উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমসহ বিভিন্ন ফল রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। এতে খুশি ছিলেন চাষিরা। তবে মৌসুমের শেষের দিকে এসে সেই প্রশান্তি রূপ নিয়েছে হতাশায়। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে বাজারে আসায় দাম কমে গেছে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, আধুনিক হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে তারা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবেন। আরও পড়ুন এক যুগে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৫০ লাখ টন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমচাষি আব্দুর রহিম ২০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় এখন লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা থাকলে আমাদের আম নষ্ট হতো না। আমগুলো প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো যেত। এটা হলে দাম ভালো পাওয়া যেত।’ ‘দেশে ফল উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায়

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমসহ বিভিন্ন ফল রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। এতে খুশি ছিলেন চাষিরা। তবে মৌসুমের শেষের দিকে এসে সেই প্রশান্তি রূপ নিয়েছে হতাশায়। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে বাজারে আসায় দাম কমে গেছে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা।

কৃষকদের দাবি, আধুনিক হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে তারা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমচাষি আব্দুর রহিম ২০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় এখন লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা থাকলে আমাদের আম নষ্ট হতো না। আমগুলো প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো যেত। এটা হলে দাম ভালো পাওয়া যেত।’

‘দেশে ফল উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এখনো সীমিত। ফলে মৌসুমি ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হয়’

একই ধরনের অভিযোগ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলার বেশিরভাগ ফলচাষির। তারা বলছেন, প্রতিবছর ফল উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না।

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফল উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এখনো সীমিত। ফলে মৌসুমি ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হয়।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় মোট এক লাখ ১২ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া চলতি মৌসুমে চার জেলায় প্রায় ৪৭টি জাতের ফল চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলে শুধু আম নয়; লিচু, লেবু, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফলের উৎপাদনও বাড়ছে।

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যেখানে উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৪৪ হাজার ৬৯১ টন। নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে চার লাখ ২১ হাজার ৬১২ টন। নাটোরে পাঁচ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৭২ হাজার ৮৫৩ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন।

‘বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের পর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়া ফলের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি’

এ চার জেলায় এক হাজার ৭০১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৫০ টন। এক হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে লেবু উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ২৬১ মেট্রিক টন। এর পাশাপাশি ৪৯৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের উৎপাদন হয়েছে সাত হাজার ৯৩৭ টন। ১২২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে ড্রাগন ফল। উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ১৯৩ টন।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের পর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়া ফলের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

বাঘার আমচাষি আব্দুল মালেক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আম চাষ করে বর্তমানে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচর্যার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। যদি আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক হিমাগার বা দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমরা মৌসুমের চাপের সময় কম দামে বিক্রি না করে পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারতাম।’

‘রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিত আম থেকে জুস, পাল্প, পিউরি, শুকনা আম, আমচুর, জ্যাম, জেলি ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ড্রাগন ফল, লিচু ও স্ট্রবেরি থেকেও মূল্য সংযোজনভিত্তিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিল্প কারখানা না থাকায় বেশিরভাগ ফল কাঁচা অবস্থাতেই বাজারজাত করা হয়’

নওগাঁর আমচাষি আরিফুল ইসলাম বলেন, “এবছর গাছে আমের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখা যাচ্ছে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি। ফলে দাম অনেক কমে গেছে। কৃষকরা যে পরিমাণ শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, সেই তুলনায় লাভ পাচ্ছেন না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে বাগান পরিচর্যা করেন। দাম কম থাকলে তাদের ঋণ পরিশোধ করতেও কষ্ট হয়।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি রফিকুল রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জেলার অর্থনীতির বড় অংশই আমকে ঘিরে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতিবছর একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মৌসুমের শেষের দিকে অনেক আম কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই। হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে আমরা ন্যায্যমূল্য পেতাম।’

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

শুধু আম নয়, অন্যান্য ফলচাষিরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। গোদাগাড়ীর ড্রাগন ফল চাষি শাহিন হোসেন বলেন, ‘ড্রাগন ফল যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যেত, তাহলে বাজারে ভালো দাম পেতাম।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে একসঙ্গে বেশি ফল ওঠার কারণে দাম কমে যায়। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ থাকলে চাষিরা ন্যায্য মূল্য পেতেন।’

‘এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। তবে এ বিষয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। একটি দল পরিদর্শন করে গেছে। আশা করা যায়, আগামী দু-এক অর্থবছরের মধ্যে প্রসেসিং-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে’— বিপণন কর্মকর্তা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিত আম থেকে জুস, পাল্প, পিউরি, শুকনা আম, আমচুর, জ্যাম, জেলি ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ড্রাগন ফল, লিচু ও স্ট্রবেরি থেকেও মূল্য সংযোজনভিত্তিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিল্প কারখানা না থাকায় বেশিরভাগ ফল কাঁচা অবস্থাতেই বাজারজাত করা হয়।

আম ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম সানা জাগো ‍নিউজকে বলেন, ‘আম ও অন্যান্য ফলগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ খুব কম হয়। আম কিছুটা রপ্তানি হলেও বাকিটা প্রায় কিছুই হয় না। ফলে অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ছাড়া এত ফল দীর্ঘদিন রাখা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. সাবিনা বেগম বলেন, ‘আমাদের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অনেক ফল নষ্ট হয়। একসঙ্গে যখন অনেক ফল ওঠে তখন সব ফল বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এ কারণে কৃষকরা সঠিক দাম পান না।’

উৎপাদনে রেকর্ড, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফল

তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন হলেও সেই তুলনায় প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত উৎপাদিত ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ না হওয়ায় কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকদের আয় বাড়বে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের অপচয়ও কমে আসবে।

রাজশাহীর সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। তবে এ বিষয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। একটি দল পরিদর্শন করে গেছে। আশা করা যায়, আগামী দু-এক অর্থবছরের মধ্যে প্রসেসিং-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ‘আমের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগও বাড়াতে হবে। তা নাহলে প্রতিবছর আমের মৌসুমে কৃষকরা বাজারে মূল্য অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন, যা দীর্ঘমেয়াদে চাষিদের অনুৎসাহিত করবে।’

এসআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow