কারখানায় উৎপাদনে ধাক্কা, ছাঁটাই আতঙ্কে শ্রমিকরা
শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক হয়নি গ্যাস সরবরাহ উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিপমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ এক কারখানাতেই ছাঁটাই পাঁচ শতাধিক শ্রমিক সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সংকট পুরোপুরি কাটাতে ভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কাজে আসছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিল্পমালিকদের। অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাবে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন শ্রমিকরা। চলতি মাসেই একটি পোশাক কারখানায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এক হাজার ২০০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানার বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন আংশিক চলছে, আবার কোথাও কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। সাভারের রেডিও কলোনি ও হেমায়েতপুর এবং আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জ
- শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক হয়নি গ্যাস সরবরাহ
- উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিপমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ
- এক কারখানাতেই ছাঁটাই পাঁচ শতাধিক শ্রমিক
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সংকট পুরোপুরি কাটাতে ভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কাজে আসছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিল্পমালিকদের।
অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাবে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন শ্রমিকরা। চলতি মাসেই একটি পোশাক কারখানায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এক হাজার ২০০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানার বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন আংশিক চলছে, আবার কোথাও কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সাভারের রেডিও কলোনি ও হেমায়েতপুর এবং আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর, বেরুন, শিমুলতলা, পলাশবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, বাইপাইল ও জিরানী এলাকার বিভিন্ন কারখাানা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ শুরুর অপেক্ষায় বসে আছেন। কোথাও আবার সীমিত পরিসরে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা চলছে।
‘সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এক হাজার ২০০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানার বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন আংশিক চলছে, আবার কোথাও কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে’
তবে ঠিক কতটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বা কতটি বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে শিল্প পুলিশ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
কারখানার মালিকরা জানান, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাপ ১০-১৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ৫-৮ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এক হাজার ২০০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে/ছবি-জাগো নিউজ
আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও তা স্বাভাবিক নয়। এতে উৎপাদন আংশিকভাবে শুরু করা গেলেও বয়লার ও আয়রন সেকশন এখনো পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।’
আরেকটি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিদ্যুৎ থাকলেও গ্যাসের স্বল্পচাপে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি দুটোই বাড়ছে।’
ছাঁটাই আতঙ্কে শ্রমিকরা
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই বুধবার (৫ আগস্ট) আশুলিয়ার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যবসায়িক মন্দা, ব্যাংকঋণ না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত কার্যাদেশের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অতিরিক্ত শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর শিল্পাঞ্চলের অন্য কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও চাকরি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
‘স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাপ ১০-১৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ৫-৮ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না’
ছাঁটাই হওয়া মজিবর নামের এক শ্রমিক জানান, প্রায় এক বছর ধরে তিনি ওই কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করছিলেন। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
তার দাবি, গ্যাস বা বিদ্যুতের সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। নিয়মিত কাজ চলছিল। ছাঁটাইয়ের নোটিশও তাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছে।
আরেক শ্রমিক মিলনের ভাষ্য, সংকট দীর্ঘায়িত হলে আরও অনেক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে। অনেক কারখানা এরইমধ্যে কম শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে কর্মরত শ্রমিকদের ওপরও কাজের চাপ বেড়েছে।
যা বলছেন শ্রমিক নেতারা
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু জাগো নিউজকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট বাস্তব হলেও কিছু মালিক এটিকে ‘শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অজুহাত’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরও উৎপাদন খুব বেশি কমেনি; বরং কম শ্রমিক দিয়ে একই পরিমাণ কাজ করানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে সংকট সমাধানের পাশাপাশি ছাঁটাইয়ের বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
‘গ্যাস-সংকটের সঙ্গে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী সময়মতো পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিপমেন্টের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে’—বিজিএমইএ সহসভাপতি
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দু বেপারী বিন্দু বলেন, উৎপাদন কমে গেলে মালিকদের ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হয়। সেই চাপের প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের ওপর। সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শিপমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি ও সফটেক্স কটন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজোয়ান সেলিম বলেন, ‘সব কারখানায় সংকটের প্রভাব সমান নয়। যেসব কারখানায় ডাইং, ওয়াশিং বা গ্যাসনির্ভর উৎপাদন বেশি, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
গ্যাস সংকটে কোনো শিল্পকারখানায় উৎপাদন আংশিক চলছে, আবার কোথাও কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে/ছবি-জাগো নিউজ
তিনি বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের সঙ্গে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী সময়মতো পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিপমেন্টের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে।’
রেজোয়ান সেলিম জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার বিষয়টি সমাধানে কাজ করছে। তাদের প্রত্যাশা, ১৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
শিল্প পুলিশ-১–এর পুলিশ সুপার মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বেশিরভাগ কারখানা বিদ্যুৎনির্ভরভাবে চললেও গ্যাসনির্ভর কয়েকটি কারখানা এখনো বন্ধ রয়েছে। চলতি মাসে ছয় শতাধিক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।’
এসআর
What's Your Reaction?