আমাদের শরীর নিজে থেকেই ক্ষতিকর পদার্থ বা বর্জ্য পরিষ্কার করার শক্তিশালী ব্যবস্থা রাখে। কিন্তু উৎসবের সময় অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া, কম ঘুম বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে অনেকেই মনে করেন শরীর ডিটক্স করা দরকার।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ডিটক্স ডায়েট, জুস ফাস্ট বা বিশেষ পানীয় জনপ্রিয় হলেও গবেষণায় দেখা গেছে—এসব পদ্ধতির বেশিরভাগেরই শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করার কার্যকর প্রমাণ নেই। বরং শরীরের লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক প্রতিদিনই স্বাভাবিকভাবে এই কাজ করে থাকে।
তবে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে আরও ভালোভাবে সহায়তা করা যায়।
বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খান
বেশিরভাগ মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় কম আঁশ (ফাইবার) খান। অথচ আঁশ শরীর পরিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আঁশ মূলত পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়, অন্ত্রে ক্ষতিকর পদার্থ জমে থাকার সময় কমায়, কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আঁশ কিছু ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ শরীর থেকে বের হতে সাহায্য করতে পারে।
কী খাবেন: শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর, মটরশুঁটি, পালং শাক, ফল (আপেল, পেয়ারা), ওটস, লাল চাল, আটা রুটি, বাদাম ও বীজ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাল-ভাতের সঙ্গে শাকসবজি যোগ করলেই আঁশের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
পানি শরীরের বর্জ্য বের করার অন্যতম প্রধান উপাদান। কিডনি ও লিভার ঠিকভাবে কাজ করতে পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন।
পানি কম পান করলে:
শরীরে বর্জ্য জমতে পারে
কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে
কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
সাধারণভাবে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার পানি বেশিরভাগ মানুষের জন্য যথেষ্ট। চা, কফি, ডাল, ফল ও শাকসবজি থেকেও শরীর পানি পায়।
ফুসফুসকে সুস্থ রাখুন
কিছু পণ্য দাবি করে কয়েক দিনে ফুসফুস পরিষ্কার করে দেবে—বিশেষজ্ঞরা এসব দাবি থেকে সতর্ক থাকতে বলেন।
ফুসফুস ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—
ধূমপান ও ভ্যাপিং বন্ধ করা
ধোঁয়া ও দূষণ এড়িয়ে চলা
ঘরের ভেতরে অতিরিক্ত সুগন্ধি স্প্রে বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করা
নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা হালকা ব্যায়াম ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে পরিষ্কার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর সময় বিশেষ তরল মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ক্ষতিকর প্রোটিন ও বর্জ্য দূর করে।
ঘুম কম হলে—মনোযোগ কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় ও দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তির ক্ষতি হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, যদিও এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
নেকে মনে করেন ঘাম দিয়ে বিষ বের হয়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে—ঘাম মূলত শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য, বিষ বের করার জন্য নয়।
ব্যায়াম আসলে
- লিভার ও কিডনিতে রক্ত চলাচল বাড়ায়
- শরীরের চর্বি কমাতে সাহায্য করে
- বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা বাড়ায়
- হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানো, হালকা দৌড়, এমনকি গৃহস্থালি কাজও উপকারী। নিয়মিত নড়াচড়া করাই মূল কথা।
শরীরকে ডিটক্স করার জন্য ব্যয়বহুল ডায়েট বা চমকপ্রদ পণ্যের প্রয়োজন নেই। আমাদের শরীর নিজেই অত্যন্ত দক্ষভাবে এই কাজ করে থাকে। আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, পরিষ্কার বাতাস, ভালো ঘুম ও নিয়মিত ব্যায়াম—এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই শরীরকে সুস্থ ও পরিষ্কার রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই প্রকৃত সুস্থতার চাবিকাঠি। আজ থেকে ছোট ছোট ভালো অভ্যাস গড়ে তুললেই তার সুফল পাওয়া যাবে অনেক দিন ধরে।
সূত্র : BBC