ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার সত্যিকারের পরীক্ষা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ নিশ্চিত হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী, এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বের হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাধারণত তিন বছরের একটি ক্রান্তিকালীন বা ট্রানজিশন সময় দিয়ে থাকে। সেই হিসেবে, ইইউ বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা, যা ‘এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ)’ নামে পরিচিত, তা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বজায় থাকবে।  এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় কাঠামোগত পরীক্ষা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ২১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের সামগ্র

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার সত্যিকারের পরীক্ষা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ নিশ্চিত হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী, এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বের হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাধারণত তিন বছরের একটি ক্রান্তিকালীন বা ট্রানজিশন সময় দিয়ে থাকে। সেই হিসেবে, ইইউ বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা, যা ‘এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ)’ নামে পরিচিত, তা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বজায় থাকবে। 

এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় কাঠামোগত পরীক্ষা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ২১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের সামগ্রিক বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানির (প্রায় ৪৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রায় ৪৯ শতাংশ। তবে তৈরি পোশাক (RMG) খাতের একক ইইউ-নির্ভরতার ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৫৬ শতাংশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) বিভিন্ন প্রক্ষেপণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৯ সালের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলে তীব্র মূল্য-প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশ বার্ষিক সর্বোচ্চ ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় হারাতে পারে, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ। 

এই বিশাল সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি বিকল্প পথ হলো ইইউ’র ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার জন্য আবেদন করা। তবে এই সুবিধা পাওয়ার পূর্বশর্ত অত্যন্ত কঠোর। এর জন্য আবেদনকারী দেশকে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন, এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ২৭টি মূল কনভেনশন শুধু অনুসমর্থন করলেই চলবে না, বরং সেগুলোর অভ্যন্তরীণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের বিকাশ এবং বর্তমান সক্ষমতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৭০’র দশকের শেষভাগে এবং ১৯৮০’র দশকের শুরুতে। ১৯৭৮ সালে বেসরকারি খাতের উদ্যোগের মাধ্যমে প্রথমবার ফ্রান্সে ১০ হাজার পিস শার্ট রপ্তানি এবং একই সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (L/C) ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজের সুবিধার মতো যুগান্তকারী নীতিগত সহায়তার ফলে এই খাতের অনবদ্য যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের রপ্তানি নীতিতে তৈরি পোশাককে প্রথমবার ‘বর্ষের রপ্তানি পণ্য’ ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। গত চার দশকে এই খাতটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। 

তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের রুচি, পরিবেশগত সচেতনতা এবং আইনি কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা আর সম্ভব নয়। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো পণ্যের উচ্চ গুণগত মান, কঠোর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো।

এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং পরীক্ষাগার (Testing Laboratory) সক্ষমতার চিত্রটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশের প্রধান মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) আইএসও/আইইসি ১৭০২৫ (ISO/IEC 17025) আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে এটি মাত্র ৩৫টি পণ্যের ২৮৩টি কেমিক্যাল ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল প্যারামিটারে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইইউ বাজারের জন্য বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি ও obligatorio কিছু পরীক্ষা, যেমন: জটিল মাল্টি-রেসিডিউ পেস্টিসাইড স্ক্রিনিং, ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং ভেটেরিনারি ড্রাগের অবশিষ্টাংশ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার মতো উচ্চপ্রযুক্তির পরিকাঠামো দেশের সরকারি পরীক্ষাগারগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত নয়।

এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘গ্রিন ডিল’ (Green Deal) নীতিমালার অধীনে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পার অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্টেন্সেস (PFAS), ডাইঅক্সিন এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক। অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আধুনিক এই উপাদানগুলো পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কিংবা নিবন্ধিত বাণিজ্যিক ল্যাবরেটরি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। 

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের রপ্তানিকারকদের ওপর। আমদানিকারক দেশের শর্ত পূরণের জন্য চূড়ান্ত সার্টিফিকেশনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা জার্মানির মতো বিদেশি পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে পণ্য পাঠানোর আগে নমুনা বিদেশে পাঠিয়ে রিপোর্ট আনতে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। ল্যাবরেটরির এই দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত পরীক্ষার ফি’র কারণে প্রতি বছর দেশের রপ্তানি খাত থেকে আনুমানিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের মূল্য-প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে (Price Competitiveness) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করছে।

ইউরোপিয়ান কমিশনের ‘র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড’ (RASFF) পোর্টালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে অতীতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বেশ কয়েকবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হিমায়িত চিংড়িতে নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতির কারণে ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ শতাধিক RASFF সতর্কবার্তা বা নোটিফিকেশনের সম্মুখীন হয়েছিল। এর পর, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশি পান পাতায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পান আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। 
ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে বারবার বিলম্বের কারণে এই নিষেধাজ্ঞা ২০২০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল এবং দীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কারের পর ২০২১ সালের এপ্রিলে তা প্রত্যাহার করা হয়। এই দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পান পাতার রপ্তানি আয় ৩ কোটি মার্কিন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে মাত্র ১৯ লাখ ডলারে নেমে এসেছিল। অতি সম্প্রতি, ২০২৪ সালেও ইইউ কর্তৃক বাংলাদেশের যারা লেবু এবং নির্দিষ্ট কিছু কৃষিপণ্যের ওপর নিরীক্ষা ও সীমান্ত পরিদর্শনের হার বৃদ্ধি করার ঘটনা নির্দেশ করে, দেশের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো কাঠামোগতভাবে খণ্ডিত এবং পূর্বসতর্কতামূলক (Pre-export testing) পরীক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রধান regional প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে তাদের দূরদর্শী ও সমন্বিত নীতিমালার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনাম তাদের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি বা ‘খামার থেকে টেবিল’ (Farm-to-Table) ট্র্যাকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি বিশাল বেসরকারি অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, ভারত তাদের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (FSSAI) মাধ্যমে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও একক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যা কম খরচে দ্রুত আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন দিতে সক্ষম। থাইল্যান্ডও তাদের নিজস্ব দ্বি-স্তরীয় ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ (GAP) মানদণ্ড প্রবর্তন করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশে খাদ্য ও পণ্য মান নিয়ন্ত্রণের আইনি ও তদারকি দায়িত্ব এখনো একাধিক মন্ত্রণালয়ের (যেমন: খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) মধ্যে বিভক্ত। এই প্রাতিষ্ঠানিক খণ্ডতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে মাঠপর্যায়ে একক নীতি বাস্তবায়ন এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রায়শই ধীরগতির হয়ে পড়ে।

দেশের মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো আধুনিকায়নকে কেবল একটি আর্থিক ব্যয় হিসেবে না দেখে, একে দীর্ঘমেয়াদী এবং লাভজনক জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গবেষণাপত্রের অর্থনৈতিক ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis) অনুযায়ী, ল্যাবরেটরি আধুনিকায়নে যদি ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়, তবে পরবর্তী ১০ বছরে তার নিট বর্তমান মূল্য (NPV) দাঁড়াবে ২২২.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এই প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (IRR) ১৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এই বিনিয়োগের ফলে প্রতি বছর বিদেশি ল্যাবরেটরির ফি বাবদ ২৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে, মানসম্মত পণ্য তৈরির কারণে ১০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য প্রত্যাখ্যানজনিত ক্ষতি হ্রাস পাবে এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে বার্ষিক অতিরিক্ত ৮০ মিলিয়ন ডলারের নতুন রপ্তানি বাজার উন্মুক্ত হবে।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বর্তমানে জাপানের ঋণ মওকুফ তহবিলের (JCCF) অর্থায়নে ২ হাজার ৪০৯.৭০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প, ‘নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় একটি সাততলা বিশিষ্ট জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি এবং চট্টগ্রাম ও খুলনায় দুটি অত্যাধুনিক আঞ্চলিক পরীক্ষাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই প্রকল্পের একটি বড় সময়গত ঝুঁকি রয়েছে; প্রকল্পটির সামগ্রিক বাস্তবায়নকাল ২০৩৪ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে, অথচ ইইউ’র ইবিএ শুল্কমুক্ত সুবিধা সমাপ্ত হবে ২০২৯ সালের নভেম্বরে। এর ফলে ২০২৯ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত যে ৫ বছরের একটি বড় ‘কমপ্লায়েন্স শূন্যতা’ (Compliance Gap) তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে একটি মারাত্মক সংকটে ফেলতে পারে। তাই এই শূন্যতা পূরণে প্রকল্পের বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি করা এবং ২০২৯ সালের আগেই মূল ল্যাবগুলোর আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি কৌশলকে টেকসই করতে হলে আরও দুটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত শূন্যতা পূরণ করা আবশ্যক। প্রথমত, দেশে বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতার দ্রুত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার জন্য কোনো কার্যকর ‘ন্যাশনাল ট্রেড ইন্টেলিজেন্স সেল’ বা ‘রপ্তানি প্রতিযোগিতা পর্যবেক্ষণ ইউনিট’ গড়ে ওঠেনি। এর ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন বাণিজ্যিক নীতি বিশ্লেষণ, নতুন ও সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান এবং ইইউ গ্রিন ডিলের মতো আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের পরিবর্তন ট্র্যাক করে সরকারকে আগাম কৌশলগত পরামর্শ দেওয়ার কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি মালিকানাধীন হাজার হাজার আমদানিকারক, পরিবেশক এবং সুপারশপ চেইনের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক বা প্রবাসী বাণিজ্যিক কম্যুনিটি রয়েছে, যাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে এখনো দেশের মূল রপ্তানি কৌশলের সাথে সংহত করা সম্ভব হয়নি। এই প্রবাসী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর বাণিজ্যিক মিশনগুলোকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্য, যেমন: প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল সামগ্রী এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বহুমুখীকরণ সম্ভব।

আসন্ন ২০২৯ সালের বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:

১. একক স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ গঠন: ইইউ’র ডিরেক্টরেট-জেনারেল ফর হেলথ অ্যান্ড ফুড সেফটি (DG SANTE) মডেল অনুসরণে দেশের বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারগুলোকে একটি একক সমন্বিত ও স্বায়ত্তশাসিত মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অধীনে এনে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধন করা প্রয়োজন।

২. প্রকল্পের মেয়াদ পুনর্বিন্যাস: চলমান নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি করে মাল্টি-রেসিডিউ পেস্টিসাইড স্ক্রিনিংসহ উচ্চতর কেমিক্যাল পরীক্ষার সক্ষমতা ২০২৯ সালের ডেডলাইনের আগেই কার্যকর করা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. আধুনিক আইন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং: বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে PFAS, ডাইঅক্সিন এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং সরবরাহ চেইনে ব্লকচেইন-ভিত্তিক ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা উচিত।

৪. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP): কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সময় কমাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ল্যাবরেটরিগুলোকে (যেমন: SGS, Bureau Veritas) সরকারি ল্যাবের পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি নমুনা পরীক্ষার পূর্ণ অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।

৫. ট্রেড ইন্টেলিজেন্স ও প্রবাসী নেটওয়ার্ক: একটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইন্টেলিজেন্স সেল প্রতিষ্ঠা করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে থাকা প্রবাসী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ককে দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা আবশ্যক।

২০২৯ সালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কাউন্টডাউন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে এটি অনুধাবন করতে হবে যে, আগামী দিনে বিশ্ববাজারে টিকে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি হলো পণ্যের গুণগত মান ও কমপ্লায়েন্সের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা, খণ্ডিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আধুনিকায়ন, স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা এবং সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাই পারে এই আসন্ন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জকে একটি নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখার স্বার্থে মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর এই আমূল সংস্কারকে এই মুহূর্তের অন্যতম শীর্ষ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।

লেখক: গবেষক, পর্যবেক্ষক: গণতন্ত্র সীমান্তহীন; প্যারিস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow