কী কথা ছিল, আর কী হলো

দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের নিপীড়ন ও নির্যাতন সহ্য করতে করতে যখন জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকেছিল, তখন জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল অনিবার্য বিস্ফোরণ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল অপমানের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠা। আমার বিশ্বাস, দেশের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে স্বৈরাচার শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। কিন্তু সত্যটা কী? শাসক বদলেছে, নাকি শাসনের ধরন? মুখ বদলেছে, নাকি মানসিকতা? আমরা ভেবেছিলাম, এবার জনগণই হবে ক্ষমতার মালিক। আমরা ভেবেছিলাম, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে অন্য আয়না ধরেছে। জনগণ এখনো প্রান্তে, ক্ষমতা এখনো কেন্দ্রে। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। এই সংগ্রাম কার জন্য ছিল? রক্ত কার জন্য ঝরল? যখন তারেক রহমান দেশে ফিরে এসে বলেছিলেন, “I have plan”, সেটি ছিল প্রত্যাশার ঘোষণা। অনেকে ভেবেছিল, তিনি বলবেন, আমার বাবার স্বপ্ন, আমার মায়ের আদর্শ ধারণ করে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাই আমার পরিকল্পনা। আমরা সবাই মিলে একটি সোনার

কী কথা ছিল, আর কী হলো

দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের নিপীড়ন ও নির্যাতন সহ্য করতে করতে যখন জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকেছিল, তখন জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল অনিবার্য বিস্ফোরণ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল অপমানের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠা। আমার বিশ্বাস, দেশের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে স্বৈরাচার শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল।

কিন্তু সত্যটা কী?
শাসক বদলেছে, নাকি শাসনের ধরন?
মুখ বদলেছে, নাকি মানসিকতা?

আমরা ভেবেছিলাম, এবার জনগণই হবে ক্ষমতার মালিক। আমরা ভেবেছিলাম, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে অন্য আয়না ধরেছে। জনগণ এখনো প্রান্তে, ক্ষমতা এখনো কেন্দ্রে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
এই সংগ্রাম কার জন্য ছিল?
রক্ত কার জন্য ঝরল?

যখন তারেক রহমান দেশে ফিরে এসে বলেছিলেন, “I have plan”, সেটি ছিল প্রত্যাশার ঘোষণা। অনেকে ভেবেছিল, তিনি বলবেন, আমার বাবার স্বপ্ন, আমার মায়ের আদর্শ ধারণ করে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাই আমার পরিকল্পনা। আমরা সবাই মিলে একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ব।

কিন্তু সেই স্পষ্ট রূপরেখা কোথায়?
স্বপ্নে নয়, কাজে বিশ্বাসী হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাহলে কাজগুলো কোথায় দৃশ্যমান?

ক্ষমতার বিন্যাসের দিকে তাকান। সালাহউদ্দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। খলিলুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চট্টগ্রাম বন্দর আমীর খসরুর হাতে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিজের কাছে।

এটি কি রাষ্ট্রের ভারসাম্য, নাকি ক্ষমতার নিরাপত্তা বলয়?
এটি কি জনগণের আস্থা, নাকি ক্ষমতার স্থায়িত্বের হিসাব?

আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথের ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। পরে নতুন শপথবাক্য পাঠের মাধ্যমে তারেক রহমান ক্ষমতায় বসেছেন। আবার জুলাই সনদ বাতিল হয়েছে শপথ না পড়ার যুক্তিতে।

তাহলে বৈধতার মানদণ্ড আসলে কোনটি?
শপথ যদি বিতর্কিত হয়, ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়?
শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি থাকে, তবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা কোন যুক্তিতে অক্ষুণ্ণ থাকে?

তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে কি?
জনগণের রায় আবার নেওয়া হবে কি?

কারণ গণতন্ত্র কোনো একদিনের ঘটনা নয়। গণতন্ত্র হলো ধারাবাহিক জবাবদিহি।

আরেকটি প্রশ্ন এড়ানো যায় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, পরে ওসমান হাদীসহ আরও অনেকে জীবন হারিয়েছেন, দেশ দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসে জর্জরিত হয়েছে।

এই রক্তের দায় কার?
এই বিশৃঙ্খলার দায় কার?
ক্ষমতার পালাবদল কি রক্তের হিসাব মুছে দেয়?

ইতিহাস তা মেনে নেয় না। জনগণও নেবে না।

আমরা একটি শব্দ ব্যবহার করি, রাজাকার। ইতিহাসে এর অর্থ স্পষ্ট। কিন্তু আজ এটি কি কেবল অতীতের পরিচয়, নাকি একটি বর্তমান মানসিকতার প্রতিফলন?

যদি কেউ দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে, জনগণের ভোটাধিকার খর্ব করে, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে সেটি কোন মানসিকতা?
আর যদি কেউ সব দেখেও নীরব থাকে, ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে সত্য উচ্চারণ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে সেটি কি নিরপেক্ষতা, নাকি নৈতিক আত্মসমর্পণ?

রাজাকার কেবল ১৯৭১ সালের একটি পরিচয় নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। যখন জনগণকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যখন স্থিতিশীলতার নামে সত্য আড়াল করা হয়, যখন ঐক্যের নামে প্রশ্ন দমন করা হয়, তখন সেই মানসিকতা ফিরে আসে।

একটি জাতি তখনই বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছায়, যখন মানুষ সত্য জানে, তবু চুপ থাকে।

আমরা কবে মুক্ত হব?
যখন ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠান সবার আগে দেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেবে।
যখন প্রশাসন প্রমাণ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করবে।
যখন গণমাধ্যম ভয় ছাড়া সত্য প্রকাশ করবে।
যখন নাগরিক সুবিধাভোগী নয়, দায়িত্বশীল হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছে।
রাষ্ট্রকে দুর্বল করা অপরাধ। কিন্তু অন্যায় জেনেও নীরব থাকা আরও গভীর অপরাধ।

বাংলাদেশ আমাদের সবার।
যদি আমরা সত্যিই তা বিশ্বাস করি, তবে প্রশ্ন তোলা আমাদের দায়িত্ব। প্রমাণ দাবি করা আমাদের অধিকার। সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আমাদের অঙ্গীকার।

এখন শেষ প্রশ্নটি আর এড়ানো যায় না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৩ জিরো উদ্যোগে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতির যে অঙ্গীকার ছিল, তাঁর বিদায়ের মুহূর্তে কি তিন ক্ষেত্রেই ফলাফল দাঁড়াল শূন্য?

ইতিহাস অপেক্ষা করছে উত্তরটির জন্য।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow