ঈদ যাত্রা যেকোনো মূল্যে স্বস্তিদায়ক করতে চায় সরকার

আমাদের জীবনে ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আবেগ, আত্মীয়তার বন্ধন এবং শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ। বছরের পর বছর রাজধানী কিংবা শিল্পাঞ্চলে কর্মব্যস্ত জীবন কাটানো মানুষ ঈদের সময় প্রিয়জনের কাছে ফিরতে চায়। সেই ফিরে যাওয়ার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আনন্দ, ব্যস্ততা, দুর্ভোগ, উদ্বেগ এবং প্রত্যাশা। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে ঘিরে এই চ্যালেঞ্জ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ এই সময়ে শুধু মানুষ নয়, কোরবানির পশুও দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে হয়। ফলে পুরো দেশের সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে বিরাট চাপ তৈরি হয়। এমন বাস্তবতায় আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে যে ইতিবাচক প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলম কুমিল্লায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সরকার যেকোনো মূল্যে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে চায়। এই বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক আশ্বাস নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে বাস্তব কিছু উদ্যোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের চলমান প্রচেষ্টা। বাংলাদেশে ঈদযাত্রা মান

ঈদ যাত্রা যেকোনো মূল্যে স্বস্তিদায়ক করতে চায় সরকার

আমাদের জীবনে ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আবেগ, আত্মীয়তার বন্ধন এবং শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ। বছরের পর বছর রাজধানী কিংবা শিল্পাঞ্চলে কর্মব্যস্ত জীবন কাটানো মানুষ ঈদের সময় প্রিয়জনের কাছে ফিরতে চায়। সেই ফিরে যাওয়ার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আনন্দ, ব্যস্ততা, দুর্ভোগ, উদ্বেগ এবং প্রত্যাশা। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে ঘিরে এই চ্যালেঞ্জ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ এই সময়ে শুধু মানুষ নয়, কোরবানির পশুও দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে হয়। ফলে পুরো দেশের সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে বিরাট চাপ তৈরি হয়।

এমন বাস্তবতায় আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে যে ইতিবাচক প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলম কুমিল্লায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সরকার যেকোনো মূল্যে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে চায়। এই বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক আশ্বাস নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে বাস্তব কিছু উদ্যোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের চলমান প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশে ঈদযাত্রা মানেই দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, ফেরিঘাটে ভোগান্তি, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং সড়ক দুর্ঘটনার শঙ্কা। একসময় ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণাঞ্চলে যেতে মানুষের ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টাও লেগে যেত। কিন্তু দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে দিয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে বিপ্লব ঘটেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন গতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। মেট্রোরেল রাজধানীর অভ্যন্তরীণ চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক চার লেন ও ছয় লেনে উন্নীত হওয়ায় যাতায়াতের সময়ও কমেছে।

মন্ত্রী রবিউল আলম যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার কথা বলেছেন, সেটিও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর শুধু একটি মহাসড়ক নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রাণরেখা। দেশের আমদানি-রপ্তানির বিশাল অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ঈদের সময় এই মহাসড়কে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। তাই এই রুটকে আধুনিক ও বহুমাত্রিক পরিবহন উপযোগী করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

তবে বাস্তবতা হলো,অবকাঠামো উন্নয়নই সব নয়; প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা। সরকার এবার যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা হলো সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থা। বিভিন্ন মহাসড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধ, মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহনের আলাদা ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যাত্রীরা প্রকৃত স্বস্তি পেতে পারেন।

এখানে আমি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার তথা সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে সাধুবাদ জানাতে চাই। শুরু থেকেই মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ঈদযাত্রাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিবছর হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। মন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন—গড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন—তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর পেছনে চালকদের অদক্ষতা, অতিরিক্ত গতি, আনফিট যানবাহন এবং যাত্রীদের অসচেতনতা বড় কারণ। কিন্তু ইতিবাচক বিষয় হলো, সরকার এখন শুধু দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না; দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম পদক্ষেপও নিচ্ছে।
কুমিল্লায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ বিতরণ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। নিহতদের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রমাণ করে যে সরকার অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। যদিও কোনো অর্থই একটি প্রাণের বিকল্প হতে পারে না, তবুও রাষ্ট্রের এই সহমর্মিতা দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে আনে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মন্ত্রী নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের অন্য সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক মানবিক উদাহরণ। উন্নত বিশ্বে দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও যদি ধীরে ধীরে সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে তা নিঃসন্দেহে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ যে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনার কারণ জানা থাকলেও অনেক সময় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন যদি প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক মনিটরিং, হাইওয়ে পুলিশিং, সিসিটিভি নজরদারি এবং ড্রাইভারদের বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—জনসচেতনতা। সরকার যত উদ্যোগই নিক, জনগণের দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব নয়। ছাদে ভ্রমণ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং কিংবা অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া—এসব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঈদযাত্রা একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের স্থানান্তর পৃথিবীর যেকোনো দেশের জন্যই বড় পরীক্ষা। অথচ সীমিত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবকাঠামো এখনও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। তারপরও সরকার সড়ক সম্প্রসারণ, রেল যোগাযোগ উন্নয়ন, নতুন সেতু নির্মাণ এবং ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করার চেষ্টা করছে।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও ছুটির মৌসুমে ব্যাপক যানজট ও দুর্ঘটনা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে থ্যাংকসগিভিং কিংবা চীনে লুনার নিউ ইয়ারের সময় পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক চাপ পড়ে। সেসব দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

তবে সমালোচনার জায়গাও আছে। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী যে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং মহাসড়ক ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটিও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অংশ। বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহিতা থাকলে জনগণের আস্থাও বাড়ে।

ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে এবারের যাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বোপরি জনগণের সহযোগিতা।

পরিশেষে বলা যায়,দেশ আজ অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে দেশে ঈদযাত্রা মানেই ছিল সীমাহীন দুর্ভোগ, সেই দেশ এখন ধীরে ধীরে পরিকল্পিত যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু পরিবর্তনের চেষ্টাও দৃশ্যমান। আর সেই কারণেই আশা করা যায়—সরকার যদি আন্তরিকতা, সমন্বয় এবং কঠোর মনিটরিং বজায় রাখতে পারে, তবে এবারের ঈদযাত্রা সত্যিই লাখো মানুষের জন্য স্বস্তি, নিরাপত্তা ও আনন্দের বার্তা বয়ে আনতে সক্ষম হবে ইনশাল্লাহ। সবার জন্য ঈদের শুভেচ্ছা। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow