কেমন নৌকার মাঝি মেসির কোচ স্কালোনি?

বাঁধভাঙা ঢেউ কীভাবে সামাল দিতে হয় তা জানা থাকে একজন দক্ষ মাঝির। ঠিক তেমনি একটি ফুটবল দলকে কীভাবে চালাতে হয় তার জন্য দরকার একজন বিচক্ষণ গুরুর। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সেই গুরু হলেন লিওনেল স্কালোনি। মাঠে লিওনেল মেসির জাদু যেমন কোটি ফুটবলপ্রেমীককে মোহিত করে, তেমনি মাঠের বাইরে শান্ত, ধীরস্থির ও কৌশলী লিওনেল স্কালোনিকে দেখেও অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। জয়ী হওয়ার জন্য এমন অভিভাবকই তো চাই আমরা। একসময় আর্জেন্টিনা ছিল প্রতিভাবানদের মিলনমেলা, কিন্তু বড় টুর্নামেন্টের শেষ ধাপে এসে বারবার ব্যর্থ হওয়ার গল্প যেন শেষ হতোই না। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল, পরপর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনাল, সবখান থেকেই হতাশ হয়ে ফিরতো তারা। সেই দলটির মানসিকতা বদলে দিয়েছেন কোচ স্কালোনি। দলের মধ্যে তৈরি করেছেন আত্মবিশ্বাস, ঐক্য আর বিশ্বাসের এক অনন্য সংস্কৃতি। তার কাঁধে ভর করেই আর্জেন্টিনা ৩৬ বছরের বিশ্বকাপের খরা কাটিয়ে ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সোনালি ট্রফি কেড়ে নেয়। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ, কয়েক বছরের ব্যবধানে একের পর এক সাফল্যে স্কালোনি নিজেকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে

কেমন নৌকার মাঝি মেসির কোচ স্কালোনি?

বাঁধভাঙা ঢেউ কীভাবে সামাল দিতে হয় তা জানা থাকে একজন দক্ষ মাঝির। ঠিক তেমনি একটি ফুটবল দলকে কীভাবে চালাতে হয় তার জন্য দরকার একজন বিচক্ষণ গুরুর। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সেই গুরু হলেন লিওনেল স্কালোনি। মাঠে লিওনেল মেসির জাদু যেমন কোটি ফুটবলপ্রেমীককে মোহিত করে, তেমনি মাঠের বাইরে শান্ত, ধীরস্থির ও কৌশলী লিওনেল স্কালোনিকে দেখেও অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। জয়ী হওয়ার জন্য এমন অভিভাবকই তো চাই আমরা।

একসময় আর্জেন্টিনা ছিল প্রতিভাবানদের মিলনমেলা, কিন্তু বড় টুর্নামেন্টের শেষ ধাপে এসে বারবার ব্যর্থ হওয়ার গল্প যেন শেষ হতোই না। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল, পরপর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনাল, সবখান থেকেই হতাশ হয়ে ফিরতো তারা। সেই দলটির মানসিকতা বদলে দিয়েছেন কোচ স্কালোনি। দলের মধ্যে তৈরি করেছেন আত্মবিশ্বাস, ঐক্য আর বিশ্বাসের এক অনন্য সংস্কৃতি।

তার কাঁধে ভর করেই আর্জেন্টিনা ৩৬ বছরের বিশ্বকাপের খরা কাটিয়ে ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সোনালি ট্রফি কেড়ে নেয়। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ, কয়েক বছরের ব্যবধানে একের পর এক সাফল্যে স্কালোনি নিজেকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ৪৮ বছর বয়সী স্কালোনির যেন কোচ হিসেবে গুণের শেষ নেই।

কেমন নৌকার মাঝি মেসির কোচ স্কালোনি?

এবারও ইতিহাস হাতছানি দিচ্ছে। ১২ জুলাই শ্বাসরুদ্ধকর এক লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। অন্যদিকে, নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে ইংল্যান্ড। আটলান্টায় বুধবার (১৫ জুলাই) মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই ফুটবল পরাশক্তি।

এই ম্যাচটি শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়। স্কালোনির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরও বড় এক ইতিহাস। ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার সামনে। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন স্কালোনির কাঁধে।

তবে রাজনীতির ইতিহাসের চাপ যেন তাকে স্পর্শই করতে পারে না। বরাবরের মতোই শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ফুটবল ম্যাচ। ব্যস, এটুকুই। এর বাইরে আর কিছুই নেই। এর মধ্যে অন্য কিছু খোঁজার চেষ্টা না করাই ভালো। আমরা একটি দুর্দান্ত দলের বিরুদ্ধে খেলতে যাচ্ছি, যাদের একজন দারুণ কোচ আছেন। তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি এবং সম্মান করি।’ এই কয়েকটি বাক্যেই যেন ফুটে ওঠে স্কালোনির ব্যক্তিত্ব। তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চান না। প্রতিপক্ষকে ছোট করেন না। অহংকারে বিশ্বাসী নন। তার কাছে ফুটবল মানে পরিকল্পনা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং দলগত ঐক্য।

অনেকের মুখে একটি কথা শোনা যায় মেসি না থাকলে আর্জেন্টিনা কিছুই না। কিন্তু স্কালোনির আর্জেন্টিনা সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। মেসি এখনও দলের প্রাণ। কিন্তু তার পাশাপাশি হুলিয়ান আলভারেজ, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল কিংবা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, প্রত্যেকেই ভালো পারফর্মার।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিই তার বড় উদাহরণ। মেসি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে অন্য খেলোয়াড়রাও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আলভারেজের দৌড়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা-সব মিলিয়ে বোঝা গেছে, এই আর্জেন্টিনা শুধু একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটাই স্কালোনির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

কেমন নৌকার মাঝি মেসির কোচ স্কালোনি?

মাঠের পাশে গাঢ় নীল পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে কখনো বোঝার উপায় নেই তিনি কতটা চাপের মধ্যে আছেন। খেলার ৯০ মিনিট জুড়ে তিনি ধৈর্য ধরে খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দেন। প্রতিপক্ষ গোল করলে মুখে উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠলেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেন। অযথা চিৎকার বা নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি তার স্বভাবে নেই। ম্যাচ শেষে জয় এলেও তাকে খুব বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় না। বরং খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন, আলিঙ্গন কিংবা শান্ত হাসিতেই সীমাবদ্ধ থাকে তার উদযাপন। যেন তিনি জানেন, একটি ম্যাচ শেষ মানেই পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু।

লিওনেল মেসিকে নিয়ে স্কালোনির দৃষ্টিভঙ্গিও ব্যতিক্রম। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মেসি। ৩৯ বছর বয়স তার জন্য কেবল একটি সংখ্যা। যতদিন মেসি খেলতে চাইবেন, ততদিন তিনি বিশ্বসেরাদের একজন হিসেবেই থাকবেন। স্কালোনি বিশ্বাস করেন, যেদিন মেসি বুটজোড়া তুলে রাখবেন, সেদিন ফুটবলই একজন অসাধারণ শিল্পীকে হারাবে।

এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া চারটি দলই অতীতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর্জেন্টিনা তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে এবং এবার চতুর্থ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ ১৯৬৬ সালে। স্পেন ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। আর ফ্রান্সের ঘরে রয়েছে দুটি বিশ্বকাপ-১৯৯৮ ও ২০১৮।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফি নয়। তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে কোনো খেলোয়াড় নিজেকে দলের চেয়ে বড় মনে করেন না। যেখানে সবাই জানেন নিজের ভূমিকা। যেখানে পরাজয়ের ভয় নয়, জয়ের বিশ্বাস কাজ করে।

এই বিশ্বাসই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত রেখেছে। এই বিশ্বাসই দলটিকে প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। আর এই মানসিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারিগর লিওনেল স্কালোনি।

এখন সামনে ইংল্যান্ড। এরপর হয়তো ফাইনাল। তারপর হয়তো আরও একটি সোনালি ট্রফি। সব বাধা পেরিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখা কঠিনই বটে। তবে যদি কেউ এই উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো দক্ষ মাঝি হয়ে থাকেন, তবে তিনি লিওনেল স্কালোনি। আর তাই কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের বিশ্বাস-ঝড় যতই আসুক, এই নৌকার মাঝি জানেন কীভাবে ঢেউ সামলে কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।

[মতামত লেখকের নিজস্ব]

এসএনআর/আইএন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow