এ যেন ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’
কাগজে-কলমে শত শত শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা। কোথাও শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থী কম, কোথাও আবার নেই একজন শিক্ষার্থীও। তবু মাস শেষে নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলছেন শিক্ষকরা। জামালপুরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কাগুজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় এবং শিক্ষা কার্যক্রমে চরম অনিয়মের চিত্র। জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের বীর গোবিন্দবাড়ি এলাকার শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পরপরই কয়েকজন শিক্ষক দ্রুত শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে পাঠদান শুরু করেন। তবে সে সময়ও প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। ‘কলেজের নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ দিন শিক্ষকরা সাড়ে ১১টা বা ১২টার আগে আসেন না। দপ্তরি এসে প্রতিদিন তালা খুলে আবার বন্ধ করে চলে যান। বেশিরভাগ সময় কোনো শিক্ষার্থীও আসে না। শিক্ষকদের উপস্থিতিও নিয়মিত নয়। অনেককে শুধু হাজিরা খাতায় সই করে চলে যেতে দেখা যায়’ আরও পড়ুন উপবৃত্তির টাকা যেত শিক্ষকের স্বামীর মোবাইলে, জানতো না শিক্ষার্থী ষ
কাগজে-কলমে শত শত শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা। কোথাও শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থী কম, কোথাও আবার নেই একজন শিক্ষার্থীও। তবু মাস শেষে নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলছেন শিক্ষকরা।
জামালপুরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কাগুজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় এবং শিক্ষা কার্যক্রমে চরম অনিয়মের চিত্র।
জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের বীর গোবিন্দবাড়ি এলাকার শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পরপরই কয়েকজন শিক্ষক দ্রুত শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে পাঠদান শুরু করেন। তবে সে সময়ও প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল।
‘কলেজের নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ দিন শিক্ষকরা সাড়ে ১১টা বা ১২টার আগে আসেন না। দপ্তরি এসে প্রতিদিন তালা খুলে আবার বন্ধ করে চলে যান। বেশিরভাগ সময় কোনো শিক্ষার্থীও আসে না। শিক্ষকদের উপস্থিতিও নিয়মিত নয়। অনেককে শুধু হাজিরা খাতায় সই করে চলে যেতে দেখা যায়’
ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। পাশের আরেকটি কক্ষে একটি বেঞ্চে বসে তিন শিক্ষার্থীকে গণিত ক্লাস করতে দেখা যায়। নবম ও দশম শ্রেণিতেও উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সেখানে একজন মৌলভি শিক্ষক দুই ছাত্রীকে পাঠদান করছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির বাইরে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার ও সীমানা প্রাচীর থাকলেও ভেতরের চিত্র ছিল ভিন্ন। বেশিরভাগ শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামো জরাজীর্ণ। কোথাও জানালা নেই, আবার কোথাও দরজা ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদরাসাটিতে সরকারি বেতনভুক্ত এমপিও শিক্ষক আছেন ১৪ জন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন যতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে, তা শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম। অথচ নথিপত্রে এখানে ২৩৬ জন শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকে ১০-১৪ শিক্ষার্থী।
‘এখন গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজের মৌসুম চলছে। দিনমজুরের মজুরিও ১৩০০-১৪০০ টাকা। অনেক শিক্ষার্থীও পরিবারের সঙ্গে কাজে যুক্ত থাকে। কাজের চাপ কমে গেলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি’—শিক্ষক
এমপিওভুক্ত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলার শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে নেই কোনো আসবাবপত্র বা ব্ল্যাকবোর্ড। পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ। অথচ সরকারি নথিপত্রে এই মাদরাসায় শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত দেখানো হয়েছে। এই ভুয়া শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এমপিওভুক্তির (মাসিক পেমেন্ট অর্ডার) জন্য আবেদন জানিয়েছে।
অনুরূপ হ-য-ব-র-ল চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজেও। সেখানে কাগজে-কলমে সাত শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষক আছেন প্রায় অর্ধশত। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তদারকির অভাবে বছরের বেশিরভাগ সময় ক্লাস না হয়ে কলেজটি বন্ধই থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কলেজের নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ দিন শিক্ষকরা সাড়ে ১১টা বা ১২টার আগে আসেন না। দপ্তরি এসে প্রতিদিন তালা খুলে আবার বন্ধ করে চলে যান। বেশিরভাগ সময় কোনো শিক্ষার্থীও আসে না। শিক্ষকদের উপস্থিতিও নিয়মিত নয়। অনেককে শুধু হাজিরা খাতায় সই করে চলে যেতে দেখা যায়।’
‘কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে’—অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক
কলেজ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মুসলিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই কলেজটিতে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না। সরকার প্রতি মাসে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা তার সুফল পাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে দু-একজন শিক্ষার্থী এলেও ক্লাস না হওয়ায় ফিরে যেতে হয়। কার্যত কলেজটি এখন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন মোবাইলফোনে বলেন, ‘এখন গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজের মৌসুম চলছে। দিনমজুরের মজুরিও ১৩০০-১৪০০ টাকা। অনেক শিক্ষার্থীও পরিবারের সঙ্গে কাজে যুক্ত থাকে। কাজের চাপ কমে গেলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’
অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করে শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো সরকারি ভবন হয়নি। জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরেই পাঠদান করতে হয়। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না। তবে কোনো কোনো দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকে।’
শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসায় গিয়ে কোনো শিক্ষক পাওয়া যাইনি। সাইনবোর্ডে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
এমন পরিস্থিতিকে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষা বিভাগের নিয়মিত পরিদর্শন ও কার্যকর তদারকির অভাবেই এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ছাত্রসংখ্যা কম বা কার্যত শিক্ষার্থীশূন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে সেগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে আনা। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত না হলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, এমনকি এমপিও সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক ও শিক্ষা) আফসানা তাসলিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও নথিপত্রে বেশি উপস্থিতি দেখানোর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করবো। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’
এসআর/জেআইএম
What's Your Reaction?





