উৎসবের হাটে বাড়ছে ঝুঁকি, দরকার বাড়তি সতর্কতা

সামনেই কোরবানির ঈদ। ঈদুল ফিতরের আত্মশুদ্ধি ও আনন্দের পর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসে ত্যাগের মহিমা এবং ভিন্ন এক অর্থনৈতিক গতিশীলতা নিয়ে। কোরবানির ঈদ মানেই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বিশাল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—দেশজুড়ে বসে শত শত পশুর হাট। গ্রামে লালন-পালন করা পশুকে শহরের বাজারে নিয়ে আসা, বেপারিদের আনাগোনা আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কোরবানির এই কয়েক দিনে সারা দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করার ক্ষেত্রে এই ঈদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের চাকা ঘোরে যে জ্বালানিতে, তা হলো ‘টাকা’। এই লেনদেন প্রক্রিয়াটি আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ ও উৎসবমুখর মনে হয়, এর ভেতরের ঝুঁকি ও জটিলতা ততটাই গভীর। বিশেষ করে হাটের উপচে পড়া ভিড়ে নগদ টাকার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা এক বিরাট উদ্বেগের বিষয়। তাই কোরবানির এই মৌসুমে ‘পশুর হাটে টাকা সাবধানে রাখুন’—এই সতর্কবার্তাটি কেবল সাধারণ উপদেশ নয়, বরং সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন। আমাদের দেশের পশুর হাটগুলোতে এখনো লেনদেনের সিংহভাগই সম্পন্ন হয়

উৎসবের হাটে বাড়ছে ঝুঁকি, দরকার বাড়তি সতর্কতা

সামনেই কোরবানির ঈদ। ঈদুল ফিতরের আত্মশুদ্ধি ও আনন্দের পর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসে ত্যাগের মহিমা এবং ভিন্ন এক অর্থনৈতিক গতিশীলতা নিয়ে। কোরবানির ঈদ মানেই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বিশাল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—দেশজুড়ে বসে শত শত পশুর হাট। গ্রামে লালন-পালন করা পশুকে শহরের বাজারে নিয়ে আসা, বেপারিদের আনাগোনা আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কোরবানির এই কয়েক দিনে সারা দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করার ক্ষেত্রে এই ঈদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের চাকা ঘোরে যে জ্বালানিতে, তা হলো ‘টাকা’। এই লেনদেন প্রক্রিয়াটি আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ ও উৎসবমুখর মনে হয়, এর ভেতরের ঝুঁকি ও জটিলতা ততটাই গভীর। বিশেষ করে হাটের উপচে পড়া ভিড়ে নগদ টাকার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা এক বিরাট উদ্বেগের বিষয়। তাই কোরবানির এই মৌসুমে ‘পশুর হাটে টাকা সাবধানে রাখুন’—এই সতর্কবার্তাটি কেবল সাধারণ উপদেশ নয়, বরং সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন।

আমাদের দেশের পশুর হাটগুলোতে এখনো লেনদেনের সিংহভাগই সম্পন্ন হয় সনাতনী পদ্ধতিতে, অর্থাৎ সম্পূর্ণ নগদ টাকায়। একজন সাধারণ ক্রেতা যখন লক্ষাধিক বা তারও বেশি টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে সরাসরি হাটে যান, তখন তিনি অজান্তেই এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার দিকে পা বাড়ান।

পশুর হাটের চিরচেনা পরিবেশটি যদি আমরা একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব—সেখানে থাকে তীব্র গরম, ঘামের গন্ধ, হাজারো মানুষের গাদাগাদি, বিক্রেতাদের তীব্র হাঁকডাক আর কাঙ্ক্ষিত পশুটি কেনার এক চরম উত্তেজনা। এই পুরো পরিবেশ সাধারণ মানুষের মনোযোগকে সহজেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আর ঠিক এই সুযোগটিই নেয় অপরাধচক্র। ভিড়ের ভেতর ওঁৎ পেতে থাকা পকেটমার ও ছিনতাইকারীদের জন্য এই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ যেন এক নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা মঞ্চ। সামান্য অসতর্কতা বা চোখের পলকের অবহেলা নিমেষেই একটি পরিবারের ঈদের আনন্দকে বিষাদে পরিণত করতে পারে।

কেবল রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের বড় হাটগুলোতেই যে এই বিপত্তি ঘটে, তা কিন্তু নয়। মফস্বল বা গ্রামীণ অঞ্চলের হাটগুলোতেও চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে যারা জীবনের প্রথমবার হাটে যাচ্ছেন কিংবা যারা দূর-দূরান্ত থেকে পশু কিনতে বা বিক্রি করতে এসেছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অপরিচিত পরিবেশ, নতুন মুখ এবং নিজের টাকার হিসাবের প্রতি সামান্যতম অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও শারীরিক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে।

এমন বাস্তবতায় ক্রেতাদের টাকা ও নিজেদের সুরক্ষার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী কৌশল অবলম্বন করা জরুরি।

১। কোরবানির পশু কিনতে আমরা সাধারণত একা যাই না, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে যাই। হাটে প্রবেশের আগেই মোট নগদ টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে কোনো একজন দুর্ঘটনার শিকার হলেও পুরো টাকা খোয়ানোর ঝুঁকি থাকে না।

যে কোনো ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া আমাদের সমাজের একটি অন্ধকার দিক। হাটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জাল নোটের বিস্তার রোধ করা নিঃসন্দেহে প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কিন্তু কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি দিয়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব, যদি না ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে।

২। পুরো টাকা কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাগ বা পকেটে না রেখে পোশাকের বিভিন্ন নিরাপদ অংশে বা একাধিক ব্যাগে ছড়িয়ে রাখুন। চোর বা ছিনতাইকারীরা সাধারণত লক্ষ্য করে, ক্রেতা কোন পকেট বা ব্যাগটি আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সেই অতিসুরক্ষিত স্থানটিই তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।

৩। হাটে প্রবেশের পর থেকেই চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ তৈরি হওয়া কৃত্রিম ধাক্কাধাক্কি, অপ্রত্যাশিত জটলা কিংবা অতিরিক্ত বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে কেউ গায়ে পড়ে কথা বলতে এলে সতর্ক হোন। এগুলো অনেক সময় অপরাধীদের মনোযোগ ভিন্নদিকে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল হতে পারে।

৪। হাটে ঢোকার পরপরই নিকটস্থ পুলিশ ক্যাম্প, র‍্যাব বা স্বেচ্ছাসেবকদের বুথ কোথায় অবস্থিত, তা মনে রাখুন। কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে দ্বিধা না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অবহিত করুন।

আমাদের লেখাগুলো প্রায়শই ক্রেতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, কিন্তু হাটে আসা বিক্রেতা বা প্রান্তিক খামারিরা আরও বেশি অসহায় এবং প্রতারণার সহজ শিকার। তারা বছরের পর বছর ধরে একটি পশুকে পরম মমতায় বড় করেন এই একটি দিনের লাভের আশায়। কিন্তু হাটের অসাধু চক্র তাদের এই সরলতার সুযোগ নেয়।

আজকাল জাল নোটের কারবারিরা কোরবানির হাটকে তাদের প্রধান টার্গেট বানায়। তীব্র আলো-আঁধারির মধ্যে বা রাতের বেলা তাড়াহুড়ো করে টাকা গোনার সময় আসল নোটের ভাঁজে জাল নোট ঢুকিয়ে দেওয়া একটি পুরোনো ও সুপরিচিত কৌশল। পশু বিক্রি করে বিপুল টাকা হাতে পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই না করে ব্যাগে পুরে রাখলেন, পরে ব্যাংকে জমা দিতে গিয়ে দেখা গেল নোটগুলো জাল। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা অনেক খামারির জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। এছাড়া ভুয়া বা জাল এসএমএস পাঠিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা চলে এসেছে বলে বিক্রেতাকে বোকা বানানোর আধুনিক জালিয়াতিও এখন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক্ষেত্রে বিক্রেতাদের কিছু করণীয় অত্যন্ত জরুরি।

১। টাকা হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি নোট ভালো করে পরীক্ষা করে নিন।

২। বর্তমানে বড় বড় হাটগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বুথ স্থাপন করা হয়। এসব বুথে কোনো খরচ ছাড়াই জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন এবং টাকা গণনার সুবিধা থাকে। বিক্রেতাদের উচিত এই প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার করা।

৩। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করলে কেবল ক্রেতার মুখের কথা বা তার ফোনের স্ক্রিন দেখে নিশ্চিত হবেন না। যতক্ষণ না নিজের মোবাইলে ব্যালেন্স যোগ হওয়ার নিশ্চিতকরণ এসএমএস আসছে এবং ব্যালেন্স চেক করে নিশ্চিত হচ্ছেন, ততক্ষণ পশুর রশি হাতবদল করবেন না।

৪। পশু বিক্রির পর বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে হাটে বসে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। টাকা পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ে তা নিকটবর্তী ব্যাংক বুথে জমা দিন অথবা নিরাপদ মাধ্যমে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।

যেকোনো ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া আমাদের সমাজের একটি অন্ধকার দিক। হাটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জাল নোটের বিস্তার রোধ করা নিঃসন্দেহে প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কিন্তু কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি দিয়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব, যদি না ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে।

ঈদের আনন্দ হোক নিরাপদ, আমাদের উৎসবের প্রস্তুতি হোক নির্বিঘ্ন ও সাবলীল। একটি বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একজন খামারি যেন তার ন্যায্য পাওনা নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারেন, আর একজন ক্রেতা যেন কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই তার পছন্দের পশুটি ঘরে তুলতে পারেন—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে একটু সচেতন হই, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সামান্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিই, তবে এই উৎসবের অর্থনীতি হবে যেমন সুরক্ষিত, ঈদের আনন্দও হবে তেমনই নির্বিঘ্ন।

লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow