ইতিহাসের পাতায় মিশর: ভাগ্য যাদের বারবার কাঁদায়

নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক কাল, সভ্যতার সূতিকাগার বলা হয় মিশরকে। নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ বিশ্বকে দিয়েছে বিজ্ঞান, স্থাপত্য আর সংস্কৃতির অনন্য উপহার। তবে পিরামিডের এই দেশের ইতিহাস শুধু জৌলুসের নয়। এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কান্না, রক্ত আর হাহাকার। বারবার প্রকৃতির নির্মম আঘাত এবং মানুষের সীমাহীন লোভের শিকার হয়েছে এই প্রাচীন ভূখণ্ড। যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতা বদল হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। ইতিহাসের খেরোখাতা উল্টালে দেখা যায়, মিশর এমন এক জনপদ যাকে ভাগ্য বারবার কাঁদিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই মিশরের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্বশক্তির নজর কেড়েছে। সুজলা-সুফলা এই ভূমির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থমকে যায়নি কখনো। ফলে বাইরের আক্রমণ যেমন বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে এই দেশকে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রও পিছু ছাড়েনি। নিজেদের গৌরবময় অধ্যায়ের সমান্তরালে মিশরের ললাটে যুক্ত হয়েছে একের পর এক ট্র্যাজেডি। আরও পড়ুন হাজার বছরের রহস্যের দেশ মিশর, সেরা দর্শনীয় স্থান কোনগুলো? পিরামিড যুগের অবসান থেকে শুরু করে আধুনিক কালের রাজনৈতিক রক্তপাত, সবখানেই মিশরের ভাগ্য যেন এক ট্র্যাজিক নাটকের অবয়ব নিয়ে

ইতিহাসের পাতায় মিশর: ভাগ্য যাদের বারবার কাঁদায়

নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক কাল, সভ্যতার সূতিকাগার বলা হয় মিশরকে। নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ বিশ্বকে দিয়েছে বিজ্ঞান, স্থাপত্য আর সংস্কৃতির অনন্য উপহার। তবে পিরামিডের এই দেশের ইতিহাস শুধু জৌলুসের নয়। এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কান্না, রক্ত আর হাহাকার।

বারবার প্রকৃতির নির্মম আঘাত এবং মানুষের সীমাহীন লোভের শিকার হয়েছে এই প্রাচীন ভূখণ্ড। যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতা বদল হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। ইতিহাসের খেরোখাতা উল্টালে দেখা যায়, মিশর এমন এক জনপদ যাকে ভাগ্য বারবার কাঁদিয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকেই মিশরের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্বশক্তির নজর কেড়েছে। সুজলা-সুফলা এই ভূমির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থমকে যায়নি কখনো। ফলে বাইরের আক্রমণ যেমন বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে এই দেশকে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রও পিছু ছাড়েনি। নিজেদের গৌরবময় অধ্যায়ের সমান্তরালে মিশরের ললাটে যুক্ত হয়েছে একের পর এক ট্র্যাজেডি।

পিরামিড যুগের অবসান থেকে শুরু করে আধুনিক কালের রাজনৈতিক রক্তপাত, সবখানেই মিশরের ভাগ্য যেন এক ট্র্যাজিক নাটকের অবয়ব নিয়েছে। নিচে মিশরের ইতিহাসের সেসব অন্ধকার ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

প্রাচীন সভ্যতার বুকভাঙা কান্না

 Nile River
মিশরের নী নদ/ ছবি: পেক্সেলস

প্রথম মধ্যবর্তী যুগের মহা বিপর্যয় (খ্রিস্টপূর্ব ২১৭১)

প্রাচীন মিশরের ওল্ড কিংডম বা পিরামিড যুগকে বলা হতো সুবর্ণ সময়। তবে ফারাও পেপি ২-এর দীর্ঘ ৯৩ বছরের শাসনের শেষ দিকে এসে কেন্দ্রীয় শাসন একেবারে ভেঙে পড়ে। ঠিক এই সময়েই প্রকৃতি তার নির্মম রূপ দেখায়। আফ্রিকার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নীল নদের বার্ষিক বন্যা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় স্মরণকালের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ খরা। এর ফলে পুরো মিশরজুড়ে তীব্র দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় একে অপরকে হত্যা করতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল থাকায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গৃহযুদ্ধ। এক সময়ের পরাক্রমশালী পিরামিড সভ্যতার এমন আকস্মিক ও করুণ পতন ইতিহাসে এক বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ধ্বংসযজ্ঞ

প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্ঞানভাণ্ডার ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ছিল মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। সারা বিশ্বের অমূল্য সব পাণ্ডুলিপি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও দর্শনের বই এখানে সংরক্ষিত ছিল। তবে বিভিন্ন শাসকের যুদ্ধংদেহি মনোভাব এবং বারবার অগ্নিকাণ্ডের ফলে এই লাইব্রেরিটি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। জুলিয়াস সিজারের আক্রমণের সময় প্রথম বড় আগুন লাগে। এরপর বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে লাইব্রেরিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এই লাইব্রেরিটি টিকে থাকলে মানবসভ্যতার জ্ঞান আজ আরও বহু দূর এগিয়ে যেত। মিশরের বুক থেকে এই অমূল্য রত্ন হারিয়ে যাওয়া ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যই এক অপূরণীয় ভাগ্যবিপর্যয়।

egypt
মিশরের জাদুঘরে প্রাচীন দেওয়ালচিত্র/ ছবি: পেক্সেলস

রানি ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যা ও স্বাধীন অস্তিত্বের অবসান (খ্রিস্টপূর্ব ৩০)

মিশরের শেষ স্বাধীন রানি সপ্তম ক্লিওপেট্রা ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও প্রভাবশালী। তবে রোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধে রোমান জেনারেল অক্টোভিয়ানের কাছে ক্লিওপেট্রা ও মার্ক অ্যান্টনির সম্মিলিত বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে এবং রোমানদের দাসত্ব এড়াতে রানি ক্লিওপেট্রা বিষধর সাপের কামড়ে আত্মহত্যা করেন। এই একটি আত্মহত্যার মাধ্যমে মিশরের দীর্ঘ তিন হাজার বছরের গৌরবময় ফারাও রাজত্বের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। এরপর থেকে মিশর একটি স্বাধীন দেশ থেকে রোমান সাম্রাজ্যের একটি সাধারণ প্রদেশে পরিণত হয়, যা মিশরীয়দের আত্মমর্যাদায় বড় আঘাত ছিল।

ফারাওদের হত্যার অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র

প্রাচীন মিশরের রাজপ্রাসাদগুলো সবসময় ক্ষমতার লোভে কলুষিত ছিল। দেশের শাসনভার কেড়ে নিতে আপনজনেরাই বারবার ষড়যন্ত্র করেছে। ফারাও তেতি, যিনি সিক্সথ ডাইনেস্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি নিজের দেহরক্ষীদের হাতেই নির্মমভাবে খুন হন। একইভাবে টুয়েলভথ ডাইনেস্টির প্রভাবশালী ফারাও অ্যামেনেমহাত ১ গভীর রাতে নিজের শয়নকক্ষে আততায়ীর হামলায় প্রাণ হারান। সবচেয়ে বিখ্যাত ট্র্যাজেডি হলো ফারাও রামিসেস ৩-এর হত্যাকাণ্ড। তার নিজের রানি তিয়া পুত্রকে সিংহাসনে বসানোর জন্য রামিসেসের গলা কেটে হত্যা করার চক্রান্ত করেন। এই অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ও বিশ্বাসঘাতকতা মিশরের শাসনব্যবস্থাকে বারবার দুর্বল করেছে এবং সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলেছে।

আধুনিক যুগে উপনিবেশ ও শোষণের কালো ছায়া

Alexandriaআলেকজান্দ্রিয়া শহর/ ছবি: পেক্সেলস

 

১৮০১ সালের আলেকজান্দ্রিয়ার কৃত্রিম বন্যা

আধুনিক মিশরের শুরুটাও ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মিশরে নেপোলিয়ানের ফরাসি বাহিনীকে অবরুদ্ধ করতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আলেকজান্দ্রিয়ার মিষ্টি পানির খালের বাঁধ ইচ্ছা করে কেটে দেয়। এর ফলে সমুদ্রের লোনা পানি মরুভূমির নিচু এলাকায় প্রচণ্ড বেগে ঢুকে পড়ে। নিমেষেই ১৫০টির বেশি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। হাজার হাজার একর আবাদি জমি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় এবং কয়েক লাখ মানুষ রাতারাতি গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়েন। ফরাসিদের শায়েস্তা করার এই আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের বলি হতে হয়েছিল মিশরের নিরীহ সাধারণ জনগণকে।

সুয়েজ খাল খননের মহা মানবিক বিপর্যয় (১৮৫৯-১৮৬৯)

সুয়েজ খাল আজ মিশরের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হলেও এর পেছনে রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিকের কান্না। এই খাল খননের সময় মিশরের তৎকালীন শাসকেরা ফরাসি কোম্পানির স্বার্থে দেশের লাখ লাখ দরিদ্র মানুষকে জোরপূর্বক খাটাতো। কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তাপে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে দিনরাত কাজ করতে হতো তাদের। চরম বৈরী আবহাওয়া, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং তার ওপর কলেরার মহামারি। সব মিলিয়ে সুয়েজ খাল খনন করতে গিয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মিশরীয় শ্রমিক অকালে প্রাণ হারান। এই খালটি মিশরের মানুষের রক্ত ও মরদেহের ওপর নির্মিত এক আধুনিক স্মৃতিস্তম্ভ।

suez
সুয়েজ খাল/ ছবি: এএফপি

১৮৮২ সালের ব্রিটিশ দখলদারত্ব ও বোমাবর্ষণ

সুয়েজ খালের ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে বিশ্বশক্তির নজর সবসময় মিশরের ওপর ছিল। অতিরিক্ত ঋণের দায়ে জর্জরিত মিশরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে উছিলা খুঁজছিল ব্রিটেন। ১৮৮২ সালে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে একটি ছোট দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পুরো শহরের ওপর তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করে। আধুনিক কামানের গোলার আঘাতে আলেকজান্দ্রিয়া শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এরপর ব্রিটিশ বাহিনী কায়রো দখল করে নেয়। এই ঘটনার মাধ্যমে মিশরের নামমাত্র স্বাধীনতাটুকুও খর্ব হয় এবং দেশটি দীর্ঘ সাত দশকের জন্য ব্রিটিশদের একটি শোষিত উপনিবেশে পরিণত হয়।

আধুনিক যুদ্ধ ও রাজনৈতিক রক্তপাতের ক্ষত

১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধ

আধুনিক মিশরের সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো ১৯৬৭ সালের ইসরায়েলের সঙ্গে ছয়দিনের যুদ্ধ। এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে মিশরের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী আকস্মিক হামলা চালিয়ে মিশরের প্রায় পুরো বিমানবাহিনী মাটিতেই ধ্বংস করে দেয়। এই শোচনীয় পরাজয়ের ফলে মিশর তার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনাই উপদ্বীপ এবং সুয়েজ খালের পূর্ব তীরের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এই যুদ্ধ মিশরের জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় এবং আরব বিশ্বে মিশরের নেতৃত্ব ও আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যাকাণ্ড (১৯৮১)

মিশরের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিক ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। এই চুক্তির ফলে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ফেরত এলেও আরব বিশ্ব ও মিশরের ভেতরের কট্টরপন্থিরা এটি মেনে নেয়নি। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর কায়রোতে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে নিজ সেনাবাহিনীর কট্টরপন্থি সদস্যরা ভিআইপি মঞ্চের সামনে এসে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। ঘটনাস্থলেই প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড মিশরকে ফের এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দেয়।

egypt
মিশরের একটি প্রাচীন মন্দির/ ছবি: পেক্সেলস

১৯৯৭ সালের লাক্সর গণহত্যা

মিশরের অর্থনীতি মূলত পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পকে ধ্বংস করতে এবং সরকারকে বিপদে ফেলতে ১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা এক ভয়াবহ হামলা চালায়। লাক্সরের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘হ্যাটশেপসুট মন্দিরে’ ছয়জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী অতর্কিত হামলা চালায়। তারা দীর্ঘ ৪৫ মিনিট ধরে পর্যটকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এই নৃশংস ঘটনায় ৬২ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন বিদেশি পর্যটক। এই ঘটনার পর মিশরের পর্যটন শিল্প পুরোপুরি ধসে পড়ে। দেশি-বিদেশি কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন।

২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ২০১২ সালের পোর্ট সাঈদ ট্র্যাজেডি

হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে মিশরের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কায়রোর তাহরির স্কয়ারে টানা বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শত শত তরুণ নিহত হন। মোবারকের পতন হলেও দেশের বিশৃঙ্খলা থামেনি। এই অস্থিতিশীলতার জের ধরে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পোর্ট সাঈদ স্টেডিয়ামে আল-আহলি ও আল-মাসরি ফুটবল ক্লাবের ম্যাচ শেষে এক ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। স্টেডিয়ামের আলো নিভিয়ে দিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর লাঠি, ছুরি আর পাথর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই হাঙ্গামায় এবং স্টেডিয়ামের গেট বন্ধ থাকায় পদদলিত হয়ে ৭৪ জন ফুটবল সমর্থক নিহত হন। এই ঘটনা পুরো মিশরীয় সমাজকে স্তব্ধ ও লজ্জিত করেছিল।

cairo
মিশরের রাজধানী কায়রো/ ছবি: পেক্সেলস

২০১৩ সালের রাবিয়া আল-আদাবিয়া গণহত্যা

আধুনিক মিশরের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার ও রক্তক্ষয়ী দিন এটি। মিশরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তার সমর্থকেরা কায়রোর রাবিয়া আল-আদাবিয়া স্কয়ারে শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট মিশরের অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনী বুলডোজার, সাঁজোয়া যান এবং স্নাইপার নিয়ে ওই বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই সাধারণ মানুষের ওপর ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে এক হাজারের বেশি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই গণহত্যা আধুনিক বিশ্বের বুকে মিশরের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কপালে এক মস্ত বড় কালো দাগ লেপে দেয়।

সভ্যতার জননী বলা হয় যে মিশরকে, সেই দেশ যুগে যুগে নিজের সন্তানদের রক্ত আর অশ্রু দিয়ে তার ইতিহাস লিখেছে। পিরামিডের ছায়া যেখানে শান্তির প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ শত বছরের শোষণের আর কান্নার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ক্ষমতা, রাজনীতি আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকে থাকা মিশরের সাধারণ মানুষের ভাগ্য যেন এক অন্তহীন ট্র্যাজেডির গল্প।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি, হিস্টোরি ডটকম, ব্রিটানিকা ১, দ্য কনভারসেশনম্যাকুয়ারি ইউনিভার্সিটি
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow