একজন ফায়ারফাইটার দিয়ে সব ধরনের অভিযান সম্ভব নয়
দুর্যোগের পর প্রথম ঘণ্টাটি ঘড়ির সাধারণ ষাট মিনিট নয়। এটি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সময়। আগুন, রাসায়নিক নিঃসরণ, ভবনধস, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা নৌদুর্ঘটনার পর এই সময়ের মধ্যেই সঠিক দল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। তা না হলে কয়েক ঘণ্টা পর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল জনবল মোতায়েন করেও হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়কেই আমরা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলি। তবে গোল্ডেন আওয়ারের সুফল পেতে হলে শুধু দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়। বিপদের ধরন বুঝে সঠিক দল পাঠানো, ঘটনাস্থলে পৌঁছে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একটি অভিন্ন কমান্ডে পরিচালনা করাই এর মূল কথা। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, ভবনধস, পাহাড়ধস, রাসায়নিক বিপর্যয়, নদী ও বন্যায় উদ্ধার, উচ্চ ভবন থেকে উদ্ধার, কূপ ও সেপটিক ট্যাংকের দুর্ঘটনাসহ অসংখ্য জরুরি পরিস্থিতিতে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সীমিত সম্পদ, যানজট, ঘনবসতি এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তাঁদের পেশাগত নিষ্ঠা, ঝুঁকি
দুর্যোগের পর প্রথম ঘণ্টাটি ঘড়ির সাধারণ ষাট মিনিট নয়। এটি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সময়। আগুন, রাসায়নিক নিঃসরণ, ভবনধস, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা নৌদুর্ঘটনার পর এই সময়ের মধ্যেই সঠিক দল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। তা না হলে কয়েক ঘণ্টা পর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল জনবল মোতায়েন করেও হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়কেই আমরা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলি। তবে গোল্ডেন আওয়ারের সুফল পেতে হলে শুধু দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়। বিপদের ধরন বুঝে সঠিক দল পাঠানো, ঘটনাস্থলে পৌঁছে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একটি অভিন্ন কমান্ডে পরিচালনা করাই এর মূল কথা।
বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, ভবনধস, পাহাড়ধস, রাসায়নিক বিপর্যয়, নদী ও বন্যায় উদ্ধার, উচ্চ ভবন থেকে উদ্ধার, কূপ ও সেপটিক ট্যাংকের দুর্ঘটনাসহ অসংখ্য জরুরি পরিস্থিতিতে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সীমিত সম্পদ, যানজট, ঘনবসতি এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তাঁদের পেশাগত নিষ্ঠা, ঝুঁকি গ্রহণ ও আত্মত্যাগ জাতীয় স্বীকৃতির দাবিদার।
কিন্তু তাঁদের সাহসকে জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত ঘাটতির স্থায়ী বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। একজন সদস্যকে একই সঙ্গে কাঠামোগত অগ্নিনির্বাপণকারী, হ্যাজম্যাট টেকনিশিয়ান, ডুবুরি, প্যারামেডিক, ধ্বংসস্তূপ উদ্ধারকারী এবং উচ্চ ভবন উদ্ধার বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেওয়া আধুনিক জরুরি ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
একজন ফায়ারফাইটার সব ধরনের জরুরি অবস্থায় প্রথম সাড়াদানকারী হতে পারেন; কিন্তু তিনি প্রতিটি বিশেষায়িত অভিযানের একমাত্র বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না।
বিপদ এক নয়, তাই দলও এক হতে পারে না
সাধারণ মানুষের কাছে আগুন নেভানো, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি থেকে মানুষ বের করা, রাসায়নিক লিক বন্ধ করা কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের প্রতিটি কাজই ‘উদ্ধার অভিযান’। কিন্তু পেশাগত ও কারিগরি বিবেচনায় এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অপারেশন।
একটি জ্বলন্ত ভবনে প্রবেশ করতে হলে আগুনের আচরণ, ধোঁয়া ও তাপের গতিপথ, ভবনের নির্মাণপ্রকৃতি, শ্বাসযন্ত্রের ব্যবহার, হোস ব্যবস্থাপনা, ভেন্টিলেশন, অনুসন্ধান কৌশল এবং হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়ার সতর্কসংকেত বুঝতে হয়। কখন প্রবেশ করা যাবে, কোথায় অবস্থান নিতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দলকে প্রত্যাহার করতে হবে—এসব সিদ্ধান্তের ওপর উদ্ধারকারীদের জীবন নির্ভর করে।
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধারকারীকে জানতে হয় গাড়ির স্থিতিশীলতা, জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পদ্ধতি, এয়ারব্যাগের ঝুঁকি, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উচ্চ ভোল্টেজ ব্যাটারি, হাইড্রোলিক কাটার ও স্প্রেডারের ব্যবহার এবং আহত ব্যক্তির মেরুদণ্ড সুরক্ষিত রেখে তাঁকে বের করার কৌশল।
একবার কোনো প্রশিক্ষণ নিলেই সারাজীবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়া যায় না। নিয়মিত অনুশীলন না করলে দক্ষতা কমে যায়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, ভবনের নির্মাণপদ্ধতি, যানবাহনের ধরন এবং রাসায়নিক ঝুঁকিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই প্রশিক্ষণকে এককালীন আয়োজন নয়, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির দরজা দ্রুত কেটে ফেলাই সব সময় সফল উদ্ধার নয়। ভুলভাবে গাড়ির কোনো অংশ কাটলে অকার্যকর এয়ারব্যাগ সক্রিয় হতে পারে, বৈদ্যুতিক শক বা আগুনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং আহত ব্যক্তির আঘাত আরও গুরুতর হতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযানে উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসা দলকে পাশাপাশি কাজ করতে হয়।
দুই অভিযানের লক্ষ্যই জীবন রক্ষা; কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও অপারেশনাল কৌশল এক নয়।
রাসায়নিক দুর্ঘটনা সাধারণ আগুনের বর্ধিত সংস্করণ নয়
হ্যাজম্যাট বা বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের দুর্ঘটনাকে সাধারণ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা মারাত্মক ভুল। কোনো রাসায়নিক পানির সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরিত হতে পারে, কোনোটি দৃশ্যমান ধোঁয়া ছাড়াই প্রাণঘাতী বাষ্প ছড়াতে পারে। কোনো পদার্থ তাৎক্ষণিকভাবে মানুষকে অচেতন করতে পারে, আবার কোনো রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব ক্যানসার, অঙ্গহানি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশদূষণের মাধ্যমে অনেক পরে প্রকাশ পেতে পারে।
রাসায়নিক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—“কীভাবে আগুন নেভানো হবে?” প্রথমে জানতে হবে—পদার্থটি কী, কী পরিমাণে নিঃসৃত হয়েছে, বাতাস বা পানির সঙ্গে কোন দিকে ছড়াচ্ছে, মানুষ কীভাবে আক্রান্ত হতে পারে এবং উদ্ধারকারীদের কোন স্তরের ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবহার করতে হবে।
একটি পূর্ণাঙ্গ হ্যাজম্যাট দলের সক্ষমতার মধ্যে থাকতে হবে—
১. রাসায়নিক পদার্থ শনাক্তকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ;
২. বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন, বিষাক্ত গ্যাস, দাহ্য বাষ্প ও বিস্ফোরণসীমা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ;
৩. ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী হট, ওয়ার্ম ও কোল্ড জোন নির্ধারণ এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ;
৪. রাসায়নিকের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষামূলক পোশাক, গ্লাভস, বুট ও শ্বাসযন্ত্র নির্বাচন;
৫. নিরাপদভাবে লিক বন্ধ, ছড়িয়ে পড়া পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, কনটেইনমেন্ট ও বাষ্প দমন;
৬. আক্রান্ত ব্যক্তি, উদ্ধারকারী, সরঞ্জাম ও যানবাহনের কার্যকর ডিকনটামিনেশন;
৭. বিষক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা, ট্রায়াজ, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিডোট এবং দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর;
৮. দূষিত পদার্থ সংগ্রহ, নমুনা সংরক্ষণ, নিরাপদ অপসারণ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ; এবং
৯. ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে অভিন্ন কমান্ডে সমন্বয়।
সাধারণ অগ্নিনির্বাপণ পোশাক রাসায়নিক প্রতিরক্ষামূলক পোশাকের বিকল্প নয়। একইভাবে কয়েকটি গ্যাস ডিটেক্টর কিনে কোনো ইউনিটকে হ্যাজম্যাট দল ঘোষণা করলেই প্রকৃত সক্ষমতা তৈরি হয় না। যন্ত্রের নিয়মিত পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেশন, সঠিক নমুনা গ্রহণ, ফলাফল ব্যাখ্যা এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান প্রয়োজন।
ধ্বংসস্তূপে তাড়াহুড়া মানেই দ্রুত উদ্ধার নয়
ভূমিকম্প, বিস্ফোরণ কিংবা নির্মাণগত ব্যর্থতার কারণে ভবন ধসে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার প্রবল চাপ তৈরি হয়। কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়া ধ্বংসস্তূপ কাটা বা ভারী অংশ সরানো জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।
ভুল জায়গায় কংক্রিট কাটা, অসমভাবে ভার সরানো কিংবা অতিরিক্ত কম্পন সৃষ্টি করলে দ্বিতীয়বার ধস নেমে আটকে পড়া মানুষ ও উদ্ধারকারী—উভয়েরই মৃত্যু ঘটতে পারে। ধসে পড়া একটি ভবনের কোন অংশ স্থিতিশীল, কোথায় ফাঁকা জায়গা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোন অংশ আগে শোরিং করে নিরাপদ করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ও উদ্ধার বিশেষজ্ঞকে নিতে হয়।
আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযানে কাঠামোগত প্রকৌশলী, অনুসন্ধান বিশেষজ্ঞ, শোরিং টেকনিশিয়ান, চিকিৎসা সদস্য, ভারী উদ্ধারকারী, যোগাযোগ ও লজিস্টিকস দল প্রয়োজন। অনুসন্ধান ক্যামেরা, শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্র, লিফটিং ব্যাগ, শোরিং সিস্টেম এবং কংক্রিট কাটার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম; কিন্তু প্রশিক্ষিত দল ছাড়া এসব যন্ত্রই কখনো কখনো নতুন বিপদের উৎস হতে পারে।
ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার আবেগনির্ভর কোনো তৎপরতা নয়। এটি বিজ্ঞানসম্মত ও ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি অভিযান। অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ, কাঠামোর স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন, নিরাপদ প্রবেশপথ তৈরি, আটকে পড়া ব্যক্তির কাছে চিকিৎসা পৌঁছানো এবং পরিকল্পিতভাবে তাঁকে বের করে আনা—সব কাজ একই কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হতে হয়।
নদী, বন্যা ও ডাইভিং অভিযানেও আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী, খাল, হাওর, উপকূল, বন্যা ও নৌদুর্ঘটনায় উদ্ধার আমাদের জাতীয় জরুরি সক্ষমতার অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ভালো সাঁতার জানা আর পেশাদার জল-উদ্ধারকারী বা ডুবুরি হওয়া এক বিষয় নয়।
স্রোতের গতি, পানির গভীরতা, নিচের দৃশ্যমানতা, জোয়ার-ভাটা, নৌযানের স্থিতিশীলতা, পানির নিচে আটকে পড়ার ঝুঁকি, দূষণ এবং শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাওয়া—প্রতিটি বিষয় উদ্ধারকারীর নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।
এ ধরনের অভিযানে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত নৌযানচালক, সারফেস রেসকিউয়ার, ডুবুরি, উদ্ধার-দড়ি বিশেষজ্ঞ, পানির ওপর ও নিচে যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা। ডুবুরি দলের জন্য আলাদা নিরাপত্তা কর্মকর্তা, স্ট্যান্ডবাই ডুবুরি এবং ডাইভ পরিকল্পনাও থাকা দরকার।
সীমিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো সদস্যকে গভীর পানি, প্রবল স্রোত কিংবা ডুবে যাওয়া নৌযানের ভেতরে পাঠানো উদ্ধার নয়; বরং সেটি আরেকজন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী তৈরি করা।
বিশেষায়িত দল মানে আলাদা আলাদা বাহিনী নয়
বিশেষায়নের অর্থ প্রতিটি কাজের জন্য নতুন ও বিচ্ছিন্ন সংস্থা গঠন করা নয়। বরং একই জাতীয় জরুরি ব্যবস্থার মধ্যে কার কী দায়িত্ব, কতটুকু প্রশিক্ষণ এবং কোন পর্যায় পর্যন্ত কাজ করার অনুমোদন রয়েছে—তা স্পষ্ট করা।
ফায়ার সার্ভিস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও প্রধান সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে বড় অভিযানে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, রসায়নবিদ, ডুবুরি, ইউটিলিটি বিশেষজ্ঞ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রতিনিধি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে একটি অভিন্ন ইনসিডেন্ট কমান্ড ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় তিন স্তরের জরুরি সাড়া কাঠামো কার্যকর হতে পারে।
প্রথম স্তরে প্রতিটি ফায়ার স্টেশনে থাকবে সাধারণ জরুরি সাড়া দল। তারা অগ্নিনির্বাপণ, প্রাথমিক অনুসন্ধান, সাধারণ সড়ক উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হ্যাজম্যাট শনাক্তকরণে মৌলিকভাবে সক্ষম থাকবে। তাদের প্রধান কাজ হবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, প্রাথমিক মূল্যায়ন করা, তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা নেওয়া, বিপজ্জনক এলাকা বিচ্ছিন্ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ দল চাওয়া।
দ্বিতীয় স্তরে মহানগর, জেলা সদর এবং উচ্চঝুঁকির শিল্পাঞ্চলে থাকবে কাঠামোগত অগ্নিনির্বাপণ, উচ্চ ভবন উদ্ধার, ভারী যান উদ্ধার, হ্যাজম্যাট, কনফাইন্ড স্পেস, ট্রেঞ্চ রেসকিউ, নদী উদ্ধার এবং প্রাথমিক আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল।
তৃতীয় স্তরে বড় শিল্পবিপর্যয়, ব্যাপক রাসায়নিক নিঃসরণ, ভয়াবহ ভবনধস, ভূমিকম্প ও বড় নৌদুর্ঘটনা মোকাবিলায় থাকবে উচ্চ প্রশিক্ষিত আঞ্চলিক ও জাতীয় বিশেষজ্ঞ দল। প্রয়োজন হলে এসব দলকে বিমান, সড়ক বা নৌপথে দেশের যেকোনো স্থানে দ্রুত মোতায়েন করা যাবে।
এই তিন স্তরের মধ্যে আগেই যোগাযোগ, কর্তৃত্ব ও সহযোগিতার পদ্ধতি নির্ধারণ করা না থাকলে বড় দুর্যোগে জনবল বাড়বে, কিন্তু কার্যকর সক্ষমতা বাড়বে না।
গোল্ডেন আওয়ারের প্রস্তুতি শুরু হয় ঘটনার আগেই
গোল্ডেন আওয়ার শুধু সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত গাড়ি চালানোর নাম নয়। এর প্রস্তুতি শুরু হয় দুর্যোগ ঘটার অনেক আগে। কোথায় কোন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন স্টেশনে কী দক্ষতার দল আছে, তাদের সরঞ্জাম সচল কি না এবং কত সময়ের মধ্যে মোতায়েন করা যাবে—এসব তথ্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হয়।
জরুরি কল গ্রহণের সময় সঠিক প্রশ্ন করা, ঘটনাস্থলের অবস্থান ও ঝুঁকি শনাক্ত করা, বিপদের ধরন অনুযায়ী দল নির্বাচন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালকে সতর্ক করা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞকে দ্রুত ডাকা—সবই গোল্ডেন আওয়ারের অংশ।
একটি রাসায়নিক কারখানার জরুরি কলকে সাধারণ আগুন হিসেবে ধরে শুধু পানিবাহী গাড়ি পাঠানো হলে মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। ভবনধসের ঘটনায় প্রকৌশলী ও শোরিং দল কয়েক ঘণ্টা পরে পৌঁছালে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যাবে। নদী দুর্ঘটনায় ডুবুরি পৌঁছালেও নৌযান, আলো, যোগাযোগ ও চিকিৎসা সহায়তা না থাকলে তিনি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন না।
তাই জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিভিত্তিক ডিসপ্যাচ প্রটোকল, বিশেষায়িত দলের অবস্থান মানচিত্র, দক্ষতার হালনাগাদ তালিকা এবং চব্বিশ ঘণ্টার মোবিলাইজেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পদ নয়, সনদপ্রাপ্ত দক্ষতাই হোক দায়িত্বের ভিত্তি
বিশেষায়িত অভিযানে দায়িত্ব নির্ধারণ শুধু পদবি বা চাকরির বয়স দিয়ে করা উচিত নয়। কোন সদস্য কোন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন, বাস্তবে কী কাজ করতে পারেন এবং তাঁর দক্ষতার সনদ হালনাগাদ আছে কি না—এসবই হওয়া উচিত দায়িত্ব প্রদানের ভিত্তি।
সদস্যদের সক্ষমতা ‘অ্যাওয়ারনেস’, ‘অপারেশনস’, ‘টেকনিশিয়ান’, ‘টিম লিডার’ এবং ‘স্পেশালিস্ট অ্যাডভাইজার’—এ ধরনের স্তরে বিন্যস্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি স্তরের জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণঘণ্টা, ব্যবহারিক মহড়া, শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা, লিখিত ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পুনঃসনদের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একবার কোনো প্রশিক্ষণ নিলেই সারাজীবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়া যায় না। নিয়মিত অনুশীলন না করলে দক্ষতা কমে যায়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, ভবনের নির্মাণপদ্ধতি, যানবাহনের ধরন এবং রাসায়নিক ঝুঁকিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই প্রশিক্ষণকে এককালীন আয়োজন নয়, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সিদ্ধান্ত এখনই প্রয়োজন
প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে সারাদেশে ফায়ার সার্ভিসের জনবল, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত দক্ষতার একটি ডিজিটাল নিরীক্ষা করা সম্ভব। কোন সদস্যের কী দক্ষতা, কোন ইউনিটে কী সরঞ্জাম আছে, সেগুলো সচল কি না এবং কোথায় সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে—এই নিরীক্ষা তা স্পষ্ট করবে।
এক বছরের মধ্যে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জাতীয় মান, সনদ প্রদানের পদ্ধতি, দায়িত্বের সীমা এবং দল মোতায়েনের নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
তিন বছরের মধ্যে প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ হ্যাজম্যাট ইউনিট ও আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। ভৌগোলিক প্রয়োজন অনুযায়ী নদী, উপকূল ও বন্যা উদ্ধার দল গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় নগর ও শিল্পাঞ্চলে উচ্চ ভবন উদ্ধার, কনফাইন্ড স্পেস এবং ভারী যান উদ্ধার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
পাঁচ বছরের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, প্রকৌশলী, ইউটিলিটি সংস্থা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অভিন্ন ইনসিডেন্ট কমান্ড ও আন্তঃকার্যকর যোগাযোগব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। যৌথ মহড়া ছাড়া এই সমন্বয় শুধু নীতিমালার পাতায় থেকে যাবে। তাই জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত বাস্তবভিত্তিক মহড়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
একজন ফায়ারফাইটারের সাহসকে সম্মান করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাঁকে সব ধরনের বিপদের মধ্যে একা পাঠানো নয়। বরং যে অভিযানে যে দক্ষতা প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী তাঁকে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, সহায়ক জনবল এবং বিশেষজ্ঞ দলের সহযোগিতা দেওয়া।
আধুনিক দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো ‘সুপারম্যান’নির্ভর ব্যবস্থা নয়। এটি বিভিন্ন পেশা ও দক্ষতার মানুষের সমন্বিত দলগত কাজ। আগুনের জন্য প্রশিক্ষিত ফায়ার দল, রাসায়নিক বিপদের জন্য হ্যাজম্যাট দল, ধ্বংসস্তূপের জন্য আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল, নদী ও বন্যার জন্য বিশেষায়িত জল-উদ্ধার দল এবং আহতদের জন্য প্যারামেডিক্যাল দল প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সামনে প্রশ্নটি তাই খুবই পরিষ্কার—বিপদের ঘণ্টা বাজার পর আমরা কি আবারও একজন ফায়ারফাইটারের অসীম সাহসের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেব, নাকি বিপদ ঘটার আগেই একটি পেশাদার, বিশেষায়িত ও সমন্বিত জাতীয় জরুরি সাড়া ব্যবস্থা গড়ে তুলব?
মনে রাখতে হবে, দুর্যোগে সাহস অপরিহার্য; কিন্তু সাহসের সঙ্গে বিশেষায়িত দক্ষতা, সঠিক সরঞ্জাম এবং কার্যকর কমান্ড যুক্ত না হলে জীবনরক্ষাকারী গোল্ডেন আওয়ার খুব দ্রুতই ‘লস্ট আওয়ারে’ পরিণত হয়।
লেখক : অগ্নি, দুর্যোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, সাবেক পরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?