ঋণের নামে একের পর এক প্রতারণার ফাঁদ, টার্গেট গ্রামের হতদরিদ্ররা
গাইবান্ধায় একের পর এক প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অভিনব সব কায়দা ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেই চলছে। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল। এবার বিনামূল্যে পাকা ঘর, নলকূপ ও গবাদিপশু দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অর্থ খুইয়ে চরম বিপদে পড়েছেন গ্রামের সহজ-সরল হতদরিদ্র এসব মানুষ। এ ঘটনার বিচার ও অর্থ ফেরতের দাবি ভুক্তভোগীদের। সরেজমিনে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতারক শহিদুল ইসলাম বগুড়া সদরের বৃন্দাবন পাড়ার আকবর আলীর ছেলে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মধ্য নারায়ণপুর এলাকার একটি মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন। নিজেকে একটি বড় সংগঠনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রতারক শুধু সদর উপজেলা
গাইবান্ধায় একের পর এক প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অভিনব সব কায়দা ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেই চলছে। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।
এবার বিনামূল্যে পাকা ঘর, নলকূপ ও গবাদিপশু দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অর্থ খুইয়ে চরম বিপদে পড়েছেন গ্রামের সহজ-সরল হতদরিদ্র এসব মানুষ। এ ঘটনার বিচার ও অর্থ ফেরতের দাবি ভুক্তভোগীদের।
সরেজমিনে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতারক শহিদুল ইসলাম বগুড়া সদরের বৃন্দাবন পাড়ার আকবর আলীর ছেলে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মধ্য নারায়ণপুর এলাকার একটি মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন। নিজেকে একটি বড় সংগঠনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
অভিযোগ উঠেছে, এই প্রতারক শুধু সদর উপজেলা নয়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও ফুলছড়ি উপজেলাতেও একইভাবে কয়েক হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
শহিদুল ইসলাম শুরুতে মাত্র দুইশো টাকার বিনিময়ে দুটি পরিবারকে নলকূপ বসিয়ে দেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয়। একইভাবে পরে আরও শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ১৫টি নলকূপ স্থাপন করেন। বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে তিনি বড় ধরনের প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেন। পরে নতুন প্যাকেজ হিসেবে তিনি ঘোষণা দেন, একটি আধা পাকা ঘর, একটি নলকূপ, একটি গাভি ও একটি ছাগল দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে পরিবার প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন তিনি। ঘর পাওয়ার আশায় দরিদ্র মানুষেরা কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তার হাতে টাকা তুলে দেন। প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয় সংগঠনের সিলযুক্ত টোকেন।
সরেজমিনে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মধ্য নারায়ণপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আটটি ঘরের শুধু চালা বসিয়েই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
খোলাবাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী বজলার রহমান বলেন, ‘ঘর পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে হুজুরকে টাকা দিয়েছিলাম। এখন তিনি পলাতক। আমরা কিভাবে এই ক্ষতি সামাল দিব জানি না।’
আরেক ভুক্তভোগী জামের তল গ্রামের সোহেল মিয়া জানান, ‘হুজুরকে বিশ্বাস করে বিরাট ভুল করেছি। তিনি যে এভাবে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবেন, কোনোদিন কল্পনাও করিনি। কিভাবে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তাও জানি না। স্থানীয় আল আমিন হুজুরের মাধ্যমে আমরা শহিদুল হুজুরকে টাকা দিয়েছি।’
এই ঘটনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফেজ আল আমীনও। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই প্রতারণার সঙ্গে আল আমিনও জড়িত।
অভিযোগ স্বীকার করে আল আমিন বলেন, তার মাধ্যমে ৩৬৬ জন ব্যক্তির টাকা শহিদুল ইসলামের হাতে গেছে। ২০ হাজার করে হলেও টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ টাকার পাওনাদারদের চাপে এবং টাকা উদ্ধারের আশায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাওলানা শহিদুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, আমি যার যার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, তার তার উপকার করছি। সবাই আমার নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করছে। এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
এর আগে গত ১ মে উচ্চ মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে যায় ‘তিশা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি কথিত এনজিও। এতে শতাধিক গ্রাহক চরম বিপাকে পড়েছেন। এই কথিত এনজিওর পরিচালক জসিম মিয়া মাত্র সাত দিনের মধ্যেই কোটি টাকার প্রতারণা করে কর্মকর্তাসহ রাতারাতি পালিয়ে যান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা সঞ্চয়ে ১ লাখ এবং ১ লাখ টাকায় ১০ লাখ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সংস্থাটির কর্মকর্তারা। নির্ধারিত সময়ে ঋণ নিতে এনজিওর ভাড়া করা কার্যালয়ে গিয়ে গ্রাহকরা দেখেন, অফিসে তালা ঝুলছে। কর্মকর্তারাও লাপাত্তা। বাড়ির মালিক সাইফুল ইসলাম তাদের কোনো পরিচয়ই দিতে পারেনি। তার নিজের ছেলে এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
পরদিন ২ মে ভুক্তভোগীদের পক্ষে গাইবান্ধা সদর থানায় প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন গাইবান্ধা শহরের সবুজ পাড়ার সেনেটারি ব্যবসায়ী রতন মিয়া।
এ ব্যাপারে জানতে তিশা ফাউন্ডেশনের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জসিম মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেফতারে কাজ চলছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
গাইবান্ধা নাগরিক মঞ্চের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শরীফ আল রাজিব বলেন, প্রলোভনের এমন ফাঁদ অত্যন্ত ভয়ংকর ঘটনা। এসব থেকে সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
আনোয়ার আল শামীম/এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?