কাশিমপুর পাম্প হাউজ, কৃষকদের ভরসাই এখন দুর্ভোগের কারণ
কৃষকদের কথা চিন্তা করে হাওরের পানি দ্রুত কমানোর জন্য মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছিল মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউজ। একসময় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠলেও এখন সেই পাম্পই যেন দুর্ভোগের কারণ। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে কাউয়াদিঘি হাওরের বিস্তীর্ণ আউশ ও আমন ধানক্ষেত। কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি কমানো হলেও বিদ্যমান পাম্প দিয়ে দুই ফুট পানি নামাতেই সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। ফলে ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। কৃষকেরা জানান, রাজনগর ও সদর উপজেলা জুড়ে কাউয়াদিঘী হাওর। এই হাওরের পানি না কমায় ইতোমধ্যে হাওরের পাকা আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চলতি আমন মৌসুমে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হাওরে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পাম্প দিয়ে পানি নামতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। গত বোরো মৌসুমে এই পাম্প দিয়ে দ্রুত পানি না কমায় বেশিরভাগ কৃষকের ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। মৌলভীবাজার কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নজুড়ে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস
কৃষকদের কথা চিন্তা করে হাওরের পানি দ্রুত কমানোর জন্য মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছিল মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউজ। একসময় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠলেও এখন সেই পাম্পই যেন দুর্ভোগের কারণ। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে কাউয়াদিঘি হাওরের বিস্তীর্ণ আউশ ও আমন ধানক্ষেত। কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি কমানো হলেও বিদ্যমান পাম্প দিয়ে দুই ফুট পানি নামাতেই সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। ফলে ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, রাজনগর ও সদর উপজেলা জুড়ে কাউয়াদিঘী হাওর। এই হাওরের পানি না কমায় ইতোমধ্যে হাওরের পাকা আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চলতি আমন মৌসুমে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হাওরে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পাম্প দিয়ে পানি নামতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। গত বোরো মৌসুমে এই পাম্প দিয়ে দ্রুত পানি না কমায় বেশিরভাগ কৃষকের ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।
মৌলভীবাজার কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নজুড়ে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত কাউয়াদিঘি হাওর। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মনু সেচ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৯৮০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। হাওরের উদ্বৃত্ত পানি কুশিয়ারা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য রাজনগরের কাশিমপুরে স্থাপন করা হয় আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হাওরের পানি নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিজমিকে আবাদযোগ্য রাখা।
কাউয়াদিঘী হাওরের কৃষকের জানান, হাওরের পানি দুই থেকে আড়াই ফুট কমানো সম্ভব হলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা যেত। এতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পানি না কমায় সেই সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চিত। কাশিমপুর পাম্পে ৮টি পাম্প রয়েছে এই পাম্প নিয়মিত চালানো হয় না। এরমধ্যে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে খুবই ধীরগতিতে পানি নিষ্কাশন হয়। এই পাম্পকে আরও অত্যাধনিক করা প্রয়োজন।
তারা আরও জানান, গত বোরো মৌসুমে এক-তৃতীয়াংশ ফসলও ঘরে তুলতে পারেননি। এবার আউশ ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে আমনের চারা রোপণের সময় পেরিয়ে গেলেও জমিতে পানি থাকায় চাষাবাদ শুরু করতে পারছেন না অনেক কৃষক।
রাজনগরের ফতেপুর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, আমি প্রায় দুই একর জমিতে আমনের চারা রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করেছি। কিন্তু সব জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন চারা রোপণই করা যাচ্ছে না।
রাজনগরের বালিগাঁও এলাকার বাসিন্দা তুহিন জুবায়ের বলেন, পুরো কাউয়াদিঘি হাওরের চারপাশে বাঁধ থাকায় পানি বেড়ে গেছে। হাওরের উপরাংশের বালিগাঁও, দুগাঁও, পৈতুরা, বাঙালিয়া, খলাগাঁও পশ্চিম, মিয়ারকান্দি এবং উত্তরভাগের কয়েকটি এলাকার হাজারের বেশি হেক্টর জমি এখন পানিতে তলিয়ে আছে। এসব এলাকা প্রকৃত অর্থে হাওর নয়। এখানকার জমি মূলত আমননির্ভর। ফলে জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকার কৃষকেরা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
হাওড় রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, কাউয়াদিঘি হাওরের বর্তমান সংকট সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। পাম্প নিয়মিত চালু থাকলে এভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না। দ্রুত দুই থেকে আড়াই ফুট পানি নামানো না গেলে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এতে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব খছরু চৌধুরী বলেন, একসময় হাওরের বিলে থাকা পানির স্তর নির্ধারণ স্কেলটি ২০০৪ সালে সরিয়ে পাম্প হাউজসংলগ্ন গভীর ক্যানেলে স্থাপন করা হয়। এর ফলে বর্ষা ও শীত উভয় মৌসুমেই পানি আটকে রেখে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। প্রতিবার একই সংকট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে হাওরের কৃষিব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়বে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, বর্তমানে হাওরের পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটার। পানির উচ্চতা সাড়ে আট মিটারের মধ্যে থাকার কথা। পাম্প হাউজের বর্তমান সক্ষমতায় দুই ফুট পানি কমাতে বৃষ্টিহীন অবস্থাতেও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, সরেজমিনে আউশের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশন এবং আমন চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মাহিদুল ইসলাম/এনএইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?
