ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ ট্রাম্প
সব যুদ্ধে বিজয়ী থাকে না, তবে প্রতিটিতে অন্তত একটি পরাজিত (লুজার) পক্ষ থাকে। যদি ইরান যুদ্ধের এই যুদ্ধবিরতি সত্যিই সংঘাতের সমাপ্তি নির্দেশ করে, তাহলে সেখানে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাত তার মূল যুদ্ধলক্ষ্যগুলোকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের নতুন কৌশল নিয়ে তার ধারণার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছে। ভঙ্গুর শান্তি ও ট্রাম্পের পিছুটান বর্তমান শান্তি পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। যুদ্ধবিরতি লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে কি না তা নিয়ে এখনো একমত নয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একইভাবে, হরমুজ প্রণালি কীভাবে খোলা হবে, সেটি বড় বিরোধের জায়গা হয়ে রয়েছে। এমনকি ইসলামাবাদে কোন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না। ট্রাম্প আবার যুদ্ধে ফিরবেন না ভাবার সবচেয়ে ভালো কারণ হলো—তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন যে, এই যুদ্ধ কখনোই শুরু করা উচিত ছিল না। ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে তার করা সেই জঘন্য পোস্টগুলো আসলে নিজের পিছু হটা ঢেকে রাখার অপচেষ্টা মাত্র। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যা তার ঘোষিত ‘মধ্যপ্রাচ্যের সোনালি যুগ’ ধারণাকেও প্রশ্ন
সব যুদ্ধে বিজয়ী থাকে না, তবে প্রতিটিতে অন্তত একটি পরাজিত (লুজার) পক্ষ থাকে। যদি ইরান যুদ্ধের এই যুদ্ধবিরতি সত্যিই সংঘাতের সমাপ্তি নির্দেশ করে, তাহলে সেখানে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাত তার মূল যুদ্ধলক্ষ্যগুলোকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের নতুন কৌশল নিয়ে তার ধারণার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছে।
ভঙ্গুর শান্তি ও ট্রাম্পের পিছুটান
বর্তমান শান্তি পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। যুদ্ধবিরতি লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে কি না তা নিয়ে এখনো একমত নয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একইভাবে, হরমুজ প্রণালি কীভাবে খোলা হবে, সেটি বড় বিরোধের জায়গা হয়ে রয়েছে। এমনকি ইসলামাবাদে কোন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না।
ট্রাম্প আবার যুদ্ধে ফিরবেন না ভাবার সবচেয়ে ভালো কারণ হলো—তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন যে, এই যুদ্ধ কখনোই শুরু করা উচিত ছিল না। ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে তার করা সেই জঘন্য পোস্টগুলো আসলে নিজের পিছু হটা ঢেকে রাখার অপচেষ্টা মাত্র। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যা তার ঘোষিত ‘মধ্যপ্রাচ্যের সোনালি যুগ’ ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ইরানের টিকে থাকার লড়াই
ইরানেরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশটির শীর্ষ নেতারা একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছেন, অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এবং অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু তেহরান মনে করছে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে এবং আলোচনায় তারা শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ীভাবে তার সৈন্যদের হামলার জন্য প্রস্তুত রাখতে পারবে না।
আরও পড়ুন>>
দুঃসংবাদ! ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি: ভ্যান্স
ইরানের ‘কোনো তাড়া নেই’, বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে
একদিনেই কেন ভেস্তে গেলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা?
তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো, একটি ক্ষতবিক্ষত ইরানি শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় টিকে থাকবে এবং আলোচনার টেবিলে সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য চেষ্টা করবে। তারা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হারিয়েছে বা ব্যবহার করে ফেলেছে। এগুলো নতুন করে তৈরি করতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ২১ হাজাররও বেশি হামলায় ইরানের অর্থনীতি কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
ট্রাম্প একে ‘বিশাল বিজয়’ বলে দাবি করছেন। কিন্তু যুদ্ধের তিনটি প্রধান লক্ষ্যের সামনে একে বিজয় বলে মনে হয় না: ইরানকে দমন করে মধ্যপ্রাচ্যকে ‘নিরাপদ ও সমৃদ্ধ’ করা; তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া থেকে স্থায়ীভাবে থামানো।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক ঝুঁকি
এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইসরায়েল ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া নেটওয়ার্ককে আংশিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। অথচ ইরান এখন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে নতুন এক শক্তির উৎস তৈরি করেছে। ইরান এখন প্রণালি ব্যবহারের জন্য টোল আদায়ের চেষ্টা করছে। এমনকি ট্রাম্প এই রাজস্ব ভাগাভাগি করার কথাও ভেবেছেন। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সম্ভবত নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এমন আঘাত প্রতিহত করতে পারবে। কিন্তু সামনে একটি লড়াই অপেক্ষা করছে।
তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উপসাগর এড়াতে নতুন পাইপলাইন তৈরি করলেও ইরান গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা নিজেদের শান্তির আধার হিসেবে প্রচার করে, তাদের এখন প্রশ্ন করতে হবে- তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে? নাকি তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত এবং ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় আসা উচিত?
ট্রাম্পের ভ্রান্ত আশা
ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন, ইরানিরা শিগগির তাদের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, যাতে তিনি এর কৃতিত্ব নিতে পারেন। তবে এটি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন কম সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে। কারণ যুদ্ধের আগে এই শাসনব্যবস্থা ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অজনপ্রিয় ছিল। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অসুস্থ থাকায় দেশটি নেতৃত্ব পরিবর্তনের মুখেই ছিল। যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে এবং আলী খামেনির ছেলে মোজতবাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে তিনি কেবল একজন আলংকারিক প্রধান; ইরানের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখন ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) এবং এর প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলগুলোর হাতে—যাদের সবাই যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী।
এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে ঠিকই, কিন্তু প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যা ১০টি বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট—এখনো পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে রয়ে গেছে। ট্রাম্প জোর দাবি জানাচ্ছেন, ইরানকে এই ‘পারমাণবিক ধূলিকণা’ সমর্পণ করতে হবে।
ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে বোমা তৈরির মাধ্যমে শক্ত অবস্থান নেওয়ার তাগিদ এখন বেড়েছে, যা তাদের সম্ভাব্য আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি একটি ভয়াবহ পরিণতি হবে। কিন্তু তা থামাতে ট্রাম্প এবং ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টদের প্রতি কয়েক বছর অন্তর হামলা চালাতে হতে পারে। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এটি ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।
এই পরিস্থিতি সংঘাতের রূপকারদের কোথায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? ইসরায়েল আজ যতটা সামরিক শক্তি অর্জন করেছে তা আগে কখনো করেনি। কিন্তু এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, এই শক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে এবং তাদের আগাম হামলার প্রবণতা এই অঞ্চলে ভয় ও ঘৃণার সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন, যা গত বছরের তুলনায় সাত শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয় ও শক্তির সীমাবদ্ধতা
ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রেরও অনেক কিছু ভাবার রয়েছে। দেশটি আগে তার সামরিক শক্তির সাথে নৈতিক কর্তৃত্বের সমন্বয় করে শক্তি অর্জন করতো। কিন্তু ট্রাম্প যখন ইরানি সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দেন—যা মূলত গণহত্যারই নামান্তর—তখন তিনি নৈতিকতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি দুর্বলতার উৎস।
ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ কেউ এমন আচরণ করেন যেন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের মতো বিষয়গুলোতে আটকা পড়ে আছে। এসব সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হলে তারা আরও শক্তিশালী হবে—এমনটাই তাদের ধারণা। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি কেবল কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতির অবমাননাই নয়, বরং একটি ভ্রান্ত ধারণা।
যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মূল্যকে অতিরঞ্জিত করা সহজ। মার্কিন কারখানাগুলো তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে দ্রুত রসদ পুনঃসরবরাহ করতে পারছে না, যেখানে ইরান সীমিত অস্ত্র নিয়ে একটি অসম যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।
ন্যায্য যুদ্ধ নির্ভর করে একটি সুচিন্তিত বিচারের ওপর যে, সহিংসতা কেবল শেষ উপায় হিসেবে প্রয়োজনীয় ছিল। পরিবর্তে ট্রাম্প ইরানকে একটি ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে হামলার পরিণাম নিয়ে চিন্তা করার দায় ছিল না। তিনি বুঝতে পারেননি, শুধু সামরিক ক্ষমতা দিয়ে কৌশলগত বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। বরং সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়া অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত বিপরীত ফলই বয়ে আনে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/
What's Your Reaction?