কোটার বদলে ‘দলীয় কোটা’: আনুগত্যের বেদিতে এখনো মেধার বলিদান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। সর্বস্তরের মানুষ, এমনকি সদ্য-পতিত সরকারের অনেক সাধারণ সমর্থক এবং তাদের পরিবারও এই যৌক্তিক প্রতিবাদে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনরোষ এবং ছাত্র-জনতার সাহসিকতার কারণে সে সময়ের সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। জনগণের কথা শোনার বদলে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়ায় চূড়ান্তভাবে তাদের পতন ঘটে। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম এক নতুন বাংলাদেশের। এরপর রাষ্ট্র মেরামতের আশায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। অনেকেই, আমার মতো, ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছিলেন তারা অন্তত কয়েক বছর দেশ পরিচালনা করে একটি স্থিতিশীল নতুন কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দিক। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানেই সেই আশা গভীর হতাশায় রূপ নিতে শুরু করে। কাঠামোগত পরিবর্তনের যে স্বপ্ন জাতি দেখেছিল, তা যেন বাস্তবতার কাছে মার খেতে থাকে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু আজ একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে: এত রক্তপাত ও ত্যাগের মূল লক্ষ্য কি আদৌ অর্জিত হয়েছে? ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন রোধ করার অনেক কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবে কতজন মেধাবী দেশে ফিরে

কোটার বদলে ‘দলীয় কোটা’: আনুগত্যের বেদিতে এখনো মেধার বলিদান
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। সর্বস্তরের মানুষ, এমনকি সদ্য-পতিত সরকারের অনেক সাধারণ সমর্থক এবং তাদের পরিবারও এই যৌক্তিক প্রতিবাদে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনরোষ এবং ছাত্র-জনতার সাহসিকতার কারণে সে সময়ের সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। জনগণের কথা শোনার বদলে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়ায় চূড়ান্তভাবে তাদের পতন ঘটে। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম এক নতুন বাংলাদেশের। এরপর রাষ্ট্র মেরামতের আশায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। অনেকেই, আমার মতো, ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছিলেন তারা অন্তত কয়েক বছর দেশ পরিচালনা করে একটি স্থিতিশীল নতুন কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দিক। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানেই সেই আশা গভীর হতাশায় রূপ নিতে শুরু করে। কাঠামোগত পরিবর্তনের যে স্বপ্ন জাতি দেখেছিল, তা যেন বাস্তবতার কাছে মার খেতে থাকে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু আজ একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে: এত রক্তপাত ও ত্যাগের মূল লক্ষ্য কি আদৌ অর্জিত হয়েছে? ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন রোধ করার অনেক কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবে কতজন মেধাবী দেশে ফিরেছেন বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে জায়গা পেয়েছেন? যে গুটিকয়েক মানুষ বড় পদে বসেছেন, তাদের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা নির্দিষ্ট মতাদর্শই যেন বড় যোগ্যতা হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কি সত্যিই বন্ধ হয়েছে? চাঁদাবাজি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম-এগুলোর কি কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে? আমরা কি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারব্যবস্থা পেয়েছি? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে উত্তরটা আমাদের সবারই জানা। ‘কোটার চেয়ে মেধা বড়’, এটিই ছিল জুলাই আন্দোলনের প্রধান স্লোগান। কিন্তু আজ কোথায় সেই স্লোগান? জেলখাটা, রাজপথে মার খাওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করাই যদি রাষ্ট্রের শীর্ষ পদগুলো পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তবে বলতে হয় আমরা কেবল ক্ষমতার হাতবদলই দেখেছি। পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোটাপ্রথা বাতিল হয়ে এখন যেন অলিখিত এক ‘দলীয় ত্যাগের কোটা’ চালু হয়েছে। আগে যখন দলীয়করণ করা হতো, সরকারগুলো অন্তত কিছুটা ধামাচাপা দেওয়ার বা রাখঢাক করার চেষ্টা করত। কিন্তু এখন সেই রাখঢাকও যেন উধাও, সবকিছুই চলছে একেবারে খুল্লমখুল্লা! মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্য, দেশের চেয়ে দল, আর সাধারণ মানুষের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মীরা যদি অগ্রাধিকার পায়, তবে সুশাসন চিরকালই অধরা থেকে যাবে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, অন্ধ আনুগত্যের কারণে অনেক অযোগ্য মানুষ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছিলেন, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদলে মুখগুলোর পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চর্চার কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? নতুন সরকারও যদি আগের মতোই দলীয় মনোভাবাপন্ন মানুষদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পদগুলোতে বসায়, তাহলে পার্থক্যটা কোথায় রইল? যে কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর দিকেই তাকালে দেখা যায়, নিজেদের মতাদর্শের বা বলয়ের বাইরের কাউকে তারা সহজে জায়গা দিতে চায় না। কেবল রাজনৈতিক তোষামোদের কারণে যোগ্যতার বিচার না করেই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করার এই সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। অতীত থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপট বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন একই বৃত্তে আটকে আছে। সত্যি বলতে, আমাদের মানসিকতায় আমরা যেন এখনো সেই পুরোনো পথেই হাঁটছি। ক্ষমতার হাতবদল হয় ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের যে আসল রূপ, তা বদলাতে আমরা এখনো ব্যর্থ। লেখক: পিএইচডি গবেষক, সাইবারস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow