এ সপ্তাহের রম্যগল্প: বিশ্বকাপের জ্যোতিষী

সামছুল আলম শিমুল বিশ্বকাপ এলেই জ্যোতিষীদের কদর হু হু করে বেড়ে যায়। এই সুযোগে জ্যোতিষীরাও কম যান না। গণনার ফি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেন। তবে পলাশপুরের জ্যোতিষী শিবু মণ্ডল এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। সে তার ফি বাড়িয়েছে একশগুণ। একদিন গ্রামের ব্রাজিল সমর্থকরা তার কাছে হাজির। জানতে চায়—এবার ব্রাজিলের দৌড় কতদূর? কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, নাকি একেবারে কাপ? শিবু মণ্ডল গম্ভীর মুখে দুই হাজার টাকা দাবি করল। এত টাকা শুনে তো সমর্থকদের চোখ কপালে। কয়েকজন বিড়বিড় করে পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিলো—যে মানুষটা গত হাটবারে বিশ টাকা ফি নিয়েও মক্কেল জোটাতে পারেনি, সে আজ দুই হাজার টাকা চাইছে! কিন্তু শিবু তার সিদ্ধান্তে অটল। চাঁদা তুলে শেষ পর্যন্ত এক হাজার টাকা জোগাড় হলো। শিবু একটু ভেবে জানাল, এই টাকায় পুরো ভবিষ্যৎ বলা যাবে না। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গণনা করা সম্ভব। টাকা যখন নেই, তখন কোয়ার্টার পর্যন্তই সই। শিবু দীর্ঘ সময় ধরে গণনা করলো। কখনো কড়ি চালালো, কখনো পাথর ঘঁষলো, কখনো খাতায় অদ্ভুত সব ঘর আঁকলো। তারপর চোখ বুজে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে ঘোষণা দিলো—ব্রাজিল সহজেই এবার কোয়ার্টার ফাইনাল

এ সপ্তাহের রম্যগল্প: বিশ্বকাপের জ্যোতিষী

সামছুল আলম শিমুল

বিশ্বকাপ এলেই জ্যোতিষীদের কদর হু হু করে বেড়ে যায়। এই সুযোগে জ্যোতিষীরাও কম যান না। গণনার ফি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেন। তবে পলাশপুরের জ্যোতিষী শিবু মণ্ডল এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। সে তার ফি বাড়িয়েছে একশগুণ।

একদিন গ্রামের ব্রাজিল সমর্থকরা তার কাছে হাজির। জানতে চায়—এবার ব্রাজিলের দৌড় কতদূর? কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, নাকি একেবারে কাপ? শিবু মণ্ডল গম্ভীর মুখে দুই হাজার টাকা দাবি করল। এত টাকা শুনে তো সমর্থকদের চোখ কপালে। কয়েকজন বিড়বিড় করে পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিলো—যে মানুষটা গত হাটবারে বিশ টাকা ফি নিয়েও মক্কেল জোটাতে পারেনি, সে আজ দুই হাজার টাকা চাইছে! কিন্তু শিবু তার সিদ্ধান্তে অটল।

চাঁদা তুলে শেষ পর্যন্ত এক হাজার টাকা জোগাড় হলো। শিবু একটু ভেবে জানাল, এই টাকায় পুরো ভবিষ্যৎ বলা যাবে না। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গণনা করা সম্ভব। টাকা যখন নেই, তখন কোয়ার্টার পর্যন্তই সই। শিবু দীর্ঘ সময় ধরে গণনা করলো। কখনো কড়ি চালালো, কখনো পাথর ঘঁষলো, কখনো খাতায় অদ্ভুত সব ঘর আঁকলো। তারপর চোখ বুজে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে ঘোষণা দিলো—ব্রাজিল সহজেই এবার কোয়ার্টার ফাইনাল পার হবে।

ব্রাজিল সমর্থকদের আনন্দ আর ধরে না। যেন অর্ধেক কাপ জিতে ফেলেছে, এমন উল্লাস শুরু করে দিলো। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামালো না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এবার কাপ আর্জেন্টিনারই। জ্যোতিষীর সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তাদের মতে, এই ভবিষ্যদ্বাণী গ্রামের সবচেয়ে অবুঝ ছেলেটাও করে দিতে পারবে।

বিশ্বকাপ যত এগোতে লাগলো, ততই অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে লাগলো। শিবুর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলতে শুরু করলো। ব্রাজিল সত্যিই কোয়ার্টার ফাইনাল পার হয়ে সেমিফাইনালে উঠলো। শুধু উঠলোই না, দারুণ খেলেও সবাইকে মুগ্ধ করলো। প্রতিটা ম্যাচই হালি হালি গোল দিয়ে নব্বই মিনিটেই খেলা শেষ করে দিলো। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাও সেমিফাইনালে পৌঁছালো বটে, তবে তাদের অবস্থা ছিল বেশ নড়বড়ে।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো যখন সেমিফাইনালে মুখোমুখি দাঁড়ালো ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগের দিন এবার শুধু ব্রাজিল না, আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও টাকা হাতে শিবু মণ্ডলের বাড়িতে হাজির। শিবু এবার সত্যিকারের বিপদে পড়ে গেল। এক পক্ষকে সুসংবাদ দিলে অন্য পক্ষ ক্ষেপে যাবে। আবার কাউকে কিছু না বললেও টাকা হাতছাড়া হবে। এ অবস্থায় মন্ত্রের জোরের চেয়ে বুদ্ধির জোরই বেশি দরকার।

অনেক চিন্তাভাবনার পর দুই পক্ষের কাছ থেকেই ভালো অঙ্কের টাকা আদায় করে নিলো। তারপর যথারীতি কড়ি চালালো, পাথর ঘঁষলো, খাতায় দাগ কাটলো এবং মুখে এমন ভাব আনলো যেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে গোপন রহস্য সে এখনই আবিষ্কার করতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সে জানাল—ব্রাজিল জিতবে। কথাটা শোনামাত্র আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মুখ কালো হয়ে গেল। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে শিবু দ্রুত যোগ করলো—আর্জেন্টিনাও জিতবে।

এবার সবাই থমকে গেল। এক ম্যাচে দুই দল একসঙ্গে জেতে কীভাবে? শিবু তখন ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করলো। তার গণনা অনুযায়ী নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষে স্কোর সমান থাকবে। অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিট খেলেও কোনো দল হারবে না। অর্থাৎ একশ বিশ মিনিট পর্যন্ত দুই দলই অপরাজিত থাকবে। সুতরাং সেই সময় পর্যন্ত দুই দলকেই বিজয়ী বলা যায়।

ব্যাখ্যাটা এতটাই জটিল ছিল যে, অনেকে কিছুই বুঝলো না। কিন্তু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এরপর সবাই টাইব্রেকারের ফল জানতে চাইলো। শিবু কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলো। তারপর এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যেন মহাজাগতিক কোনো কঠিন হিসাবের মুখোমুখি হয়েছে। অবশেষে জানালো, টাইব্রেকারের ভবিষ্যদ্বাণী এত সহজ নয়। সেখানে রাহু, কেতু, শনি, মঙ্গল—সবাইকে একসঙ্গে গণনায় আনতে হয়। পুরো হিসাব শেষ করতে অন্তত সাত দিন সময় লাগবে।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর তাদের একজন হঠাৎ বলে উঠলো—সেমিফাইনাল ম্যাচ তো আগামীকাল! কথাটা মুখে আসতেই চারদিকে নীরবতা নেমে এলো। আর সেই সুযোগে শিবু মণ্ডল আকাশের দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করলো, যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জটিল রহস্য বুঝে ওঠার দায়িত্ব একমাত্র তার কাঁধেই এসে পড়েছে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow