা তাদের তিনটি প্রশ্ন শিখিয়ে দেয়: ১. আসহাবে কাহাফের ঘটনা সম্পর্কে আপনি কী জানেন? ২. জুলকারনাইন কে ছিলেন? ৩. রুহ বা আত্মা কী? তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তাআলা সুরা কাহাফ নাজিল করেন এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন। (দুরারুস-সুন্নিয়্যাহ)
সূত্র: মাওযু ডট কম
ওএফএফ
What's Your Reaction?