ইরান যুদ্ধে গরিবের জীবনে বাড়তি চাপ
গত কয়েক বছরে নানা রকম সংকটের কারণে এদেশের গরিব, মেহনতি মানুষ এমনিতেই ভালো নেই। মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উত্তাপ আজ হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে না, বরং তেলের দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এটি এখন কেবল একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়, বরং আমাদের দেশের গরিব মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক নীরব অর্থনৈতিক যুদ্ধ। যে যুদ্ধের পেছনে সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই, অথচ তার সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাদেরই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু দাম বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মাত্রা অনেক গভীর এবং ভয়াবহ। ১৯৭৩ সালের আরবের তেল অবরোধ বা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব পরবর্তী তেল সংকটের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ তখনকার সংকট ছিল আঞ্চলিক, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কাঠামোর একাধিক স্তরকে একসঙ্গে আঘাত করছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বিশ্ব
গত কয়েক বছরে নানা রকম সংকটের কারণে এদেশের গরিব, মেহনতি মানুষ এমনিতেই ভালো নেই। মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উত্তাপ আজ হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে না, বরং তেলের দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এটি এখন কেবল একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়, বরং আমাদের দেশের গরিব মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক নীরব অর্থনৈতিক যুদ্ধ। যে যুদ্ধের পেছনে সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই, অথচ তার সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাদেরই।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু দাম বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মাত্রা অনেক গভীর এবং ভয়াবহ। ১৯৭৩ সালের আরবের তেল অবরোধ বা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব পরবর্তী তেল সংকটের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ তখনকার সংকট ছিল আঞ্চলিক, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কাঠামোর একাধিক স্তরকে একসঙ্গে আঘাত করছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও ২৫ শতাংশ এলএনজি পরিবহিত হয়। ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় কঠিন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যেই সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ট্যাংকার আটকের ঘটনা ঘটেছে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট আরও বাড়লে দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
তবে তেল সংকটের সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ দাম বৃদ্ধি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে অদৃশ্য যন্ত্রণা ছড়াচ্ছে, সেটি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও অন্যান্য শহরের পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে এখন লম্বা লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। এই সময়টা তারা কাজ করতে পারছেন না। একজন পরিবহন চালক এই কয়েক ঘণ্টায় যে টাকা আয় করতে পারতেন, তা হারিয়ে যাচ্ছে শুধু তেল পাওয়ার অপেক্ষায়।
তারপরও অনেক সময় তেল পাওয়া যায় না। খালি হাতে ফিরে যেতে হয়, আবার পরদিন নতুন করে লাইনে দাঁড়াতে হয়। এভাবে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে—যার কোনো হিসাব নেই, কিন্তু যার কষ্টটা খুব বাস্তব।
যারা তেল পাচ্ছেন না, তারা বাধ্য হয়ে কালোবাজারে বেশি দামে কিনছেন। সেখানে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ। একজন বাস বা ট্রাক চালকের প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল লাগে, তাতে অতিরিক্ত খরচ হয়ে যাচ্ছে হাজার টাকারও বেশি। এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
ফলে তাদের সংসারে চাপ বাড়ছে। কেউ ঋণ নিচ্ছেন, কেউ কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। ছোট যানবাহনের চালকদের অবস্থা আরও খারাপ—তাদের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে জ্বালানির পেছনে। তখন প্রশ্ন উঠে—তারা কীভাবে সংসার চালাবে? কীভাবে সন্তানের পড়াশোনা চালাবে?
এখন পর্যন্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির সর্বশেষ মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত মাসে ওয়াশিংটনে তাদের বসন্তকালীন বৈঠকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশে নেমে আসতে পারে—যা জানুয়ারির পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কম। আর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, যদি সংঘাত চলতেই থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি ২.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ‘অ্যাডভার্স সিনারিও’র দিকে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৪.২ শতাংশ থেকে কমে ৩.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তেল সংকট এখন দেশের গরিব মানুষের জীবনে সরাসরি আঘাত করছে। খাদ্য পণ্যের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ বাধ্য হচ্ছেন খাদ্যাভ্যাস বদলাতে। তারা প্রোটিন জাতীয় খাবার—মাছ, মাংস, ডিম, দুধ—প্রায় বাদ দিয়ে দিয়েছেন, শুধু ভাত বা রুটির ওপর ভরসা করে পেট ভরানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার ৮.২৪% শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে তা ১০-১২ শতাংশ পৌঁছেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। একটি চার সদস্যের শ্রমিক পরিবারের বাঁচার জন্য ন্যূনতম মাসিক খরচ এখন প্রায় ২৩ হাজার টাকা। কিন্তু উৎপাদন খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের এক-পঞ্চমাংশ এই পরিমাণ আয়ও করতে পারেন না। সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমানে প্রায় ২ কোটি মানুষ রয়েছেন যাঁরা দুদিন কাজ করতে না পারলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবেন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখন ‘মন্দাস্ফীতি’র (স্ট্যাগফ্লেশন) মুখোমুখি—যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে সরকারের নীতি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এখনও পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাতে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে। অবকাঠামো প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—এসব খাতে ব্যয় কমলে তার প্রভাব পড়বে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে, বিশেষ করে গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর।
সরকার তেল আমদানি সংক্রান্ত যেসব তথ্য দিচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার কতটুকু মিল আছে, সেটা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সরকারি বয়ান খুব একটা বিশ্বাস করে না। ওদিকে ক্রুড তেল সংকটের কারণে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল)। ইআরএল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যদিও সরকারি পর্যায় থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা বা আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্যানিক বাইং চলছে তো চলছেই। চক্রাকারে এই পরিস্থিতি আরও ঘোরতর হচ্ছে—সংকটের খবরে মানুষ বেশি কিনছে, বেশি কেনায় সংকট আরও বাড়ছে। মজুদদারি ও কালোবাজারি ঠেকাতে সরকার কার্যকর কিছুই করতে পারছে না। মোবাইল কোর্ট, ভ্রাম্যমাণ ট্রাইব্যুনাল বসছে বটে, কিন্তু তার প্রভাব সাময়িক। কারণ যেখানে সরবরাহের মূল কাঠামোই দুর্বল, সেখানে শুধু জরিমানা বা কারাদণ্ডের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং এসব অভিযানে ধরা পড়ছেন ক্ষুদ্র চক্রের কিছু লোক, কিন্তু যারা বড় আকারে তেল মজুদ করে রেখেছেন বা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগসাজস করে দাম বাড়াচ্ছেন, তারা রয়ে যাচ্ছেন নিরাপদ দূরত্বে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক।
প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সরকার কী করবে? সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, “তেল সংকট সবাইকে ভাগাভাগি করে নিতে হবে”। কিন্তু এই মন্তব্য কে মানবে? বাংলাদেশে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’-র মতো প্রবাদ যেখানে বাস্তব প্রতিযোগিতার অংশ, সেখানে শুধু আবেদন নিবেদন করে তেল সংকট কতটুকু সামাল দেওয়া যাবে? মানুষ যখন দেখবে সরকার নিজেই নিশ্চিত করতে পারছে না কত তেল আছে, কোথায় আছে, কখন আসবে, তখন তারা নিজের প্রাণ বাঁচাতে নিজের ব্যবস্থা করবে—যার অর্থ আরও বেশি মজুদ, আরও বেশি কালোবাজারি, আরও বেশি প্যানিক। সরকারকে এখন কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—কোথায় ব্যয় কমানো যায়? কোথা থেকে বেশি দামে তেল আমদানির টাকা জোগানো যাবে? কাদের ভর্তুকি দেওয়া হবে আর কাদের দেওয়া হবে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সরকারের কোনো গভীর সমীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনে হচ্ছে সংকট এলে যেন-তেনভাবে মোকাবিলার মানসিকতা কাজ করছে। অথচ এ ধরনের জটিল সংকটের জন্য প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—জরুরি ভিত্তিতে তেল আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা, ভর্তুকির যৌক্তিক বণ্টন, সাশ্রয়ী জ্বালানি প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য স্বচ্ছ ও সৎ তথ্য প্রকাশ। সরকার যদি খোলামেলা তথ্য দেয় এবং সঠিক পরিকল্পনা দেখাতে পারে, তাহলে মানুষও পরিস্থিতি সামাল দিতে সহযোগিতা করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সংকটে যেন গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ ইতিহাস বলে, বড় সংকটের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে তাদের কাঁধেই, যারা আগে থেকেই সবচেয়ে দুর্বল।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?