“আমি এখন ঠিকভাবে হাঁটতে পারি না, আমার শরীরের বাম পাশটা প্রায় অচল। প্যারালাইসিস রোগীর মতোই আমার বর্তমান অবস্থা।” অশ্রুসিক্ত চোখে নিজের শারীরিক পরিস্থিতির কথা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ সায়েম।
গত ৩১ আগস্ট স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন সায়েম। দীর্ঘ সময় লাইফ সাপোর্টে থেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও এখন তাকে লড়তে হচ্ছে জীবন-যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায়। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিলেও এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শুধু সায়েম নন, গুরুতর আহত নাঈমুল ইসলাম ও মামুন মিয়ার জীবনও এখন কাটছে অনিশ্চয়তায়।
সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী আহত হলেও গুরুতর আহত হন সায়েম, নাঈমুল ও মামুন। সায়েম আইসিইউতে ছিলেন দীর্ঘদিন। মামুন মিয়ার মাথার খুলি ফ্রিজে রেখে অপারেশন করতে হয়েছে। নাঈমুল আক্রান্ত হয়েছিলেন ভাসকুলার ইনজুরিতে।
সায়েম জানান, শুরুতে প্রশাসন পাশে থাকলেও এখন আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে রিলিজের পর আমাদের থাকার সুব্যবস্থার জন্য অনুরোধ জানালে প্রশাসনের কেউ ফোন ধরেননি। উল্টো আমার এক বন্ধুকে জানানো হয়েছে- সবকিছুর একটা প্রটোকল আছে, সব খরচ বহন করা সম্ভব নয়।
সায়েমের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে খরচ করা প্রায় এক লাখ টাকার বিল জমা দিলেও দেড় মাসে এক টাকাও পাননি তিনি। মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সায়েম এখন একটি চাকরির নিশ্চয়তা চাইলেও প্রশাসন শুধু ‘আশ্বাসেই’ সীমাবদ্ধ।
একই অভিজ্ঞতা নাঈমুলেরও। তিনি জানান, তার চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। প্রশাসন মাত্র দেড় লাখ টাকা দিলেও বাকি টাকার জন্য এখনো ঘুরছেন তিনি।
নাঈমুল আক্ষেপ করে বলেন, অসুস্থ শরীরে উপাচার্যের কাছে গেলে পাঠানো হয় কমিটির কাছে, কমিটি পাঠায় অন্য স্যারের কাছে। আমাদের সঙ্গে এখন এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন এই দায়িত্বটা তাদের ওপর বোঝা।
সংঘর্ষের পর চবি কর্তৃপক্ষ ১০ তলা ভবন নির্মাণ, মডেল থানা স্থাপন, পুলিশ বক্স, হটলাইন সার্ভিস চালু এবং জড়িতদের বিচারসহ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ৫ মাস পার হলেও একটি সিদ্ধান্তও বাস্তবে দৃশ্যমান হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের দাবি, হটলাইন সার্ভিস চালু হয়েছে। তবে সহকারী প্রক্টর ও ছাত্র প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
হটলাইন কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন ফারুকী জানান, জনবল সংকটের কারণে হটলাইনটি কার্যকর নয় এবং ছুটির দিনে তা বন্ধ থাকে।
মামলার গতিপথ ও প্রশাসনের উদাসীনতা
সংঘর্ষের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ১ হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়ে খোদ বাদীই অন্ধকারে।
নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান ও মামলার বাদী আব্দুর রহিম বলেন, মামলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। অথচ সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন বলছেন, বাদী হিসেবে দায়ভার আব্দুর রহিমেরই।
এদিকে হাটহাজারী থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই জামিনে মুক্ত। শুধু এক নম্বর আসামি হানিফ কারাগারে আছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বর্তমানে ক্যাম্পাস এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
আহতদের চিকিৎসা বিষয়ে জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক শাহাদাত হোছাইন বলেন, আমরা প্রথম থেকে বহন করে আসছি, কিন্তু এখন হয়তো কিছু মিস হয়েছে। যেহেতু এই কমিটির আমি একাই সদস্য না বাকি আরও সদস্য আছে। এখানে অন্যান্য বিষয় একটি লম্বা প্রসেসিংয়ের মধ্যে আছে। ওদের ট্রিটমেন্ট ওরা পুরোপুরি ঠিক না হওয়ায় পর্যন্ত চলবে, আমাদের কোনো সদস্য এখনো পর্যন্ত বলেনি যে ট্রিটমেন্ট বন্ধ করে দিব। আর এখানে আমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আছে।
যোগাযোগ ও চিকিৎসার ব্যাপারে চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি এবং আমাদের প্রায় কথা হয়। আমরা প্রশাসনকে তাদের টাকা এবং চাকরির বিষয়টি নিয়ে বারবার বলছি। তাদের পূর্বের খরচগুলো দেওয়া হয়েছে এবং বাকিগুলা দ্রুত দিলেই সুবিধা হতো।
আহতদের অভিযোগের বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, চিকিৎসার জন্য আলাদা কমিটি আছে। আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করছি, বাকি টাকাও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দিয়ে দেওয়া হবে।
আহত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চয়তায়, তখন প্রশাসনের এই ধীরগতি ও ‘ফাইল চালাচালি’র নীতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা চান দ্রুত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।