উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা নয়, দরকার টেকসই অর্থায়ন
১৭ মে, বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা, যা নীরবে মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটির বেশি মানুষ এই রোগে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। ২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশ লীগ বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই দিবস পালন করার উদ্যোগ নেয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- “কন্ট্রোলিং হাইপারটেনশন টুগেদার” অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয় বরং এটি পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যকর্মী, নীতিনির্ধারক এবং সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব। উচ্চ রক্তচাপ কেবল নিজেই একটি মারাত্মক অসংক্রামক রোগ নয়, এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগেরও অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশ। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেবল একটি রোগকে অবহেলা করা নয়, বরং এটি সামগ্রিক অসংক্রামক রোগের বোঝাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচ
১৭ মে, বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা, যা নীরবে মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটির বেশি মানুষ এই রোগে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি।
২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশ লীগ বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই দিবস পালন করার উদ্যোগ নেয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- “কন্ট্রোলিং হাইপারটেনশন টুগেদার” অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয় বরং এটি পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যকর্মী, নীতিনির্ধারক এবং সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব।
উচ্চ রক্তচাপ কেবল নিজেই একটি মারাত্মক অসংক্রামক রোগ নয়, এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগেরও অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশ। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেবল একটি রোগকে অবহেলা করা নয়, বরং এটি সামগ্রিক অসংক্রামক রোগের বোঝাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ শীর্ষে রয়েছে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে, যেখানে দেখা গেছে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী মানুষের অর্ধেকই জানে না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ প্রতি সাত জনের মধ্যে মাত্র একজন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় রয়েছে। ফলে অসংখ্য মানুষ নীরব এই ঘাতকের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন জীবনযাপন করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার তৃণমূল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধা-বঞ্চিত মানুষদের জন্য উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে দেশে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু থাকলেও টেকসই অর্থায়নের অভাবে সবার জন্য বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মূলত স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অপ্রতুল্য বরাদ্দ এবং সামগ্রীকভাবে বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারাই এক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত হলেও বাংলাদেশে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের মাত্র ৫.৩ শতাংশ।
এর মধ্যে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয় আরও কম, স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ। ফলে কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারগুলোতে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সুবিধা-বঞ্চিত মানুষ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে আমাদের প্রত্যাশা আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে, যাতে সবার জন্য উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা যায়। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং ধারাবাহিক ফলোআপ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা নয়। রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এই নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
উচ্চ রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। আর তাতেই গড়ে উঠবে সুস্থ, উৎপাদনশীল ও শক্তিশালী বাংলাদেশ।
লেখক: প্রোগ্রাম অফিসার, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)।
What's Your Reaction?