একটি সংস্কৃতি হারালে দরিদ্র হয় পুরো বাংলাদেশ
একটি দেশের মানচিত্র শুধু নদী, পাহাড়, সমুদ্র, জনপদ আর সীমানার সমষ্টি নয়। একটি দেশ তার মানুষের স্মৃতি, ভাষা, পোশাক, গান, উৎসব, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্বাস, জীবনদর্শন ও ইতিহাসেরও সমষ্টি। একই ভূখণ্ডে যখন নানান ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে, তখন সেই সমাজের পরিচয় একরৈখিক থাকে না; তা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, বহুস্তরীয় ও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির দিকে তাকালে চলবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ময়মনসিংহের গারো জনপদ, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল পল্লি, মণিপুরি সংস্কৃতির নিজস্ব ঐতিহ্য, খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, রাখাইনদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারসহ দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতিও বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকা সম্ভব নয়। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। দিবসটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা পালনের উপলক্ষ নয়; এটি পৃথিবীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। জাতিসংঘের স্বীকৃত এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে
একটি দেশের মানচিত্র শুধু নদী, পাহাড়, সমুদ্র, জনপদ আর সীমানার সমষ্টি নয়। একটি দেশ তার মানুষের স্মৃতি, ভাষা, পোশাক, গান, উৎসব, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্বাস, জীবনদর্শন ও ইতিহাসেরও সমষ্টি। একই ভূখণ্ডে যখন নানান ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে, তখন সেই সমাজের পরিচয় একরৈখিক থাকে না; তা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, বহুস্তরীয় ও সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির দিকে তাকালে চলবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ময়মনসিংহের গারো জনপদ, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল পল্লি, মণিপুরি সংস্কৃতির নিজস্ব ঐতিহ্য, খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, রাখাইনদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারসহ দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতিও বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকা সম্ভব নয়।
৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। দিবসটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা পালনের উপলক্ষ নয়; এটি পৃথিবীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। জাতিসংঘের স্বীকৃত এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন, রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা যেন কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা, ভূমি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বকে গ্রাস না করে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর টিকে থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ? প্রশ্নটির উত্তর শুধু মানবাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দেশের সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব পদ্ধতি। একটি লোকগান বিলুপ্ত হলে শুধু একটি সুর হারায় না; হারিয়ে যায় কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি অনুষ্ঠান হারায় না; হারিয়ে যায় একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারই অংশ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বহু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ভূমি ও ভূমির অধিকারের প্রশ্ন। বিশেষ করে পাহাড়ি ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন তাদের ভূমি, বন, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভূমি হারানো মানে তাঁদের কাছে শুধু একটি বসতভিটা হারানো নয়; এটি জীবিকা, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ারও নাম।
উন্নয়ন প্রকল্প, পর্যটন, বন ব্যবস্থাপনা, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ—বিভিন্ন কারণে অনেক জনগোষ্ঠী নিজেদের ভূমি ও সম্পদ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে। ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ শুধু অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে না; তা সামাজিক অবিশ্বাস ও সংঘাতেরও জন্ম দেয়।
এই সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রকে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তির দিকে যেতে হবে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া জরুরি। উন্নয়ন যদি মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে, তবে সেটিকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। রাস্তা, সেতু, পর্যটনকেন্দ্র কিংবা শিল্পপ্রকল্প মানুষের জীবনমান উন্নত করার জন্য; মানুষের অস্তিত্ব সংকটে ফেলার জন্য নয়।
একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব পদ্ধতি। একটি লোকগান বিলুপ্ত হলে শুধু একটি সুর হারায় না; হারিয়ে যায় কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি অনুষ্ঠান হারায় না; হারিয়ে যায় একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারই অংশ।
শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বহু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। একটি শিশু যে ভাষায় স্বপ্ন দেখে, সেই ভাষায় শিক্ষার প্রথম পাঠ না পেলে তার শেখার প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাধা তৈরি হতে পারে। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু গবেষণা হয়েছে। শিশুর প্রাথমিক শিক্ষায় নিজের ভাষার ব্যবহার তার আত্মবিশ্বাস, শেখার সক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু উদ্যোগকে সফল করতে হলে পাঠ্যবই, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, শিক্ষা-উপকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। শুধু বই ছাপলেই মাতৃভাষার শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। যে ভাষায় বই লেখা হচ্ছে, সেই ভাষায় দক্ষ শিক্ষক থাকতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও সংস্কৃতিকেও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা কম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে, জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। কোনো কোনো এলাকায় একজন গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এক মডেল দিয়ে পুরো দেশ পরিচালনা করা যাবে না। দুর্গম অঞ্চলের জন্য ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, টেলিমেডিসিন এবং জরুরি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছাবে—মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার জন্য অসম্ভব দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে না—এটাই হওয়া উচিত নীতি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো সাংস্কৃতিক একরূপতার চাপ। আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়ন মানুষের জীবনকে বদলে দিচ্ছে। এতে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, আবার কিছু ঐতিহ্য হারিয়েও যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের মাতৃভাষা, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে। এজন্য তরুণদের দায়ী করা সহজ; কিন্তু সমস্যাটি আরও গভীর।
যে সংস্কৃতি নিজের ভাষায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও মর্যাদার সুযোগ পায় না, সেই সংস্কৃতি টিকে থাকার জন্য কেবল আবেগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে শুধু লোকজ প্রদর্শনী বা পর্যটনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করলে চলবে না। এসব ভাষা ও সংস্কৃতি জীবন্ত রাখতে হবে শিক্ষা, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এখানে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিলুপ্তপ্রায় ভাষার ডিজিটাল আর্কাইভ, লোকগান ও লোককথার সংরক্ষণ, অনলাইন অভিধান, স্থানীয় ইতিহাসের নথিভুক্তকরণ এবং তরুণদের তৈরি সাংস্কৃতিক কনটেন্ট—এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে পারে। সংস্কৃতি সংরক্ষণকে জাদুঘরে বন্দি করে রাখলে তা বাঁচে না; সংস্কৃতিকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হয়।
তবে সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জনগোষ্ঠীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই জনগোষ্ঠীর মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে থাকতে হবে। তাঁদের নিয়ে নীতি হবে, কিন্তু তাঁদের বাদ দিয়ে—এটি গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সমঅধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু সমঅধিকার মানে সবার জন্য একই নীতি চাপিয়ে দেওয়া নয়। কারণ মানুষের বাস্তবতা এক নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি শিশুর শিক্ষার প্রয়োজন আর রাজধানীর একটি শিশুর শিক্ষার প্রয়োজন একই হতে পারে না। একইভাবে সমতলের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন পরিকল্পনাও এক রকম হতে পারে না। ন্যায়সংগত রাষ্ট্র কখনো অন্ধ সমতা প্রতিষ্ঠা করে না; বরং বৈচিত্র্যের বাস্তবতা বিবেচনা করে সমান মর্যাদা নিশ্চিত করে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়। বরং বৈচিত্র্যই একটি সমাজের শক্তি। পৃথিবীর বহু দেশ তাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ আদিবাসী অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নে নানা ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে। সব দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রয়োগযোগ্য নয়, কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি সুসংহত জাতীয় নীতি। ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ—এসব বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না।
একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ মানেই পিছিয়ে থাকা, ‘আদিবাসী’ মানেই উন্নয়নের বাইরে থাকা—এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। তাঁদের নিয়ে করুণা নয়, প্রয়োজন মর্যাদা। তাঁদের সংস্কৃতি কৌতূহলের বস্তু নয়, সমান সম্মানের ঐতিহ্য হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, তবে উন্নয়নের সুফল যেমন সবার কাছে পৌঁছাতে হবে, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতে নয়; সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সক্ষমতায়ও প্রকাশ পায়।
একটি ভাষা যখন হারিয়ে যায়, পৃথিবী তখন একটি জানালা হারায়। একটি জনগোষ্ঠী যখন ভূমি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সংকটে পড়ে, তখন শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—সমগ্র সমাজ দরিদ্র হয়ে যায়। কারণ বহুত্ববাদ হারালে সমাজ একরঙা হয়, আর একরঙা সমাজ ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে।
তাই আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি শুধু তাঁদের উৎসবের দিনে তাঁদের পোশাক পরব, তাঁদের গান শুনব, তাঁদের খাবারের প্রশংসা করব? নাকি তাঁদের ভূমি, ভাষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিয়েও একই আন্তরিকতায় কথা বলব?
আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের নিজের অস্তিত্বের বহুত্ব রক্ষার প্রশ্ন। তাঁদের ভাষা বাঁচলে বাংলাদেশের ভাষিক বৈচিত্র্য বাঁচবে। তাঁদের সংস্কৃতি বাঁচলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। তাঁদের ভূমি ও জীবনধারা সুরক্ষিত হলে আমাদের পরিবেশও সুরক্ষিত হবে। আর তাঁদের অধিকার নিশ্চিত হলে আমাদের গণতন্ত্রও আরও মানবিক হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কত বড় সেতু বানানো হলো, কত উঁচু ভবন নির্মিত হলো কিংবা মাথাপিছু আয় কত বাড়লো—শুধু তা দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের আসল পরীক্ষা হলো, সেই দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটি কতটা নিরাপদ, কতটা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছে। যে রাষ্ট্র তার ছোট জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে বড়।
বাংলাদেশের বহুত্ববাদ কোনো অলংকার নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতি। তাঁদের টিকে থাকা মানে শুধু তাঁদের টিকে থাকা নয়—বাংলাদেশের বহুরঙা আত্মপরিচয়ের টিকে থাকা। তাই তাঁদের রক্ষা করা দয়া নয়, দায়িত্ব; তাঁদের অধিকার দেওয়া অনুগ্রহ নয়, ন্যায়; আর তাঁদের সংস্কৃতিকে সম্মান করা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকে মানবিক ও সমৃদ্ধ রাখার অপরিহার্য শর্ত।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?