একাত্তরের পরম বন্ধুদের কথা : ভালোবাসায় বাড়ানো হাত

১৯৭১ সাল। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অথচ রক্তক্ষয়ী এক অধ্যায়। যখন এ দেশের সাধারণ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে মানচিত্র আঁকতে ব্যস্ত, সেই সময়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবীর বহু দেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা। আমাদের তারা একা বোধ করতে দেননি। সীমানা পেরিয়ে ভারতই কেবল নয়, সুদূর আমেরিকা থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিদেশি সেই বন্ধুদের সংহতির ডাক পৌঁছে গিয়েছিল। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মতিউর রহমানের বই ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু’ পড়তে পড়তে সেই পরম বন্ধুদের কথা নতুন করে মনে পড়ে গেল। বইটি কেবল তথ্যের সংকলন নয়, বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য দলিল। লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন, কীভাবে বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক আর কবিরা আমাদের বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা যারা নতুন প্রজন্মের মানুষ, আমাদের অনেকের কাছেই একাত্তরের সেই আন্তর্জাতিক সংহতির ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটা লাইনে সীমাবদ্ধ। মতিউর রহমানের এই বই সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়। বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের সেই অবিস্মরণীয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর

একাত্তরের পরম বন্ধুদের কথা : ভালোবাসায় বাড়ানো হাত

১৯৭১ সাল। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অথচ রক্তক্ষয়ী এক অধ্যায়। যখন এ দেশের সাধারণ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে মানচিত্র আঁকতে ব্যস্ত, সেই সময়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবীর বহু দেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা। আমাদের তারা একা বোধ করতে দেননি। সীমানা পেরিয়ে ভারতই কেবল নয়, সুদূর আমেরিকা থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিদেশি সেই বন্ধুদের সংহতির ডাক পৌঁছে গিয়েছিল। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মতিউর রহমানের বই ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু’ পড়তে পড়তে সেই পরম বন্ধুদের কথা নতুন করে মনে পড়ে গেল।


বইটি কেবল তথ্যের সংকলন নয়, বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য দলিল। লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন, কীভাবে বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক আর কবিরা আমাদের বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা যারা নতুন প্রজন্মের মানুষ, আমাদের অনেকের কাছেই একাত্তরের সেই আন্তর্জাতিক সংহতির ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটা লাইনে সীমাবদ্ধ। মতিউর রহমানের এই বই সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়।


বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের সেই অবিস্মরণীয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর গল্প। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সেই সুর যে কেবল গান ছিল না, ছিল আর্তমানবতার পক্ষে এক আকুল আহ্বান তা লেখক বেশ দরদ দিয়ে বর্ণনা করেছেন। ভাবলে অবাক লাগে, আশি বছর বয়সী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কিংবা মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ শরণার্থীদের দেখতে এসে লিখছেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, যা পাঠ করলে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে শরণার্থী শিবিরগুলোর সেই নিদারুণ দৃশ্য। এই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এই ঋণ কি কখনো শোধ করা সম্ভব?


মতিউর রহমান তার বইয়ে কলকাতার লেখক-শিল্পীদের অবদানের কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন। লতা মঙ্গেশকর থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত সবার যে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল, তা আমাদের নতুন করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।


বিশেষভাবে বলতে গেলে জোয়ান বায়েজের সেই দরদি কণ্ঠের ‘সং অব বাংলাদেশ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কত বড় ত্যাগের ফসল।


বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছি। লেখক খুব সহজ ভাষায় অথচ বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিটি ঘটনা তুলে ধরেছেন। লন্ডনের ওভাল স্টেডিয়ামের ‘গুডবাই সামার’ কনসার্ট কিংবা গ্লেন্ডা জ্যাকসনের কবিতা পাঠ, সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা।


‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইটি প্রত্যেক বাঙালির পড়া উচিত। বিশেষ করে যারা তরুণ, যারা আগামীর বাংলাদেশ গড়বে, তাদের জানা দরকার বিশ্বের বিবেক কীভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই বই আমাদের শেখায়, মানবতা কোনো সীমানা মানে না।


সবশেষে বলব, একাত্তরের সেই বিদেশি বন্ধুদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। মতিউর রহমানের এই বইটি সেই কৃতজ্ঞতা জানানোর এক চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের শেকড়কে জানতে এবং ভালোবাসতে এই বইটির কোনো বিকল্প নেই।

বইয়ের নাম : ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু
লেখক : মতিউর রহমান
প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন
দাম : ৪৫০ টাকা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow