ঐক্যবদ্ধ থাকার সুফল
মানবজাতিকে সামনে এগিয়ে চলতে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধতা মানুষকে শক্তিশালী করে এবং অনৈক্য মানুষকে পিছিয়ে দেয় ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নবীজির আগমনের সময় জাহেলি আরবে আরবের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তারা বিভিন্ন গোত্র-দলে বিভক্ত ছিল। সামান্য থেকে সামান্য কারণেও তাদের মাঝে যুদ্ধ লেগে থাকত বছরের পর বছর। এক কথায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জ্বলন্ত ভূমি ছিল আরব জাহান। এমন একটি মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন মানবতার সূতিকাগাররূপে আল্লাহ তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তার মাধ্যমে সমগ্র আরব জাতিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তাদের মধ্যকার দলাদলি ও সাম্প্রদায়িকতাকে চিরতরে মুছে দিয়েছেন। একটি হাদিস থেকে এ বিষয়টি আমাদের জন্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের সময় রাসুল (সা.) মুসলিমদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য জাহেলি যুগের সাম্প্রদায়িকতা ও বাপ-দাদাদের নামে বড়াই করার বিষয়টি চিরতরে মুছে দিয়েছেন। মানুষের দল মাত্র দুটি—১. সৎ ও খোদাভীরু; যে আল্লাহর কাছে সম্মানিত এবং ২. পাপাচারী দুর্ভাগা, যে আল্লাহর কাছে অপদস্থ। আমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। (আল জামিউ
মানবজাতিকে সামনে এগিয়ে চলতে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধতা মানুষকে শক্তিশালী করে এবং অনৈক্য মানুষকে পিছিয়ে দেয় ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নবীজির আগমনের সময় জাহেলি আরবে আরবের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তারা বিভিন্ন গোত্র-দলে বিভক্ত ছিল। সামান্য থেকে সামান্য কারণেও তাদের মাঝে যুদ্ধ লেগে থাকত বছরের পর বছর। এক কথায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জ্বলন্ত ভূমি ছিল আরব জাহান। এমন একটি মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন মানবতার সূতিকাগাররূপে আল্লাহ তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তার মাধ্যমে সমগ্র আরব জাতিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তাদের মধ্যকার দলাদলি ও সাম্প্রদায়িকতাকে চিরতরে মুছে দিয়েছেন। একটি হাদিস থেকে এ বিষয়টি আমাদের জন্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের সময় রাসুল (সা.) মুসলিমদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য জাহেলি যুগের সাম্প্রদায়িকতা ও বাপ-দাদাদের নামে বড়াই করার বিষয়টি চিরতরে মুছে দিয়েছেন। মানুষের দল মাত্র দুটি—১. সৎ ও খোদাভীরু; যে আল্লাহর কাছে সম্মানিত এবং ২. পাপাচারী দুর্ভাগা, যে আল্লাহর কাছে অপদস্থ। আমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। (আল জামিউস সগির: ৯৬১৩)
হাদিসে মানবজাতিকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একদল যারা শরিয়তের বিধানাবলি মেনে চলে, আল্লাহকে ভয় করে, তাই তারা আল্লাহর কাছে প্রিয়। আরেক দল যারা আল্লাহকে মানে না, আল্লাহর বিধানাবলি মানে না, তারা আল্লাহর কাছে অপদস্থ। আল্লাহর কাছে এ দুটি দল ছাড়া আর কোনো দল নেই। এ ছাড়া সব মুসলিম এক জাতি, এক দল, এক দেহ ও এক প্রাণ। যেমন—এক হাদিসে এসেছে, পরস্পর সহযোগিতা আন্তরিকতা এমনকি অনুভূতিতেও মুমিনরা সবাই এক দেহের ন্যায়। শরীরে একটি অঙ্গে আঘাত পেলে যেমন তা পুরো শরীরে অনুভূত হয়, তেমনি মুমিনদের কোনো একজন আহত হলে তাতে সমগ্র মুসলিম জাতি ব্যথিত হয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ২৯৭)। আমাদের ভেবে দেখা উচিত, নবীজি (সা.) আমাদের ব্যাপারে যেমন বলেছেন, আমরা সমগ্র মুসলিম জাতি এক দেহের মতো হয়ে থাকব, একজনের ব্যথায় সবাই দুঃখিত হব, প্রিয় নবী (সা.)-এর সেই হাদিস অনুযায়ী কি এখন আমরা আমল করি!
আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এখন আমরা অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হওয়ার পরিবর্তে অন্যকে ব্যথা দিতেই বেশি পছন্দ করি। আর এর মূল কারণ হচ্ছে, মুসলমানরা ঐক্য হারিয়েছে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করে ফেলেছে। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আমরা একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে ফেলেছি। তাই মুসলিম হয়েও আমরা একে অপরের শত্রু, মুমিন হয়েও আমরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। পৃথিবীব্যাপী বর্তমানে মুসলিমরা নিপীড়িত অত্যাচারিত মজলুম। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, মুসলমানরা ইমানি চেতনা ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছে। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে, শিকড়মুখী চেতনা ভুলে একে অপরকে দোষারোপ করছে এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আর এটিই (ইসলাম) আমার একমাত্র সরল পথ, সুতরাং তোমরা তা অনুসরণ করো। আর তোমরা বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে। আর আল্লাহ তোমাদের এ আদেশ করছেন যাতে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।’ (সুরা আনআম: ১৫৩)
কোনো জাতি বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে জঘন্য যে জিনিসটি কাজ করে, তা হচ্ছে দুনিয়ার লোভ। দুনিয়ার মোহে একবার কেউ জড়িয়ে গেলে তখন সে যাচ্ছেতাই করতে পারে। এভাবে বিভিন্ন দলাদলির মুখে পড়ে একটা জাতি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। আর তাদের এ দুর্বলতার সুযোগ নেয় শত্রুরা। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এ বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আশঙ্কা করা হয় যে, অমুসলিম বিভিন্ন সম্প্রদায় তোমাদের ওপর হামলে পড়বে যেমন ক্ষুধার্ত খাদকরা খাবারের প্লেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জিজ্ঞাসা করা হয় যে, হে রাসুলাল্লাহ! এটা কি আমাদের সংখ্যা স্বল্পতার কারণে হবে? রাসুল (সা.) বললেন, না, বরং তোমাদের আধিক্য তখন হবে পানির স্রোতের মতো। তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ব্যাপারে ভয় উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং তোমাদের হৃদয়ে ঢেলে দেওয়া হবে ‘ওয়াহান’। সাওবান (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, ওয়াহান কী! রাসুল (সা.) বললেন, ‘ওয়াহান হলো দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা আর মৃত্যুর ব্যাপারে অনাগ্রহ।’ (আবু দাউদ: ৪২৯৭)। বর্তমানে সবাই কেন একজোট হয়ে শুধু ইসলামেরই ক্ষতি করতে চায়, তার কারণটি উল্লিখিত হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আর তা হলো মুসলিমদের হৃদয়ে দুনিয়ার লোভ বাসা বাঁধা এবং তাদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়া।
ইমান ও ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্য গড়া বলতে বোঝানো হয়, সমগ্র মুসলিম জাতি একসঙ্গে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তার হুকুম পালন করবে এবং এর ভিত্তিতেই ঐক্য গড়বে। ইসলাম যেটাকে সঠিক বলবে তার পক্ষে সবাই একসঙ্গে সংগ্রাম করবে এবং ইসলাম যেটাকে অপছন্দ করবে সেটাকে একসঙ্গে বর্জন করবে। এ বিষয়টিই পবিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে, ‘আর তোমরা হচ্ছো সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের প্রেরণ করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১১০)
লেখক: ইমাম ও খতিব
What's Your Reaction?