এই ব্রাজিল কি সেই ব্রাজিল?
ঘুমের ঘোর তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চোখ ঘষতে ঘষতে তাকিয়ে আছি টেলিভিশন স্ক্রিনের দিকে। বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে ম্যাচ শুরু হওয়ায় পুরো খেলাটি দেখা সম্ভব হয়নি। তবে শেষ কয়েক মিনিটে যা দেখলাম তাতে মনে হয়েছিল, হয়তো নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, ব্রাজিলের বিদায় প্রায় নিশ্চিত। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে শেষ ষোলোর বাধা ডিঙাতে পারলো না সেলেসাওরা। বিশ্বকাপ শুরু হলেই বাংলাদেশে ফুটবল উৎসব শুরু হয়ে যায়। কে ব্রাজিল, কে আর্জেন্টিনা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের আড্ডায় কিংবা অফিসে সব জায়গায় তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। এই উন্মাদনা নতুন নয়। আমাদের দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই যেন আবেগ, উল্লাস আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অন্যরকম উৎসব। আমার ফুটবল বোঝা শুরু ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেই থেকে যতগুলো বিশ্বকাপ দেখেছি, তাতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও জার্মানির খেলাই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। কোনো নির্দিষ্ট দলের অন্ধ সমর্থক কখনোই ছিলাম না। বরং যে দল সুন্দর ফুটবল খেলে, আক্রমণ
ঘুমের ঘোর তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চোখ ঘষতে ঘষতে তাকিয়ে আছি টেলিভিশন স্ক্রিনের দিকে। বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে ম্যাচ শুরু হওয়ায় পুরো খেলাটি দেখা সম্ভব হয়নি। তবে শেষ কয়েক মিনিটে যা দেখলাম তাতে মনে হয়েছিল, হয়তো নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, ব্রাজিলের বিদায় প্রায় নিশ্চিত। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে শেষ ষোলোর বাধা ডিঙাতে পারলো না সেলেসাওরা।
বিশ্বকাপ শুরু হলেই বাংলাদেশে ফুটবল উৎসব শুরু হয়ে যায়। কে ব্রাজিল, কে আর্জেন্টিনা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের আড্ডায় কিংবা অফিসে সব জায়গায় তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। এই উন্মাদনা নতুন নয়। আমাদের দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই যেন আবেগ, উল্লাস আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অন্যরকম উৎসব।
আমার ফুটবল বোঝা শুরু ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেই থেকে যতগুলো বিশ্বকাপ দেখেছি, তাতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও জার্মানির খেলাই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। কোনো নির্দিষ্ট দলের অন্ধ সমর্থক কখনোই ছিলাম না। বরং যে দল সুন্দর ফুটবল খেলে, আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে এবং দর্শকদের আনন্দ দেয়, সেই দলকেই ভালো লাগে।
তবে এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, দলটি যেন আগের সেই ব্রাজিল আর নেই। তাদের খেলায় সেই গতি, সৃজনশীলতা কিংবা আত্মবিশ্বাস খুব একটা চোখে পড়েনি এবার। বল দখলে রাখলেও আক্রমণে ধার ছিল না। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য ব্রাজিলের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকরা হয়তো আমার সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু একজন সচেতন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, ফুটবলের মাঠে ব্রাজিলের আধিপত্য যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি যে কটি ম্যাচ দেখেছি, আর্জেন্টিনার খেলাও বেশ উপভোগ করেছি। বিশেষ করে কেপ ভার্দের বিপক্ষে তাদের ম্যাচটি ছিল দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ম্যাচটি সহজ হবে বলে অনেকেই ভেবেছিলেন, কিন্তু কেপ ভার্দে অসাধারণ লড়াই করেছে। শেষ পর্যন্ত কষ্ট করে জয় তুলে নিতে হয়েছে মেসিদের। ছোট দলগুলো এখন আর শুধু অংশ নিতে আসে না, বড় দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতেও আসে, এটাই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
ফ্রান্সও গত কয়েকটি বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী পারফরম্যান্স করে আসছে। তাদের দলে প্রতিভার যেন অভাব নেই। একসময় আঁতোয়া গ্রিজম্যানের খেলা খুব ভালো লাগতো। এখন সেই জায়গা দখল করেছেন কিলিয়ান এমবাপে। তার গতি, দক্ষতা ও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ।
ব্রাজিলের কথা বলতে গেলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রোনালদো ও রোনালদিনহোর ফুটবল জাদু। তাদের খেলা দেখেই বড় হয়েছি। রোনালদোর গোল করার সহজাত ক্ষমতা কিংবা রোনালদিনহোর ড্রিবলিং ও হাসিমাখা ফুটবল, এসবই ছিল ফুটবলকে ভালোবাসার অন্যতম কারণ। সেই ব্রাজিলের সঙ্গে বর্তমান ব্রাজিলের ফারাক অনেক।
এর আগের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন। বয়সকে হার মানিয়ে মাঝমাঠে যেভাবে খেলেছেন, তা সত্যিই অনন্য। আর আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার পর লিওনেল মেসিই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার খেলোয়াড় এখন। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখা সহজ নয়, কিন্তু মেসি সেটিই করে দেখিয়েছেন।
এবারের বিশ্বকাপে নতুন করে যিনি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন, তিনি নরওয়ের আর্লিং হালান্ড। শেষ ষোলোর ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ব্রাজিলের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের ৭৯ ও ৯০ মিনিটে দুটি গোল করে তিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। সেই দুই গোলই নরওয়েকে ইতিহাস গড়ার পথে নিয়ে গেলো। অতিরিক্ত সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ব্রাজিলের ভাগ্য আর বদলায়নি।
চার বছর অপেক্ষার পর ব্রাজিলের কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স আশা করিনি। অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তারা যাবে এমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা। ইতিহাস, পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যে দল নির্দিষ্ট দিনে ভালো খেলবে, তারাই জয় পাবে।
আমি মনে করি, বিশ্বকাপের ট্রফি সেই দলের হাতেই উঠুক যারা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে ধারাবাহিক ও আকর্ষণীয় ফুটবল খেলছে। ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো নাম নয়, শেষ পর্যন্ত পারফরম্যান্স।
আধুনিক ফুটবল নিয়ে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। অনেকের মতো আমারও মনে হয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল দিন দিন অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পন্সর, বিজ্ঞাপন সব মিলিয়ে ফুটবলের ব্যবসায়িক দিক এখন অনেক বড়। এবারের বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়েও নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, খেলার স্বাভাবিক গতি ভেঙে বিজ্ঞাপনের সুযোগ তৈরি করতেই এমন বিরতি। যদিও খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয় ফিফাকে।
ফুটবল বিশ্বকাপ এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। প্রতিটি ম্যাচ নতুন করে গল্প লিখে, নতুন তারকার জন্ম দেয়, আবার কোনো কোনো পরাশক্তির স্বপ্নও ভেঙে যায়। এবারের বিশ্বকাপে সেই গল্পের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত বিদায়।
এসএনআর/এমএমআর
What's Your Reaction?