উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম: মোদীর বিরুদ্ধে লাখো শিক্ষার্থীর ক্ষোভ
ভারতের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশনকে (সিবিএসই) ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর হাজারো শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন যে তাদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এই অভিযোগ এখন শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্যও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফল দেখে হতাশ শিক্ষার্থীরা দেহরাদুনের শিক্ষার্থী নন্দিনী সিং দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন রসায়নে ভালো নম্বর পাবেন, কারণ তার কলেজে ভর্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই সেই ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের পর তিনি দেখেন, রসায়নে তার নম্বর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় সময়সীমাও পেরিয়ে যায়। এখন তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি তার প্রাপ্য নম্বর পাননি। তার ভাষায়, এই ঘটনার পর সিবিএসইর ওপর তার আস্থা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। নন্দিনী একা নন। এ বছর ১৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী সিবিএসইর বোর্ড প
ভারতের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশনকে (সিবিএসই) ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর হাজারো শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন যে তাদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এই অভিযোগ এখন শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্যও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফল দেখে হতাশ শিক্ষার্থীরা
দেহরাদুনের শিক্ষার্থী নন্দিনী সিং দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন রসায়নে ভালো নম্বর পাবেন, কারণ তার কলেজে ভর্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই সেই ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু ফল প্রকাশের পর তিনি দেখেন, রসায়নে তার নম্বর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় সময়সীমাও পেরিয়ে যায়।
এখন তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি তার প্রাপ্য নম্বর পাননি। তার ভাষায়, এই ঘটনার পর সিবিএসইর ওপর তার আস্থা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
নন্দিনী একা নন। এ বছর ১৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী সিবিএসইর বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের অনেকেই এখন ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের মধ্যে রয়েছেন।
নতুন ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক
এ বছর সিবিএসই প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করে। এই ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র স্ক্যান করে ডিজিটাল ছবিতে রূপান্তর করা হয়। এরপর পরীক্ষকরা কম্পিউটারে লগইন করে সেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন।
কিন্তু শুরু থেকেই এই পদ্ধতি নানা সমস্যার মুখে পড়ে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী—অনেক উত্তরপত্রের স্ক্যান করা ছবি অস্পষ্ট ছিল, সার্ভার বারবার বিকল হয়েছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছে, অনেক অভিযোগের দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কিত কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ
সিবিএসই প্রথমে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দুটি দফায় দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।
পরে পরীক্ষার মাত্র ছয় মাস আগে সংস্থাটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত শর্ত শিথিল করে। এরপর কাজটি দেওয়া হয় হায়দরাবাদভিত্তিক কোম্পানি কোয়েমট এডু টেককে।
এই প্রতিষ্ঠানটির অতীতও বিতর্কিত। ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্যের একটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ব্যাপক ভুল মূল্যায়নের অভিযোগ ওঠে। সে সময় প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয় এবং অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
শিক্ষার্থীরাই উন্মোচন করছে অনিয়ম
এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এর বড় অংশই প্রকাশ্যে এনেছেন শিক্ষার্থীরা।
ভেদান্ত শ্রিভাসটাভা নামের এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন যে সিবিএসই তাকে যে স্ক্যান করা উত্তরপত্র দেখিয়েছে, সেটি তার নিজের নয়।
তিনি নিজের অন্যান্য উত্তরপত্রের ছবি প্রকাশ করে দেখান যে সেখানে হাতের লেখা সম্পূর্ণ আলাদা।
তার পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজারো শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ জানাতে শুরু করেন।
পরে সিবিএসই ভুল স্বীকার করে তার আসল উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করে এবং ফলাফল সংশোধন করে।
আরও গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগ
রাঁচির ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্বার্থক সিদ্দান্ত নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিতর্কিত কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বেঙ্গালুরুর ১৯ বছর বয়সী নিস্বর্গ অধিকারী দাবি করেন, তিনি মূল্যায়ন পোর্টালের একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছেন।
তার অভিযোগ, তিনি পরীক্ষকের পরিচয়ে সিস্টেমে প্রবেশ করে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগও দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি ফেব্রুয়ারিতেই এসব ত্রুটি সিবিএসইকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান না হওয়ায় পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারনেট সোসাইটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রাণেশ প্রকাশ বলেন, ভারতে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্তকারীদের উৎসাহিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
তার মতে, এই ধরনের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও সমাধানের জন্য সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও জবাবদিহি থাকা উচিত।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
বিরোধী দলগুলো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন যে সরকার প্রকৃত দায়ীদের রক্ষা করছে।
তার দাবি, শিক্ষা মন্ত্রীকে অপসারণ করে স্বাধীন তদন্ত করতে হবে।
কংগ্রেস নেতা জেইরাম রামেশ অভিযোগ করেন, সিবিএসইর চেয়ারম্যান ও সচিবকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে মূল দায়ীদের আড়াল করার জন্য।
অন্যদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, এই সিদ্ধান্ত লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
উত্তর ভারতের রায়বেরেলির শিক্ষার্থী প্রতীক সিংয়ের মতো অনেকেই মনে করেন, এই ফলাফল তাদের পুরো ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
ফল প্রকাশের পর পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করতে গিয়েও তিনি সমস্যার মুখোমুখি হন, কারণ সিবিএসইর ওয়েবসাইট দীর্ঘ সময় অচল ছিল।
তার আশঙ্কা, এই ফলাফলই তার কলেজে ভর্তি, চাকরি এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নানা সুযোগ নির্ধারণ করবে।
সিবিএসই কেলেঙ্কারি তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নিয়ে বিতর্ক নয়; এটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সরকারি জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এখন ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম
What's Your Reaction?