কবির গদ্য : প্রসঙ্গ শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমানের কবি সত্তার পরাক্রমে অন্যান্য সত্তা চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু সচেতন পাঠক জানেন, তিনি সাংবাদিক ও সম্পাদক ছিলেন, লিখেছেন স্মৃতিমূলক গদ্য-কলাম ও প্রবন্ধ। শামসুর রাহমানের সাংবাদিক ও সম্পাদক জীবন নিয়ে নিশ্চয় লেখা হবে। তবে এখানে আলো ফেলা হবে এই কবির গদ্য রচনার ওপর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে তাঁর স্মৃতিধর্মী লেখা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং কলাম-জাতীয় রচনা সম্পর্কে। কারণ তাঁর গদ্য রচনার পরিমাণ একেবারে কম নয়। চারটি উপন্যাস লিখেছেন এবং ছয়টি গল্প নিয়ে তাঁর একটি গল্পসংগ্রহও প্রকাশিত হয়েছে। যতটুকু কথাসাহিত্য রচনা করেছেন সেগুলোর আলাদা আলোচনা হওয়া দরকার, সে আলোচনাও হয়ত লিখবেন কোনো যোগ্য আলোচক। তবে এখানে মূলত তাঁর গদ্যধর্মী রচনা নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব, কেননা এ ধরনের রচনার পরিমাণ কবিতার মতো অত বেশি না হলেও দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে লিখেছেন বেশকিছু পরিমাণে এবং সেগুলোর মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে দুটি: “স্মৃতির শহর”(১৯৭৯) ও “কালের ধুলোয় লেখা” (২০০৪) ।  প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম নিয়ে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে মোট পাঁচটি: “আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ” (১৯৮৬), “শামসুর রাহম

কবির গদ্য : প্রসঙ্গ শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমানের কবি সত্তার পরাক্রমে অন্যান্য সত্তা চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু সচেতন পাঠক জানেন, তিনি সাংবাদিক ও সম্পাদক ছিলেন, লিখেছেন স্মৃতিমূলক গদ্য-কলাম ও প্রবন্ধ। শামসুর রাহমানের সাংবাদিক ও সম্পাদক জীবন নিয়ে নিশ্চয় লেখা হবে। তবে এখানে আলো ফেলা হবে এই কবির গদ্য রচনার ওপর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে তাঁর স্মৃতিধর্মী লেখা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং কলাম-জাতীয় রচনা সম্পর্কে। কারণ তাঁর গদ্য রচনার পরিমাণ একেবারে কম নয়। চারটি উপন্যাস লিখেছেন এবং ছয়টি গল্প নিয়ে তাঁর একটি গল্পসংগ্রহও প্রকাশিত হয়েছে। যতটুকু কথাসাহিত্য রচনা করেছেন সেগুলোর আলাদা আলোচনা হওয়া দরকার, সে আলোচনাও হয়ত লিখবেন কোনো যোগ্য আলোচক। তবে এখানে মূলত তাঁর গদ্যধর্মী রচনা নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব, কেননা এ ধরনের রচনার পরিমাণ কবিতার মতো অত বেশি না হলেও দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে লিখেছেন বেশকিছু পরিমাণে এবং সেগুলোর মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে দুটি: “স্মৃতির শহর”(১৯৭৯) ও “কালের ধুলোয় লেখা” (২০০৪) ।  প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম নিয়ে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে মোট পাঁচটি: “আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ” (১৯৮৬), “শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ ” (২০০১), “একান্ত ভাবনা”(২০০১), “কবিতা এক ধরনের আশ্রয়” (২০০২) ও “কবে শেষ হবে কৃষ্ণপক্ষ” (২০০৬)। এই গদ্য লেখাগুলো যেন শামসুর রাহমানের আরশি – যাতে ফুটে উঠেছে কবির ব্যক্তিত্ব। যে ব্যক্তিত্ব নানা কারণে আমাদের সমাজের সৃষ্টিশীলতার ধ্রুবক। তাঁর এই লেখাগুলো প্রগতিশীল ও অগ্রসর মানুষের জন্য ম্যানিফেস্টোর মতো। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সমাজের সাথে তিনি যেভাবে যুঝেছেন, তা যে কোনো সৃষ্টিশীল বা সাধারণ  মানুষের জন্য প্রেরণাদায়ক হতে পারে।  শামসুর রাহমান ছিলেন উদার, লালন করেছেন অসাম্প্রদায়িকতা–  নিজের লেখায় অসংকোচে বলেছেন, এই উদারতা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে।  অসাম্প্রদায়িক হবার শিক্ষা পেয়েছি আব্বার কাছে। তিনি কখনও হিন্দু-মুসলমান সমস্যাকে আমাদের সামনে বড় করে তুলে ধরেননি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সবাই যে একই মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত এটা তিনি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন। মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে পারাটাই ছিল তাঁর কাছে প্রধান বিবেচ্য। এই বিবেচনা তাঁর মনে গ্রন্থপাঠের ফলে গড়ে ওঠেনি, কেননা, তিনি বেশি পড়াশোনা করেননি। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। [২০০০; পৃ. ২৯] শামসুর রাহমান ছিলেন গ্রন্থপ্রেমিক, বই কিনেছেন, সংগ্রহ করেছেন, পড়েছেন। তাঁর গদ্য পড়ে বোঝা যায়, মনন তৈরি হয়েছে গ্রন্থ, বিশ্ববিদ্যালয় আর নির্বাচিত বন্ধুদের সংস্পর্শে। ভেতরের প্রগতিশীল অবস্থান ও চিন্তার বিকাশে এগুলোর ভূমিকা অস্বীকার্য। পূর্ব বাংলার সমাজ কাঠামোয় শিক্ষা ও চর্চার প্রতি যে প্রতিবেশগত বিমুখতা, তাঁর পুরো জীবনটাই এই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই আলোচনায় তদন্ত করে দেখার চেষ্টা করা হবে এই কবির সমাজকে দেখার দৃষ্টিকোণ, চিন্তা-কাঠামোর অগ্রসরমানতা/সীমাবদ্ধতা এবং ভেতরের বিভিন্ন বাঁক। বাংলাদেশের সমাজ প্রগতির কিছু ইতিবাচক দিক শনাক্তে শামসুর রাহমানের প্রবন্ধধর্মী রচনা বেশখানিক সাহায্য করে, এদিক থেকে তাঁর এ-সমস্ত রচনার গুরুত্ব ঐতিহাসিক।      ২. ঢাকা শহর নিয়ে যত স্মৃতিকথা লেখা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে সেরা দুটি গ্রন্থ হচ্ছে পরিতোষ সেনের “জিন্দাবাহার” (১৩৮৬) ও শামসুর রাহমানের “স্মৃতির শহর”। কবি যখন “স্মৃতির শহর” লিখলেন তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর। অর্থাৎ পরিণত মধ্যবয়সে এই বইটা লেখেন তিনি। কিভাবে বইটি লেখা হলো সেই ইতিহাস উল্লেখ করেছেন “কালের ধুলোয় লেখা” স্মৃতিকথায়, একবার সম্পাদক এখলাসউদ্দিন আহমদের মাথায় কী বেয়াড়া খেয়াল চাপল যে, আমার লেখনি থেকে নিঃসৃত একটি সুদীর্ঘ ধারাবাহিক রচনা তার না হলেই চলবে না। আমি পড়লাম মহামুশকিলে। কী ধারাবাহিক গদ্য রচনা কোমলমতি শিশু-কিশোরদের উপহার দেব ? দিনের তো বটেই, রাতের ঘুমও হারাম। এক মধ্যরাতে মনে এল, আমার প্রিয় জন্মশহর ঢাকা নিয়েই তো লেখা যেতে পারে। কিশোর শামসুর রাহমানের চোখে দেখা পুরনো শহরটিকেই প্রধান চরিত্র করে কিছু তো লেখা যেতেই পারে। শেষরাতে সম্ভাব্য দীর্ঘ রচনার নাম রাখলাম ‘স্মৃতির শহর।’ সেই রাতেই দু’তিন পাতা লেখা হয়ে গেল এক টানে। [২০০০: পৃ. ১৭১]  প্রবন্ধ-কলাম ও স্মৃতিকথার মধ্যে এই বইটি অনন্য। “স্মৃতির শহর”-এর পাশাপাশি যদি পাঠ করা যায় বুদ্ধদেব বসুর “আমার ছেলেবেলা”, আল মাহমুদের “যেভাবে বেড়ে উঠি” ও হুমায়ূন আহমেদের “আমার ছেলেবেলা” – তাহলে দেখা যাবে ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে রাহমান ছাড়িয়ে গেছেন এই তিন মহারথীকে। এমন অতুলনীয় গদ্য-সম্ভার যে বই উপহার দিয়েছে সে বইয়ের খবর এদেশের পাঠ-বিমুখ মানুষ জানে না বললেই চলে। এই বইটি দ্রুতপঠন ও ভাষা-শিক্ষার উপকরণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৃষ্টিশীল গদ্যের নমুনা ছড়িয়ে আছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়। পরিবেশ উপযোগী শব্দ প্রয়োগ ও বাক্য ব্যবহারে বইটির ভাষা এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে লেখকের ভাষাভঙ্গির কিছু নজির হাজির করলে বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হবে, (১) ততক্ষণে সন্ধ্যা এসে পড়েছে মাথায় অন্ধকারে টোপর প’রে। (২) অন্ধকার আম্মার মতো আদর করলেন আমাকে, আমার সারা শরীরে হাত বুলিয়ে যেন ঘুম পাড়ালেন, আকাশে কিছু তারা, রুপালি চকোলেটের মতো ঝিকমিক ঝিকমিক করছে, রাংতা মোড়া। (৩) গলির শেষ সীমায় বাতিটায় আলোর ফুল ধরবে, নরম তুলতুলে আলোর ফুল। বাতিঅলা মই বেয়ে উঠবে, ফতুয়ার পকেট থেকে কি-একটা বের করবে, তারপর গলিতে আলোর কলি, যেন কোন জাদুকর সন্ধের বোঁটায় ঝুলিয়ে দিয়েছে আলোর ফুল, আঙ্গুল বুলিয়ে বুলিয়ে।  (৪) বাতাসের ঝাঁকুনিতে পাতায় কাঁপুনি, ডালের ফাঁকে সোনার জলের মতো আলো গড়িয়ে পড়ে । (৫) হুড়মুড় করে ছুটে গেল ওরা। কয়েকটি ছোট ছেলে। যেন উড়ে গেল কয়েকটি রঙিন বেলুন। (৬) সমস্ত গলিটা রূপকথার ভ্রমর হয়ে উঠত করাতের গুঞ্জনে। (৭) আলোর অলঙ্কার প’রে রাতে হোসনি দালানের রূপ খুলে। (৮) বিড়ালের মতো পা ফেলে আসত সন্ধেগুলো। ফুলো ফুলো তুলোর মতো নরম পা, তাই শব্দ হ’তো না একটুকুও। (৯) তাঁর কথায় আদর ঝরছে যেন মধুর ফোঁটা হয়ে। (১০) ভুরুর মতো একটা নৌকো, রেখার মতো নদীর পাড়, ফুটকির মতো পাড়াগাঁ আর গোল তামার পয়সার মতো সূর্য। (১১) একরাশ গোলাপি রঙের মতো লজ্জা ছড়িয়ে পড়ল আমার চোখেমুখে। (১২) খুশিতে আমি আতশবাজি হয়ে গেলাম। (১৩) চিন্তাহরণবাবুর কথা যেন গ্রীষ্মকালের ঝাঁঝাঁ দুপুরে ঠান্ডা শরবত। মন-জুড়ানো প্রাণ-জুড়ানো। (১৪) আমি শুধু চোখ দিয়ে চাখলাম।  "স্মৃতির শহর" প্রায় পঁচিশ বছর পর আবার পড়লাম। প্রথম যখন এটি পড়ি তখন ছিলাম সদ্য মফস্বল থেকে আগত উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র। স্বতন্ত্র ও সৃষ্টিশীল গদ্যশৈলীতে ভরপুর লেখাটার ভেতরে তখন খুব একটা ঢুকতে পারি নি। শামসুর রাহমানের মতো একজন দুকূলপ্লাবী প্রতিভার লেখা পড়ে পুরো বোঝা এবং বিচারের যোগ্যতা সেই বয়সে হওয়ার কথা নয়। বইটির কাহিনি প্রায় পুরোটাই ভুলে গিয়েছিলাম, এটা দ্বিতীয়বার পড়ার সময়ই বোঝা গেল, কোনো কোনো বই পড়ার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। বইয়ে বর্ণিত অনুষঙ্গ সম্পর্কে তখন কিছু জানতাম না। প্রায় সবকিছুই ভুলে গেছি সহজেই। দ্বিতীয়বার পড়ার সময়, যখন পাঠক হিসেবে পরিণত, তখন বইটি আমার কাছে ধরা দিলো অনুগত ভক্তের মতো। এখন মনে হচ্ছে, বইটি যেন এক অনন্য ভাষার কারুকাজ। এ-বইয়ের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন তিনি সচেতন শিল্পীর একাগ্রতায় নির্মাণ করেছেন। যে-বাক্যে যে-প্রতিবেশ ফুটিয়ে তোলার জন্য যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা দরকার তিনি তা-ই করেছেন, করেছেন যেন অধিক বিশুদ্ধতার সাথে। আবার এই প্রয়োগ বহু ব্যবহারে পুরনো হয়ে পড়ে নি। বইটিতে কবিতার মতো তুলনার ব্যবহার করা হয়েছে অসংখ্য, যে-তুলনাগুলো সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনায় উজ্জ্বল। বাংলা গদ্যে শামসুর রাহমানের অনন্য দখলের প্রমাণ বইটি। ক্লাসে দ্রুতপঠনের জন্য অনেক সময় বই খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু এই বইটি দ্রুতপঠন হিসাবে শিক্ষার্থীদের জন্য এক সেরা নির্বাচন হতে পারে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে মনে হয়েছে, বইটি পাঠ্য করা হলে অনেকভাবে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে: (ক) তাদের কল্পনাশক্তি বাড়বে, (খ) শিক্ষার্থীরা প্রচুর নতুন শব্দ এবং এর ব্যবহার শিখবে ও (গ) বাক্যের গঠনশৈলীর উপর দখল তৈরি হবে ও (ঘ) ঢাকা শহরের বিবর্তনের ইতিহাস তাদের কাছে পরিষ্কার হবে। শামসুর রাহমানের দ্বিতীয় আত্মজীবনী হলো “কালের ধুলোয় লেখা”। “স্মৃতির শহর” ছুঁয়ে গেছে তার শৈশব-কৈশোরের ঘটনাপঞ্জি, অপরদিকে “কালের ধুলোয় লেখা”-র ব্যাপ্তি পুরো জীবন। শুরুতেই তিনি তাঁর জন্মের কথা বলে দিয়েছেন, এ্রখানে প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের বংশের অর্থনৈতিক অবস্থাও, প্রথম মহাযুদ্ধের বারুদের গন্ধ হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার এগারো বছর পর ১৯২৯ সালে আমি সর্বপ্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম পুরনো ঢাকার মাহুৎটুলির এক সরু গলির ভিতর, আমার নানার কোঠাবাড়িতে। কোঠাবাড়ি বলে দিচ্ছে, রুপোর চামচ মুখে নিয়ে আমি জন্মগ্রহণ করি নি । [২০০০: পৃ. ১৭] এখানে তাঁর স্মৃতিকথার শৈশব-কৈশোর অংশে “স্মৃতির শহর”-এর সামান্য পুনরাবৃত্তি থাকলেও মূলত এটিতে বর্ণিত হয়েছে তাঁর কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের বিবরণ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা, পারিবারিক জীবন, প্রেম, মুক্তিযুদ্ধ,  চাকরি জীবন, বিদেশ ভ্রমণ, বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ ও পুরস্কার – ইত্যাদি বিষয়। তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন সেখানে কেউ কখনও লেখক ছিল না, তবে উঁনার বাবার একজন বন্ধু ছিলেন  লেখক, তাঁর নাম আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্ন। এই প্রথম তিনি একজন লেখককে দেখেন। আত্মজীবনীতে তিনি এক অবাক করা ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, তাকে দেখতে নাকি লেখকের মতো মনে হত। অথচ তখনও তিনি লেখালেখি শুরু করেন নি। একথা তাঁকে পরিচয়ের শুরুতে বলেছেন তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান জিল্লুর রহমান। [২০০০: পৃ. ৪৭] সাক্ষাৎ হলেই তাঁকে লিখতে বলতেন জিল্লুর রহমান। হামিদুর রহমানেরও ধারণা হয়েছিল তিনি লেখালেখি করেন। অথচ তখনও কিন্তু শামসুর রাহমান লেখালেখি শুরু করেন নি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, শামসুর রাহমানের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই এমন কিছু ছিল যেটার কারণে তাঁকে একজন লেখক বলে মনে হত।  এই স্মৃতিকথা থেকে তাঁর লেখালেখির সূচনা ও  স্বীকৃতির কথা জানতে পারি। তিনি প্রথম কবিতা লিখেছিলেন তাঁর এক বোন মারা যাওয়ার পর। তখন তিনি সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। সে রচনায় উথলে উঠেছিল তাঁর মুহূর্তের শোক ও বেদনা, তাই সেটাকে ঠিক শুরু বলা যায় না। পরে কলেজের পড়া শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা রাখবেন তখনই সৃষ্টির রহস্যময় সুখদ বেদনা তিনি হৃদয়ে অনুভব করা শুরু করেন, ইতোমধ্যে আমার মধ্যে একটা কিছু সৃষ্টি করার আগ্রহ হয়তো আমার  অজান্তেই উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছিল। আর হঠাৎ এক মেঘলা দুপুরে মনোভার নামানোর ব্যাকুলতায় একটি কবিতা লিখে ফেলি।[২০০০:পৃ. ৫৭] তাঁর এই কবিতা পড়ে শিল্পী বন্ধু হামিদুর রহমান খুব খুশি, তাঁকে উৎসাহ দেন। হামিদের উৎসাহে তিনি কবিতাটি সে-সময়কার “সোনার বাংলা” নামক পত্রিকায় ছাপানোর জন্য দিয়ে আসেন। “সোনার বাংলা”-য় তখন লিখতেন জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো বিখ্যাত সব মানুষ। এই লেখাটিই সেই পত্রিকায় ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি ছাপা হয়। এভাবেই শুরু হলো শামসুর রাহমানের কবি জীবন, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীলতার পথ থেকে বিচ্যুত হয় নি। জীবনে লেখাকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যে গুণ পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে প্রায় দুর্লভ। মোদ্দাকথা, লেখার জন্য তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। লেখার ধরন সম্পর্কে জানিয়েছেন ,             কখনও ঘরের এক কোণে টেবিলে ঝুঁকে, কখনও-বা  বিছানায় শুয়ে বালিশে  বুক পেতে লিখতাম অনেক আগে। এখন টেবিলে ঝুঁকেই লিখি। বিছানায় গা এলিয়ে লেখার বিলাসিতাটুকু বর্জন করেছি ঘুমের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। [ ২০০০ :পৃ. ১২৫] যখন দৈনিক পাকিস্তানে চাকরি করতেন তখন প্রতি সপ্তাহে কয়েকটি লেখা লিখতে হত – সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় মিলিয়ে। ‘মৈনাক’ ছদ্মনামে ব্যক্তিগত প্রবন্ধের ধাঁচে কলাম লিখেছেন। [২০০০: পৃ. ১৬৪] তবে কবিতাই ছিল তাঁর জীবনের সব। যৌবনের শুরু থেকেই কবিতাকেই তিনি উচ্চে স্থান দিয়েছেন। কবিতা লেখার জন্য সহ্য করেছেন মানুষের উপহাস ও গঞ্জনা। [২০০০ : পৃ. ২২২] এদেশে এই যদি হয় একজন প্রধান কবির অবস্থা তাহলে বাকি কবিদের অবস্থা কি তা সহজেই অনুমেয়। শেষ বয়সেও তিনি আক্রমণকারীদের থেকে রেহাই পান নি, “আজও বহু কটু কথা বর্ষিত হয় আমার কাব্যধারায়। ব্যাঙ্গোক্তিরও মুখোমুখি হতে হয় কখনও-সখনও।” [২০০০ : পৃ. ২২২] তবে নিন্দাকারীদের উড়িয়ে দিয়েছেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে। “যদি কেউ আমার কবিতা পছন্দ না-ও করেন, তবুও আমি আমৃত্যু লিখে যাব আমার অন্তরাত্মার তাগিদে, সম্মানে।” [২০০০: পৃ. ২২২] এই আত্মবিশ্বাসের কাছে পরাজিত হয়েছে কবির সকল নিন্দাকারী। কবিতার মতো শিল্পকে গ্রহণ করার মতো রুচি-শিক্ষা ও মানসিকতার ঘাটতি যে সমাজের মধ্যে বিদ্যমান, এ উপলব্ধি সৌভাগ্যবশত তাঁর হয়েছিল। তাই তিনি সাহস-ভরে এই অবজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে যেতে পেরেছিলেন।  কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা কিভাবে লিখতে পেরেছিলেন সে বর্ণনা দিয়েছেন কিছু জায়গায়। ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য রোমান হরফ এবং একটি সাধারণ ভাষা সৃষ্টির জন্য প্রস্তাব করেন। কিন্তু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বেশ কিছু বাঙালি সাহিত্যিক, শিল্পী এবং সাংবাদিক আইয়ুবের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেন নি। ১৯৬৮ সালের আগস্টে ৪১ জন সাহিত্যিক, শিল্পী এবং সাংবাদিক বিবৃতির মাধ্যমে সরকার ও দেশবাসীকে জানিয়ে দিলেন যে, তাঁরা এটি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বাংলা হরফের রদবদলে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করবে। তখন শামসুর রাহমান বাংলা হরফের রদবদলের বিরুদ্ধে কয়েকটি ছড়া এবং একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটির নাম “বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা”। ১৯৭০ সালে এক ঘূর্ণিঝড় হয়। মওলানা ভাসানী উপদ্রুত এলাকা সফর করে লাখ লাখ মানুষের লাশ ও দুর্দশা দেখে ঢাকায় ফিরে এসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় অসামান্য বক্তৃতা দেন । তিনি পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের লক্ষ্য করে হাত তুলে উচ্চারণ করেছিলেন, “ওরা আসে নি” – একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল পাকিস্তানী শাসকদের ধিকৃত করার জন্যে। গণনায়ক মওলানা ভাসানীর হাত তোলা দেখে, তাঁর বক্তৃতা শুনে একটি কবিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ হন শামসুর রাহমান, রাতে লিখে ফেলেন “সফেদ পাঞ্জাবি” নামের কবিতাটি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, শেখ মুজিবুর রহমান তখনও বঙ্গবন্ধু উপাধি পান নি, তখনই সম্ভবত ১৯৬৬/৭ সালে তাঁকে নিয়ে লিখেন গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির আড়ালে। কবিতাটির নাম “টেলেমেকাস,” তখন শেখ মুজিবুর রহমান কারাবন্দি। এছাড়াও দুটি অসামান্য কবিতা লিখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, তিনি তখন অবস্থা করছিলেন পাড়াতলী গ্রামে, এপ্রিল মাসের সাত অথবা আট তারিখ দুপুরের কিছুক্ষণ আগে বসেছিলাম আমাদের পুকুরের কিনারে গাছতলায়। বাতাস আদর বুলিয়ে দিচ্ছিল আমার শরীরে। পুকুরে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে, কিশোর-কিশোরীও ছিল ক’জন, সাঁতার কাটছিল মহানন্দে। হঠাৎ আমার মনে কি যেন বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো খেলে গেল। সম্ভবত একেই বলে প্রেরণা। কবিতা আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি চটজলদি আমার মেজচাচার ঘরে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে একটি কাঠপেনসিল এবং কিছু কাগজ চাইলাম। সে কাঠপেনসিল এবং একটি রুলটানা খাতা দিল। এই খাতা পেনসিল দিয়ে সে যেন নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করল। আমি সেই কাঠপেনসিল এবং খাতাটি নিয়ে সাততাড়াতাড়ি পুকুরের দিকে ছুটলাম। পুকুর মুন্সীবাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে তার অবস্থান ঘোষণা করছে যেন সগর্বে। পুকুরের প্রতিবেশী সেই গাছতলায় আবার বসে পড়ে খাতায় কাঠপেনসিল দিয়ে শব্দের চাষ শুরু করলাম। প্রায় আধঘণ্টা কিংবা কিছু বেশি সময়ে পর পর লিখে ফেললাম দু’টি  কবিতা – “স্বাধীনতা তুমি” এবং “তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা । [২০০০ : পৃ. ২৬৭] সাংবাদিকতা সাহিত্যের শত্রু, এটা বুঝতে পারেন অনেক দেরিতে। তবুও স্বেচ্ছা-অবসরের আগে পর্যন্ত সাংবাদিকতা ব্যতিত সংসার চালানোর আর কোনো অবলম্বন ছিল না। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ দিয়েছেন পঞ্চান্ন থেকে একষট্টি  অধ্যায়ে। একাত্তরে তাঁর অবস্থান অকপটে বলেছেন, কেন যুদ্ধে যেতে পারেন নি, ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার কিভাবে ঢাকায় ফিরে এলেন, সব বর্ণনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা  ও সেই ঘোষণার পাঠ প্রেসিডেন্ট জিয়া কর্তৃক ঘোষণা শুনেছেন বেতারে। [২০০০: পৃ. ২৮০] “কালের ধুলোয় লেখা”-র একটি বিশেষ দিক হলো অকপটে কবি অনেক কথা বলে ফেলেছেন। অর্শরোগে ভুগে অনেক কষ্ট পেয়েছেন সে কথাও বলেছেন। সবচেয়ে মজার যে বিষয়টি তিনি সাহসের সাথে বলেছেন সেটি তাঁর ব্যক্তিগত প্রেম। জীবনে অনেক নারীর  প্রেমে পড়েছেন, নারীর সৌন্দর্যে হয়েছেন মুগ্ধ। এক দ্রাবিড় কন্যার প্রেমে পড়েন তিনি, কিন্তু কোনোদিন তাকে বলেন নি সে কথা। এই গোপন প্রেমে পড়ে তিনি নিজেই শ্রেণিচ্যুত হন। [২০০০ : পৃ. ৪৬] তবে দুজনের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে অসংখ্যবার। তাঁর আরেক সাহসী মন্তব্য পাওয়া যায় অন্য একটি বর্ণনায়। বাঙালি মুসলমান সমাজে যারা আত্মজীবনী লিখেছেন তাঁদের খুব কমই এমন মন্তব্য করেছেন। সেদিক থেকে শামসুর রাহমানের এ বর্ণনাকে সাহসী বলতেই হবে। বর্ণনাটি ছোট কিন্তু খোলা তরবারির মতো, “মনে পড়ে ছাদের অন্ধকারে কোনও এক সন্ধ্যায় একজন তরুণীর ইচ্ছুক ঠোঁটে ওষ্ঠ স্থাপন করেছিলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য।” [২০০০: পৃ. ৫৫] এ বর্ণনা এতটুকুই, নাম পরিচয় কোনোকিছুই উল্লেখ করেন নি এই তরুণীর। অবশ্য এমন ঘটনায় পাত্রীর পরিচয় সবসময় উল্লেখও করা যায় না। এমন আরেকটি ঘটনার বর্ণনা আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের সংস্কৃতি সংসদে। এর অনুষ্ঠানে অনেক ছাত্র উপস্থিত থাকত, আসতেন কয়েকজন ছাত্রীও। এই ছাত্রীদের একজনকে কবির খুবই ভালো লাগে। একদিন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে কথা বলেন সেই তরুণীর সাথে। [২০০০ : পৃ. ৬৪] কবির হৃৎস্পন্দন ওর হৃদয়ের উপত্যকাকেও গুঞ্জরিত করে তোলে। মেয়েটিকে মনে মনে নাম দেন বন্যা, অনেক আনন্দময় সময় কেটেছে এই তরুণীর সান্নিধ্যে। প্রথমদিকে এই প্রেম ছিল প্লেটোনিক, কিন্তু অনেক বছর পর এই তরুণীও উজার করে দিয়েছে ভালোবাসা। কিন্তু একটা সময়ে যখন বন্যা তাঁর জীবন থেকে দূরে চলে যায় তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন কবি। কবিকে এই বিপর্যয় থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনি পরবর্তীকালে কবিপত্নী হন । কবি আবার প্রেমে পড়লেন এবং জোহরা তাঁকে ফিরিয়ে আনলেন স্বাভাবিক জীবনে। কবি বলেছেন, “১৯৫৫ সালের জুলাই মাসের আট তারিখে নওশার সাজে সজ্জিত হই।” [২০০০ : পৃ. ১২৯] সারাজীবন শ্রদ্ধেয়া জোহরা কবির সাথে ঘর করে আগলে রেখেছেন কবিকে। এমন মহিয়সী নারীকে আমাদের সমাজ মূল্যায়ন করে না, অথচ সৃষ্টিশীল মানুষকে আগলে রাখার জন্য এই স্ত্রীদেরও পুরস্কার ও স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানানো উচিত।  শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম কবিতার বই “প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে”  উৎসর্গ করেন ছোট কয়েকটি পংক্তি লিখে, আমার খামারে নেই কোন শস্যকণা  আছে শুধু একটি আকাশ। তারই কিছু আলো-নীল আজও হে সুদূরতমা ভালোবেসে তোমাকে দিলাম। [২০০০: পৃ. ১৫০] এখানে কবি ইচ্ছে করেই কোনো নাম উল্লেখ করেন নি। যে তরুণীকে বইটি উৎসর্গ করেছিলেন তার অসুবিধা হতে পারে একথা ভেবে। খুব সুন্দর ছিলেন তিনি দেখতে, আচরণে ছিলেন সলাজ সুষমা। তরুণীর চোখ জুড়ানো রূপ তাঁকে সে সময় উদ্বেলিত করেছিল, মেয়ের স্নিগ্ধ ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ ছিলেন। ওর কথা ভাবতেন প্রায় অষ্টপ্রহর। কবির ব্যাকুলতার বাঁধ ভেঙে গেল কোনো একদিন। তাই ভালোবাসার কথা না জানিয়ে থাকতে পারলেন না। তখন কবি ছিলেন বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক । সেই তরুণীর সঙ্গে মিলিত হওয়া কিংবা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু সেই তরুণী আবেগের প্রাবল্যে ভালোবাসার টানে আশ্চর্য সাড়া দিয়েছিলেন। প্রস্তুত ছিলেন কবির সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য। শেষে কবি ভীরুতার অপবাদ মাথায় নিয়ে পিছিয়ে গেলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এর পরিণতি কারও জন্য শুভ হবে না। এটার পর দীর্ঘদিন কবির আর কোনো প্রেম বা নারীর কথা জানা জানা যাচ্ছে না। অনেক পরে গিয়ে আরেকজনের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল – তিনি গৌরী। বাসায় খবর না দিয়ে অতিথি এলে তিনি গৌরীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। কবির মেজাজ খিঁচড়ে যায়, কিন্তু যখন কথা বলতে পারেন তখন কেমন বোধ করেন তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন, আজ গৌরীর সঙ্গে কথা বলা গেল অনেকক্ষণ। নিরবচ্ছিন্ন এই আলাপে সব শরতের আকাশের মতো হয়ে গেল; আমি আমার মধ্যে স্নিগ্ধ রোদ, কয়েকটি দূরগামী পাখির ঝলসানি, সরোবরের টলটলে জল, সোনার ঘণ্টার ধ্বনি অনুভব করলাম। কথা শেষ হলে মনের ভেতর যে-স্তব্ধতার জন্ম হয়, তা হয়ে ওঠে ভিন্ন কোনও সংলাপের শব্দহীন আলোড়ন। এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন কবি গৌরীর সঙ্গে করা বলার সময়, আজকের দুপুর ও বিকেল কাটল গৌরীর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে।  ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর সেতারের সুরের মতো কেটে গেল সারা দুপুর এবং বিকেলের কিয়দংশ। গৌরীর সঙ্গে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল আমরা দু’জন রমণে লিপ্ত। সংলাপও যে কখনও কখনও সঙ্গমতুল্য হয়ে ওঠে, আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম। [২০০০: পৃ. ৩২৭] সম্ভবত গৌরীই ছিল কবি শামসুর রাহমানের জীবনের শেষ রমণী। তবে একটি চিঠিতেও তাঁর প্রেমের কথা জানা যায়। [২০০০: পৃ. ৯৪৫] চিঠির ব্যক্তি হতে পারেন অন্য কেউ অথবা পূর্বে বর্ণিত কোনো নারী। অপরদিকে ছেলেবন্ধুর দিক থেকেও তিনি ছিলেন ঈর্ষণীয় ভাগ্যের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ও লেখালেখির নানা পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোকের সাথে তাঁর সম্পর্ক হয়। লেখালেখির একেবারে শুরুতে হামিদুর রহমান তাঁকে খুবই উৎসাহ দিয়েছেন। খুবই কাছের বন্ধু ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। দু’জনকে “মানিজোড়” বলা হত। [২০০০: পৃ. ১২১] জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কথাও অনেক উল্লেখ করেছেন স্মৃতিকথায়। শিক্ষক খান সারওয়ার মুরশিদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। লেখক-জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কবি কায়সুল হক।  ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কবি ও সচিব আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল ঔপন্যাসিক রশীদ করীমের সঙ্গে। সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন সম্পর্কে শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন সবসময়। ৩. শামসুর রাহমানের তিনটি প্রবন্ধ গ্রন্থ “আমৃত্য তাঁর জীবনানন্দ” (১৯৮৬), “শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ” (২০০১) ও “কবিতা এক ধরনের আশ্রয়” (২০০২) প্রায় একই ধরনের গ্রন্থ। অর্থাৎ তিনটি গ্রন্থের বিষয়ই সাহিত্য।  “আমৃত্য তাঁর জীবনানন্দ” গ্রন্থের সবগুলো লেখাই দীর্ঘ, অর্থাৎ প্রবন্ধ হিসেবেই লেখা। অপরদিকে “শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ” গ্রন্থে আছে প্রবন্ধ ও কলামের মিশ্রণ। এই লেখাগুলোতে কবির সাহিত্য-বিষয়ক চিন্তা, লেখক মূল্যায়ন ও স্মৃতিকথা উঠে এসেছে। একাধিক প্রবন্ধ-কলাম লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। আত্মজীবনীতে যেমন, তেমন কয়েকজন বন্ধুর কথা কিছু লেখায় বারবার বলেছেন, যেমন হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রশীদ করীম, কায়সুল হক ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ। লেখালেখির শুরুতে রবীন্দ্রাথের প্রতি তাঁর খুব একটা আগ্রহ ছিল না। যৌবনের উন্মাদনায় অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে। তাঁকে দখল করে নিয়েছিল আধুনিক কবিতা, কিন্তু বয়স ও অভিজ্ঞতা যত বেড়েছে ততই বুঝেছেন রবীন্দ্রনাথ এমন এক লেখক যাকে অবজ্ঞা করা যায় না, না-পড়ে থাকা যায় না। রবীন্দ্রনাথ থেকে শেখার আছে প্রচুর, সৃষ্টির প্রাচুর্যে তিনি যে জায়গায় পৌঁছে গেছেন সেথানে তাঁকে সমীহ না করে উপায় নেই। তাঁর মতে, পৃথিবীর খুব কম কবি রবীন্দ্রনাথের মতো মগ্ন ছিলেন জীবন-সাধনায়। [২০০১: পৃ. ১৮০] এই কবি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি, সাহিত্যের অগ্রগতির জন্যে বিভিন্ন যুগের কবি মিলিতভাবে যে কাজ করেন,    রবীন্দ্রনাথ এককভাবে সে কাজ করেছেন বাংলা সাহিত্যের জন্য। [২০০১:  পৃ. ১৮১] পুরো রবীন্দ্র রচনাবলি পাঠ করার সৌভাগ্য তাঁর হয় নি। আসলে রবীন্দ্রনাথের লেখা এত বিপুল যে খুব কম লোকই তা পুরোটা পড়ে উঠতে পারেন। শামসুর রাহমান শেষজীবনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পুরো রবীন্দ্র রচনাবলি পাঠ করতে। [২০০৬: পৃ. ৩৬] এ থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাটা বোঝা যায়। নজরুলকে নিয়েও লিখেছেন অনেকগুলো লেখা। লেখাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে বিদ্রোহী কবির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। নজরুল ইসলামকে তিনি বলেছেন এক পরাক্রান্ত কিংবদন্তি। [২০০১: পৃ. ৪৭] যদিও নজরুল আর তাঁর সৃষ্টি-শৈলীর লাইন আলাদা কিন্তু সৃষ্টি ও জীবনযাপনের প্রাচুর্যে নজরুল যে স্থান অধিকার করে নিয়েছেন সেখানে তাঁকে অভিবাদন না জানিয়ে পারেন নি। নজরুল সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো একজন বড় মাপের মানুষ এবং কবি আমাদের সমাজে জন্মগ্রহণ করার পরেও এই সমাজ ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্ত হয় নি। [২০০৬: পৃ. ৬৬] বুদ্ধদেব বসুর প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, দূর থেকে তিনি ছিলেন শিক্ষকের মতো। বুদ্ধদেব বসু তাঁর পত্রিকায় অচেনা শামসুর রাহমানের লেখা ছাপিয়ে সাহিত্য আসরে যেন তাঁকে বরণ করে নেন। একথা তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেছেন। বুদ্ধদেবের গদ্যশৈলী ছিল তাঁর পছন্দের। তিনি একজায়গায় তাঁর এই প্রিয় লেখকের গদ্য সম্পর্কে বলেছেন, তিনি সেই বিরল গদ্য লেখকদের অন্যতম যিনি নিজস্ব স্টাইলের অনুসারী। [২০০১: পৃ. ১০৬]  সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন জীবনানন্দ দাশের।  আনন্দ পেতেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে। তাঁর একটি অন্যতম প্রিয় কবিতা জীবনানন্দ দাশের  “বনলতা সেন।” বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মান দিয়েছেন হাসান হাফিজুর রহমানকে। তাঁর লেখক জীবন গঠনে হাসানের অনেক ত্যাগ ছিল। বন্ধুদের মধ্যে হাসানের মতো সাংগঠনিক যোগ্যতা আর কারো ছিল না। সত্যি কথা বলতে পঞ্চাশের দশকের ঢাকার সাহিত্যজগৎ হাসানের কাছে ঋণী। এঁদের আরেক বন্ধু সৈয়দ শামসুল হকও তাঁর “তিন পয়সার জ্যোছনা” (২০১৪) আত্মজীবনীতে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগতে হাসানের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। শামসুর রাহমানের উত্থানপর্বে কায়সুল হকের অবদানও ভুলবার নয়। “কবিতা” পত্রিকায় লেখা পাঠানোর জন্য কায়সুল হকই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেন। কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম ও কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সান্নিধ্য তাঁকে মনন গঠনে সহায়তা করে।  শামসুর রাহমানের অপর কলাম-প্রবন্ধ গ্রন্থ “একান্ত ভাবনা” (২০০১)। দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত যে-সমস্ত কলাম লিখেছিলেন সেগুলো থেকে কিছু বাছাই করা কলাম নিয়ে এই গ্রন্থ। তাঁর গদ্য গ্রন্থের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কলাম সংগৃহিত হয়েছে এই গ্রন্থটিতে। এ বইয়ের বিষয় সাহিত্য-সংস্কৃতি হলেও এ গ্রন্থটির বৈচিত্র্য অনেক। এ বইতে যেমন লিখেছেন শীতের পিঠা নিয়ে, বঙ্গীয় শব্দকোষ নিয়ে, তেমনই লিখেছেন কবি গালিবকে নিয়ে, পাবলো নেরুদাকে নিয়ে – লিখেছেন বার্গম্যানের ছবি বিষয়ে। এ বই থেকে তাঁর চিন্তার বর্হিমুখীতা লক্ষ করি। পাবলো নেরুদার উপর যখন লেখাটা লিখেছেন তখন চিলির সেই নোবেল বিজয়ী কবি ছিলেন সামরিক শাসকের কারাগারে অন্তরীণ। মূলত এক কবির প্রতি আরেক কবির সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছে এই লেখায়। [২০০১: পৃ. ৭৯] তিনি এই গ্রন্থে জাঁ পল সার্তের উপর লিখেছেন। সার্ত সেই লোক যিনি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখান করেছিলেন। সার্তের উপর লেখায় শামসুর রাহমান উল্লেখ করেছেন এই লেখকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি, “আমি কোনোদিন বিশ্বাস করি নি আমার কোনো প্রতিভা আছে।” [২০০১ : পৃ. ৬৮] কেমন ব্যক্তিত্ব হলে নিজের সম্পর্কে এমন বিধ্বংসী উক্তি করতে পারেন। একটি লেখায় তিনি লিবার‌্যালিজম নিয়ে আলোচনা করেছেন। [২০০১: পৃ. ২২] সেখানে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে এর ভালোমন্দ দিক। এক সময় তিনি নিজেকে লিবার‌্যালই বলতেন, কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়েছে এর দুর্বলতা। সুবিধাবাদীরা লিবার‌্যালিজমকে ব্যবহার করে মানুষকে শোষণ করেছে; লিবার‌্যাল মানুষকে অক্ষম ঠাউরে চরমপন্থীরা তাদেরকে খুনও করেছে। কবির মতে মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন লিবার‌্যাল। লিবার‌্যাল হওয়ার মূল্য এদের জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। সবপক্ষই সন্দেহ করে লিবার‌্যালদের, কেউই নিজেদের লোক মনে করে না তাদের। সম্ভবত এটিও এক দুর্বলতা লিবার‌্যালিজমের। সৃষ্টিশীল মানুষদের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার প্রকাশ দেখা যায় এই “একান্ত ভাবনা” কলাম-সংগ্রহে। এ-বইয়ের অধিকাংশ লেখা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক হলেও কয়েকটি লেখায় সমাজচিন্তা ও সমাজমনস্কতাও প্রকাশ পেয়েছে। “কবে শেষ হবে কৃষ্ণপক্ষ”  কবি শামসুর রাহমানের শেষ প্রবন্ধগ্রন্থ। লেখাগুলো দেখে মনে হয় কলাম হিসেবে লেখা হয়েছিল। কিন্তু কোন পত্রিকার জন্য এগুলো লেখা হয়েছিল বা কোন তারিখে এই কলাম প্রকাশিত হয়েছিল তার কোনো উল্লেখ বইটিতে নেই। তথ্যগুলো থাকলে ভবিষ্যতে গবেষকদের জন্য সুবিধা হত। সব মিলিয়ে ষাটটি কলাম ছাপা হয়েছে এই গ্রন্থে। বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ও শিল্প-সংস্কৃতির বিষয় আলোচনা করা হয়েছে এখানে। কিছু কলাম তাঁর সমাজচিন্তার অনন্য দলিল। দু-একটির বিষয় সত্যি হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। “একজন প্রকৃত ধার্মিকের কথা…” শিরোনামের গদ্যটিতে হাজি রফিক আহমদ নামক পাখিপ্রেমিক সম্পর্কে লিখেছেন, যিনি চড়ুই পাখি পোষেণ। তার বাড়ি চড়ুই পাখির অভয়ারণ্য। কবুতরের মতো খোপ তৈরি করে তিনি চড়ুই পাখির বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। চড়ুইয়ের মতো বন্য পাখিকে পোষ মানানো সহজ নয়, কিন্তু তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন। [২০০৬: পৃ. ৩৭] লেখাটি পড়লে প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয় মন। লিখেছেন একটি ব্রাত্য জনগোষ্ঠী মুচিদের নিয়ে। [২০০৬: পৃ. ৭৩] এই লেখাটি পাঠে মনে হয় আমাদেরই প্রতিবেশী এই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমরা কত কম জানি! এখনও ওরা সামাজিকভাবে নিগ্রহের শিকার, অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে পড়ে আছে। আমাদের এক নিদারুণ অবহেলার প্রতি কবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর পক্ষপাত থাকলেও ভুল কর্মনীতির কারণে আওয়ামী লীগের তিনি সমালোচনাও করেন। যে-সমস্ত সুবিধাবাদী বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে চেয়েছে তাদের ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকতে বলেছেন। [২০০৬: পৃ. ১১৯] তখনও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সততা ছিল। রাজনীতির কাছে সবাই বিক্রি হয়ে যান নি, সত্যের খাতিরে বলা দরকার, আওয়ামী লীগও ধর্মনিরপেক্ষতার পথ ছেড়ে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মতোই কিছুটা হয়ে গেছে। একথা বলতে পীড়িতবোধ করছি কিন্তু আমি নিরূপায়। নিজের চেতনা ও উপলব্ধির সঙ্গে তো আর প্রতারণা করতে পারিনা। [২০০৬: পৃ. ৯৮] বইয়ের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার কথা তিনি বহু লেখায় বলেছেন। বই পড়ার জন্য গ্রন্থাগারের সদস্য পর্যন্ত হয়েছেন। হয়ত এই মুগ্ধতাবোধে চালিত হয়েই বেছে নিয়েছিলেন কবি ও লেখকের জীবন। বই সম্পর্কে তাঁর একটি উপলব্ধিকে  সেরা মন্তব্য বলা যেতে পারে, “যদি দু’চারদিন বই স্পর্শ না করি, তাহলে মনে হয়, অসভ্য হয়ে যাচি্ছ।” [২০০৬: পৃ. ১২৮] সমাজের যেখানে অসঙ্গতি দেখেছেন সেটার প্রতিবিধান করার চেষ্টা করেছেন কলমের সাহায্যে। ৪. সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ের উপর মন্তব্য করেছেন এই কলাম ও প্রবন্ধগুলোতে। এই লেখাগুলো থেকে তাঁর পক্ষপাতের বিষয় সহজেই শনাক্ত করা যায়। তিনি সবসময় সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের পক্ষে। যা কিছু মানুষ ও সমাজের জন্য শুভকর তিনি তা সমর্থন করেছেন। অন্যায় করলে নিজের লোককেও  ছাড় দিতে নারাজ। যে রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন সে দল অন্যায় করলে তিনি সমালোচনা করতে পিছপা হন নি। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সবসময় কল্যাণ ও মঙ্গলের পক্ষ নিয়েছেন। বিভিন্ন লেখা থেকে বোঝা যায় আর্থিকভাবে খুব বেশি স্বচ্ছল মানুষ ছিলেন না, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। সেটা করলে হয়ত তাঁর উপার্জন অনেক বেড়ে যেত, হাদিয়া-তোহফায় ভরে যেত পারিবারিক ও অর্থনৈতিক জীবন। অন্তত এই একটা জায়গাতে তাঁর কাছ থেকে এখনও অনেক শেখার আছে এদেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের। তিনি পুরস্কার পদক ও চেয়ারের কাছে নিজের মাথা বিক্রি করে দেন নি। বাংলাদেশে বর্তমানে এ ধরনের বুদ্ধিজীবী বিরল।   কলাম ও প্রবন্ধ লেখার জন্য যে ভাষাশৈলী তিনি গ্রহণ করেছেন তা অত্যন্ত সহজ ও বোধগম্য। বোঝা যায়, পাঠক-শ্রোতাদের সাথে সহজেই তিনি যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন। সন্দেহ নেই, এ গদ্যের দ্বারা নতুন প্রজন্ম প্রভাবিত হয়েছে, প্রগতির পাঠ পেয়েছে কিছু মানুষ। এই লেখাগুলোর মূল্য এখানেই। লেখাগুলো থেকে প্রগতির পাঠ পাবেন সাধারণ পাঠক, মননশীলতার ছোঁয়ায় ঋদ্ধ হবে মন। তাঁর গদ্য রচনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ “স্মৃতির শহর”; এখানে যেভাবে প্রকাশভঙ্গি এবং বাক্যে শব্দ প্রয়োগ নিয়ে তিনি খেলেছেন, সফল হয়েছেন – এটা আর কোনো প্রবন্ধ বা কলাম গ্রন্থে দেখা যায় না। তাঁর কিছু গদ্যের পুনর্মুদ্রণ হওয়া দরকার। এই কলাম ও প্রবন্ধের ভেতর থেকে সেরা লেখাগুলো বাছাই করে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ জাতীয় সংকলন প্রকাশিত হওয়া দরকার। একজন কবি চিন্তাবিদ নন, কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের রচনার সাথে অনেক সময় থাকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ফলে তারা যখন লেখেন তখন তাদের লেখায় পাওয়া যায় উন্নতচিন্তার স্ফূলিঙ্গ । শামসুর রাহমানের গদ্য রচনায় প্রগতিশীল চিন্তার রূপরেখার আভাস পাওয়া যায়; যার স্পর্শে জ্বলে উঠতে পারেন পাঠক। তাই পাঠককে উন্নতচিন্তার সন্ধান দিতে এই প্রবন্ধের নির্বাচিত সংকলনকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। মানুষের পশ্চাৎপদতার মূলোৎপাটন ঘটানোর মতো চিন্তায় ছাওয়া শামসুর রাহমানের গদ্য । তাই এগুলোর বেশি করে প্রচার হওয়া দরকার।                                                                                                                                           সহায়ক গ্রন্থ শামসুর রাহমান, গদ্য সংগ্রহ, ২০০০ (?), কলকাতা। শামসুর রাহমান, একান্ত ভাবনা, ২০০১, ঢাকা। শামসুর রাহমান, কবে শেষ হবে কৃষ্ণপক্ষ, ২০০৬, ঢাকা। লেখক পরিচিতি খালিদ সাইফ জন্ম ১৪ চৈত্র ১৩৮১ বঙ্গাব্দ, ঈশ্বরদী, পাবনা। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রাম ও ঈশ্বরদী শহরে। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা সেখানেই। উচ্চমাধ্যমিক ঢাকায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। খণ্ডকালীন শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক। কর্মস্থান গুলশান। ভ্রমণ ও বই পড়তে ভালোবাসেন। প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতা : প্রজ্ঞার শহরে একদিন (২০০৬) প্রবন্ধ : নির্মাণ ও বিনির্মাণ (২০০৭) অনুবাদ : জালালুদ্দিন রুমি : প্রেমের কবিতা (২০০৮) কিশোর উপন্যাস : পাহাড়পুরের গুপ্তধন (২০১২) ছোটগল্প : সুর ও অসুরের গল্প (২০১৭) অনুবাদ : জালালুদ্দিন রুমি : নির্বাচিত কবিতা (২০১৮) জীবনী : আল রাজি : নাস্তিক না আস্তিক (২০২৪) গবেষণা : সৈয়দ শামসুল হকের ছোটগল্প : বৈচিত্র্য ও শিল্পশৈলী (২০২৫) ফোন: ০১৭১৫২৪৩৩৩৯; ০১৫১৫৬৮৭২২১ ই-মেইল: [email protected]

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow