কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৭
১৭ জুলাই, আজ মহররমের প্রথম দিন। মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট ও কলিন লেনে সাজ সাজ রব। মুসলিমদের মধ্যে একটা উৎসবের আমেজ। এখানে দুটো মাজার আছে। সেখানে আরও বেশি আলোকসজ্জা করা হয়েছে। সকাল থেকেই মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। বিশেষ এই দিনে দোয়া-দরুদ শেষে তবারকের আয়োজন করা হবে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করবেন মুসলিমরা। বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের অবস্থান কিছুটা স্বস্তিদায়ক। মসজিদের মাইক থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই মুসল্লিরা সেখানে হাজির হচ্ছেন। কসাইরা প্রকাশ্যে গরুর গোশতের দোকান খুলে বসে আছে। মহররমের মতো উৎসবে গরু জবাই কিংবা হোটেলগুলোতে লালভুনা, কালাভুনা, নল্লি হরহামেশাই পাওয়া যায়। তাতে করেই স্পষ্ট যে, এখানে প্রাণখুলে মুসলিমরা তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারছেন। হোটেল কক্ষে বসেই সানির সঙ্গে যোগাযোগ হলো। দ্রুতই হোটলে ছাড়তে হবে। নয়তো পরিকল্পনা অনুযায়ী সব জায়গায় যেতে পারব না। গেলেও তৃপ্তি নিয়ে আড্ডাটা আর হবে না। সানি আর শাম্মি আপা আগেও কলকাতা এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসা আর কাজের বাইরে কখনোই সিটি অব জয়ের স্বাদ নেননি। সে কারণেই তারাও বিলম্ব করতে চা
১৭ জুলাই, আজ মহররমের প্রথম দিন। মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট ও কলিন লেনে সাজ সাজ রব। মুসলিমদের মধ্যে একটা উৎসবের আমেজ। এখানে দুটো মাজার আছে। সেখানে আরও বেশি আলোকসজ্জা করা হয়েছে। সকাল থেকেই মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। বিশেষ এই দিনে দোয়া-দরুদ শেষে তবারকের আয়োজন করা হবে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করবেন মুসলিমরা।
বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের অবস্থান কিছুটা স্বস্তিদায়ক। মসজিদের মাইক থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই মুসল্লিরা সেখানে হাজির হচ্ছেন। কসাইরা প্রকাশ্যে গরুর গোশতের দোকান খুলে বসে আছে। মহররমের মতো উৎসবে গরু জবাই কিংবা হোটেলগুলোতে লালভুনা, কালাভুনা, নল্লি হরহামেশাই পাওয়া যায়। তাতে করেই স্পষ্ট যে, এখানে প্রাণখুলে মুসলিমরা তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারছেন।
হোটেল কক্ষে বসেই সানির সঙ্গে যোগাযোগ হলো। দ্রুতই হোটলে ছাড়তে হবে। নয়তো পরিকল্পনা অনুযায়ী সব জায়গায় যেতে পারব না। গেলেও তৃপ্তি নিয়ে আড্ডাটা আর হবে না। সানি আর শাম্মি আপা আগেও কলকাতা এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসা আর কাজের বাইরে কখনোই সিটি অব জয়ের স্বাদ নেননি। সে কারণেই তারাও বিলম্ব করতে চাইলেন না।
শাম্মি আপার কাছে লোকাল সিম আছে। ফ্রি ইন্টারনেট প্যাকেজ আছে; শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমরা সেটাই ব্যবহার করি। সানি কিংবা আমার কারো কাছেই তো সিম নেই। ইন্টারনেট কানেকশনের শেষ ভরসা হোটেলের ওয়াই-ফাই। ঘরের বাইরে শাম্মি আপার উদারতা!
দিনের প্রথম গন্তব্য জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। এটা অবশ্য এখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছিল।
সকালের নাস্তা সেরে রাফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে ট্যাক্সির খোঁজ করছি। অধিকাংশ ট্যাক্সি ড্রাইভারই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি চিনছেন না। সিএনজি চালকদেরও একই অবস্থা। শেষপর্যন্ত মারকুইজ স্ট্রিটে একটা ট্যাক্সি পেলাম। রবি ঠাকুরের জন্মস্থান তার চেনাজানা আছে। এই গাড়িতেই চেপে বসলাম।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬
কলকাতার রাস্তাগুলো তুলনামূলক ফাঁকা। ট্র্যাফিক সিগন্যালে কোনো জ্যাম নেই। কয়েকমুহূর্তেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রধান সড়কের সামনে পৌঁছলাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মভিটায় পৌঁছে মনটা নেচে উঠল। সানি আর শাম্মি আপাকে সে কথা বলছিলাম। তবে ঠাকুরবাড়ির প্রধান ফটকের চিত্র দেখে ঠোঁটের চওড়া হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। দরজায় ঝুলছে বিশাল এক তালা। ভেতরে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। অনেক চেষ্টা করেও সিকিউরিটির মন গলানো গেল না।
‘এই যে দাদা একটু খুলে দাও! আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আজকের পর হয়তো আসা হবে না।’
‘আজ কিছুতেই গেটের তালা খোলা যাবে না। গেটে যে নোটিশ ঝোলানো আছে, সেটা কি খেয়াল করছো না?’
সিকিউরিটির কথা শুনে গেটে ঝোলানো নোটিশ খুঁজছি। সাদা একটা কাগজে কম্পিউটার টাইপে নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ‘আজ মহররম। সরকারি ছুটি। আজ সব ধরনের দর্শনার্থীর প্রবেশ নিষেধ। ধন্যবাদ।’
ঢাকার মতো মমতা ব্যানার্জির রাজ্যেও ঢাকঢোল পিটিয়ে মহররমের ছুটি পালন করা হয়, সে কথা এই প্রথম জানলাম। সরকারি ছুটির দিনে দর্শনীয় স্থান বন্ধ থাকবে সেটা অস্বাভাবিক ঘটনা। আর স্বাভাবিক এ কারণে যে, এটা এখন রাজ্য সরকারের প্রতিষ্ঠান। এখানে পড়াশোনা হয়। ছুটির দিনে কর্তারা বিশ্রাম করছেন।
দিনের শুরুতেই সঙ্গী হলো মন খারাপ! সানি আর শাম্মি আপার মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেল। এ কথা সত্যি যে, তাদের চেয়েও বেশি মন খারাপ হয়েছে আমার। আমি তো এসেছিই ঘুরতে। তবে শুধু আমরাই নই, আরও অনেক পর্যটক এসেছে। তাদের মনের পরিস্থিতিও একই। কিন্তু কেউই রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন না। সরকারি ছুটিতে বন্ধ। এখন তো কারোরই করার কিছু নেই।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রধান ফটকে দাঁড়িয়েই সবাই স্থিরচিত্র ধারণ করছে। এরপর একে একে সবাই মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের মন ভালো করতে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পেয়ারা জুসের ক্যান বের করে দিলেন শাম্মি আপা। দু’তিন ধরনের জুস সব সময় তার ব্যাগে থাকেই। পরিচয় হওয়ার পর থেকেই সে দৃশ্য দেখছি।
‘সানি, এখন যাবার সময় হয়েছে।’
‘যাইবেন কোনে?’
‘কলেজ স্ট্রিট।’
‘হেনে আবার কী আছে?’
‘ওমা, এ কথা জানেন না! সেখানে যে মান্না দের গাওয়া কফি হাউজ গানের ইন্ডিয়ান কফি হাউজ আছে?’
‘ওইডা যে ওনে, তা তো জানতাম না। শাম্মি আপা, কফি হাউজে যাইতাছি, লন।’
শাম্মি আপা নীরব সম্মতি দিলেন। সানি তাকে কোনো অনুরোধ করলে তা অগ্রাহ্য করার সাহস নেই। সেটা অবশ্য হয়েছে বিশ্বাসের কারণে।
ঠাকুরবাড়ির মুখেই পুরোনো দিনের এক দৃশ্য চোখে পড়ল। ফুটপাতের এক কোনায় টুল পেতে নরসুন্দর বসে আছে। আধুনিক জেন্টস পার্লারের কোনো ছোয়া নেই। ছোট একটা আয়না, দুটো ক্ষুর, কয়েকটা চিরুনি, শেভিং ক্রিম আর ময়লার ঝুড়ি।
নরসুন্দরের বয়স হয়েছে বেশ। গালের চামড়াগুলো ঝুলে গেছে। ইংলিশবাবুদের মতো ক্লিন সেভে সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মাথার চুলগুলো তো আগেই সাদা হয়েছে। চোখে আছে হাই-পাওয়ারের পুরু গ্লাস। শরীরে জীর্ণ-শীর্ণ কাপড়।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫
কিছুক্ষণ পরই একজন সেবা নিতে আসলেন। দাঁড়ি কামাবে সে। ফোম লাগিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নরসুন্দর। এ দৃশ্যটা আমি ধারণ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দিনের শুরুতেই আমার চিত্রধারণ তার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হলো। কিছুটা মেজাজ হারিয়ে বললেন, ‘নাও বাবু তুমিই নাও; সবকিছু ফেলে আমি চলছি!’
এ কথা শোনার পর কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। রেগে গেল নাকি নরসুন্দর। না এই ব্যবহারের পর এখানে আর একবিন্দুও অপেক্ষার কারণ নেই। সানি আর শাম্মি আপার সঙ্গে ইন্ডিয়ান কফি হাউজে রওয়ানা করলাম।
ট্যাক্সি থেকে মাত্রই কলেজ স্ট্রিটে নেমেছি। ফুটপাত ভাসমান বই দোকানিদের নিয়ন্ত্রণে। কলকাতার বিখ্যাত কলেজ স্ট্রিট, যাকে অনেকে বইপাড়া নামে চেনেন, পৃথিবীর বৃহত্তম পুরোনো বইয়ের বাজারগুলোর একটি। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারি সারি বইয়ের দোকান। নতুন, পুরোনো, দুর্লভ কিংবা বহুদিন ধরে মুদ্রণ বন্ধ হয়ে যাওয়া বইও মিলবে এখানে।
বইপট্টির ঘ্রাণ বাতাসে মেশার আগেই বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট। এ সড়কের মুখেই হাতের বাঁপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইন্ডিয়ান কফি হাউজ। এর বিপরীত পাশেই ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি। তার কাছাকাছি আরেকটি লাল ভবন, গভর্নমেন্ট বেকার হোস্টেল। লাল ইটের স্মৃতিবিজড়িত এ ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর গল্প। কলেজ স্ট্রিটের এই ছোট্ট পরিসরের ভেতরেই যেন বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি আর রাজনীতির কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বন্দি হয়ে আছে।
১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ থেকেই আজকের প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি। রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার ও রাধাকান্ত দেবসহ তৎকালীন শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারকদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানই বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। ১৮৫৫ সালে এর নাম হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০১০ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়।
এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করিডোরে হেঁটেছেন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, অমর্ত্য সেন, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুসহ উপমহাদেশের অসংখ্য কিংবদন্তি। প্রেসিডেন্সির লাল-হলুদ রঙের ভবন, উঁচু স্তম্ভ আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্য যেন আজও সেই সময়ের গল্প শোনায়।
প্রেসিডেন্সির কয়েক কদম দূরেই গভর্নমেন্ট বেকার হোস্টেল। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রাবাসটির নামকরণ করা হয় ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ স্যার আলফ্রেড বেকারের নামে। একসময় কলকাতার বিভিন্ন জেলা ও তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নানা প্রান্ত থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা মেধাবী ছাত্রদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ছিল এটি। সুভাষচন্দ্র বসু, রাজেন্দ্র প্রসাদ, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহাসহ বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এ হোস্টেলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লাল ইটের দীর্ঘ বারান্দা, পুরোনো জানালা আর খোলা উঠান দেখে মনে হয়, সময় যেন এখানে ধীর গতিতে বয়ে যায়। চারপাশে চোখ মেললেই বোঝা যায়, ছোট্ট এলাকাটা যেন বাঙালির জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত ইতিহাস।
রাস্তা পেরিয়ে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছি। লাল সাইনবোর্ডের ওপর হলুদ অক্ষরে লেখা ‘ইন্ডিয়ান কফি হাউজ’। এর ঠিক নিচেই লেখা, ‘কফি হাউজের রক্তদানে আপনাকে স্বাগত’। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এ ভবনের দেওয়ালে কত শত গল্প জমে আছে। যে ভবনে আজ কফির কাপ হাতে আড্ডা জমে, তার নাম একসময় ছিল অ্যালবার্ট হল।

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ১৮৭৬ সালে কলকাতার তৎকালীন শেরিফ রামকমল সেনের পুত্রদের উদ্যোগে ভবনটি নির্মিত হয়। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল সভা-সমাবেশ, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৪২ সালে কফি বোর্ড এখানে প্রথম কফি হাউজ চালু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতজুড়ে কফি জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে কফি বোর্ড ব্যবসা গুটিয়ে নিলে ১৯৫৮ সালে কর্মীদের সমবায় সমিতি ‘ইন্ডিয়ান কফি ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ এর দায়িত্ব নেয়। সেই থেকে কর্মীদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে এ ঐতিহাসিক কফি হাউজ।
কফি হাউজের প্রবেশদ্বারে খুব বেশি সাজসজ্জা নেই। আশপাশজুড়ে শুধু বইয়ের দোকান। নিচতলায় আহামরি কোনো আয়োজন নেই। বলতে পারেন, শুধু সিঁড়িঘর। তবে সিঁড়ির দেওয়ালে চোখ রাখলেই দেখা যায় পুরোনো ছবি, পোস্টার আর বিভিন্ন স্মারক। পুরোনো বাঁকানো নকশার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে হয়।
দোতলায় পা রাখতেই চোখে পড়ে বিশাল উঁচু ছাদ। একসময়কার অ্যালবার্ট হলের স্থাপত্যশৈলী এখনো অক্ষত রয়েছে। উঁচু খিলান, লম্বা জানালা, মোটা স্তম্ভ আর পুরোনো কাঠের নকশা পুরো জায়গাটাকে আলাদা একটা আবহ দিয়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে লোহার রডে ঝুলছে বড় বড় বৈদ্যুতিক পাখা। নিচে গোল আকৃতির অসংখ্য টেবিল পাতা। এখানে মূল ডাইনিং স্পেস ছাড়াও আছে একটি ছোট মঞ্চসদৃশ জায়গা, যেখানে বিশেষ অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠ, বই প্রকাশনা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়।
দেওয়ালের বিভিন্ন অংশজুড়ে আছে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের ছবি। এ ফ্লোরে বেয়ারাদের তুমুল ব্যস্ততা। সবার গায়ে সাদা পোশাক, মাথায় সাদা টুপি। গ্রাহকদের অর্ডার নিয়েই রসুইখানার দিকে ছুটছেন। স্টিলের ট্রেতে খাবার সাজিয়ে টেবিলে টেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে কেউ বন্ধুত্বের গল্পে মগ্ন, কেউ পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছেন, কেউবা খুঁজছেন হারিয়ে যাওয়া সময়কে। কফি হাউজের প্রতিটি টেবিল যেন একেকটি ইতিহাসের সাক্ষী। এখানে বসেই একসময় আড্ডা দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, অমর্ত্য সেনের মতো বাংলার ধ্রুপদী তারার।
তৃতীয় তলায় উঠে এলাম। এখানে খুব বেশি জায়গা নেই। সরু হাঁটার পথের দেওয়ালে দেওয়ালে তৈলচিত্রের শিল্পকর্ম। তার পাশেই ছোট ছোট টেবিল আর চেয়ার বসানো হয়েছে। এখান থেকে নিচের পুরো ফ্লোরটা একনজরে দেখা যায়। ওপর থেকে তাকালে মনে হয়, প্রতিটি টেবিলে একেকটি গল্প জন্ম নিচ্ছে, আবার কোনো গল্প শেষও হয়ে যাচ্ছে।
ফ্লোরের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছি। উত্তর কোণের একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। তারা সবাই ঢাকার কচুক্ষেত থেকে এসেছেন। জানালাম, আমিও একই এলাকার বাসিন্দা। এরপর কবে, কোথায়, কীভাবে এখানে এসেছি, সেসব নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প চলল। তৃতীয় তলার নিস্তব্ধতায় নিচে নামতে বাধ্য হলেন সানি আর শাম্মি আপা। আমিও তাদের পিছু নিলাম। দোতলায় এসেই একটা ফাঁকা টেবিল পাওয়া গেল। সেখানেই আমাদের বসার জায়গা হলো। মুহূর্তেই টেবিলের সামনে হাজির বেয়ারা।
‘স্যার, কী লাগবে?’
‘মেন্যু কার্ড নাড়াচাড়া করে বললাম, তিনটা কোল্ড কফির সঙ্গে সমপরিমাণ কাটলেট দিন।’
‘আরও স্পেশাল আইটেম আছে। সেগুলোও চেখে দেখতে পারেন।’
‘না, আপাতত এতেই চলবে।’

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৩
ইন্ডিয়ান কফি হাউজের খাবারের তালিকায় খুব বেশি চাকচিক্য নেই। কিন্তু কফি, চিকেন কাটলেট, ফিশ ফ্রাই, পাকোড়া কিংবা টোস্টের স্বাদে মিশে আছে কয়েক দশকের ঐতিহ্য। খাবার আসতে সময় লাগছে। আশপাশের টেবিলগুলো খেয়াল করছিলাম। অধিকাংশ টেবিলই অপরিপূর্ণ। কোনোটাতে দুজন, কোনোটাতে তিনজন।
এত টেবিলের মধ্যে একটাতে চোখ আটকে গেল। একদম পরিপূর্ণ। পাঁচজনের একটি দল গোল হয়ে বসে আড্ডায় মেতেছে। মাঝেমধ্যেই হেসে খুন হচ্ছে। ওদের আড্ডা দেখে কিংবদন্তি মান্না দের ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’ গানের কথা মনে পড়ে গেল। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত এই গান বাঙালির আড্ডা সংস্কৃতির এক অমর দলিল। গানটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই কফি হাউজের চেনা দৃশ্য, গোল টেবিল আর স্বপ্নবাজ তরুণদের মুখ।
চেয়ার ছেড়ে দলটার টেবিলের দিকে পা বাড়ালাম। কয়েক কদম এগোতেই ওদের কাছে পৌঁছে গেলাম। ভাষা শুনেই অনুমান করলাম, ওরা পাঞ্জাব থেকে এসেছে। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম।
‘হাই, বিউটিফুল পিপল, হোয়ার আর ইউ ফ্রম?’
‘উই আর ফ্রম পাঞ্জাব। ইউ আর?’
‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।’
‘ওহ গ্রেট, মাই ফ্রেন্ড। প্লিজ সিট হিয়ার।’
‘নো, থ্যাংক ইউ। কুড আই টেক আ গ্রুপ ফটো অব ইউ?’
‘হোয়াই নট? প্লিজ, গো অ্যাহেড।’
‘থ্যাংক ইউ।’
তাদের অনুমতি নিয়ে পাখির চোখে একটি ছবি তুললাম। ছবিটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ড্রোন দিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিটি ওদের ভীষণ পছন্দ হলো। মুহূর্তেই এক পাঞ্জাবি যুবক ছবিটি চেয়ে বসলেন। জানালাম, এখন নেট নেই। তোমাদের নম্বর দাও, হোটেলে ফিরে পাঠিয়ে দেব।
তারা কেউ বাঙালি নন, সবাই পাঞ্জাবি। পাঁচ বন্ধু মিলে কলকাতা ভ্রমণে এসেছেন। রাজ্যের নানা দর্শনীয় স্থান ঘুরে শেষ বিকেলে এসে বসেছেন এই কফি হাউজে। বিদায়ের সময় তারা বলছিলেন, কখনো সুযোগ হলে পাঞ্জাবে এসো। তোমাকে ট্র্যাক্টরে করে ঘুরিয়ে আনব। জানি, হয়তো কখনো যাওয়া হবে না। তবু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।
আমাদের টেবিলে ফিরে কোল্ড কফি আর কাটলেট শেষ করলাম। এরপর আলাপ শেষ করে কফি হাউজ থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত ধরে হাঁটছি। আর পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ নিচ্ছি। মোহনীয় সেই ঘ্রাণ যেন ফিরে নিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বছরের পুরোনো দিনে।
চলবে...
এসইউ
What's Your Reaction?

