ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দেড় বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমানো নীলফামারীর যুবক আতাউর রহমান (২৭) আর জীবিত ফিরে আসলেন না।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সৌদি আরবের তাবুক শহরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। তবে শোকের চেয়েও বড় কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ। প্রায় ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও তা জোগাড় করতে না পারায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবার।
নিহত আতাউর রহমান ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ছপিয়ার রহমানের ছেলে। আতাউরের পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, এক বোন ও দুই ভাই। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে তাবুক শহরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আতাউর। তিনি সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। একইদিন সন্ধ্যায় সহকর্মীদের মাধ্যমে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছায়।
নিহতের বাবা ছপিয়ার রহমান জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে তাদের বসতভিটা ও জমিজমা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ জমির ওপর একটি ছোট ঘর তুলে কোনোমতে বসবাস করছেন তারা।
তিনি বলেন, সংসারের দুঃখ দূর করতে জমি বন্ধক এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠাই। দেড় বছরে সে কিছু টাকা পাঠিয়ে ঋণের একটি অংশ শোধ করেছিল। কিন্তু এখনো প্রায় ৩ লাখ টাকা বাকি আছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর আগের দিন (৭ এপ্রিল) সকালে বাবার সঙ্গে শেষবার কথা বলেন আতাউর। তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই ভালো থাকবা, কয়েক দিনের মধ্যে কিছু টাকা পাঠামু, যতটা পারো ঋণ শোধ কইরো।’
ছেলের শোকে পাগলপ্রায় মা আতোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সকালেও ফোন দিছিল, কইল-মা, কাজে যাইতাছি। ওইটাই ছিল আমার ছেলের শেষ কথা।
বাবা ছপিয়ার রহমান ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন আমরা একেবারে নিঃস্ব। আমি শুধু একবার ছেলেকে দেখতে চাই। কিন্তু লাশ আনতে নাকি ৪ লাখ টাকা লাগবে-এত টাকা আমি কোথায় পাব?
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে স্থানীয়ভাবেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অসহায় পরিবারটি এখন সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহানুভূতির দিকে তাকিয়ে আছে-যেন অন্তত শেষবারের মতো প্রিয় সন্তানের মুখটি দেখতে পারে।