ক্যানেলে বর্জ্য, খাবারে ছাই, নিশ্বাসে রাইস মিলের ধোঁয়া

কুষ্টিয়ার খাজানগর-কুবুরহাট এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় তিন শতাধিক অটো ও হাসকিং রাইস মিলের দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। মিল থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, উড়ন্ত ছাই এবং দূষিত বর্জ্যে পরিবেশের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ সেচব্যবস্থা জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) ক্যানেল। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর তদারকির অভাব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের নজরদারির ঘাটতিতে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। স্থানীয়দের দাবি, মিলগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই আশপাশের এলাকা দূষিত থাকে। খাবারের প্লেট, টেবিল, উঠান, এমনকি শোবার ঘরেও ছাইয়ের আস্তরণ পড়ে। সামান্য বাতাসেই চোখ-মুখে ছাইয়ের কণা ঢুকে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এলাকাবাসী। ছাড়পত্র-অনুমোদনে গরমিল জানা গেছে, সদর উপজেলার কদমতলা, কবুরহাট, খাজানগর, আইলচারা ও পোড়াদহ এলাকায় গড়ে ওঠা অধিকাংশ অটোরাইস মিল পরিবেশ অধিদপ্তরের শর্ত যথাযথভাবে মানছে না। জেলার ৬০টির বেশি অটোরাইস মিলের মধ্যে অন্তত ১০টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং আরও ২৫ থেকে ৩০টির ছাড়পত্র নবায়ন হয়নি। এ

ক্যানেলে বর্জ্য, খাবারে ছাই, নিশ্বাসে রাইস মিলের ধোঁয়া

কুষ্টিয়ার খাজানগর-কুবুরহাট এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় তিন শতাধিক অটো ও হাসকিং রাইস মিলের দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। মিল থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, উড়ন্ত ছাই এবং দূষিত বর্জ্যে পরিবেশের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ সেচব্যবস্থা জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) ক্যানেল। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর তদারকির অভাব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের নজরদারির ঘাটতিতে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের দাবি, মিলগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই আশপাশের এলাকা দূষিত থাকে। খাবারের প্লেট, টেবিল, উঠান, এমনকি শোবার ঘরেও ছাইয়ের আস্তরণ পড়ে। সামান্য বাতাসেই চোখ-মুখে ছাইয়ের কণা ঢুকে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এলাকাবাসী।

ছাড়পত্র-অনুমোদনে গরমিল

জানা গেছে, সদর উপজেলার কদমতলা, কবুরহাট, খাজানগর, আইলচারা ও পোড়াদহ এলাকায় গড়ে ওঠা অধিকাংশ অটোরাইস মিল পরিবেশ অধিদপ্তরের শর্ত যথাযথভাবে মানছে না। জেলার ৬০টির বেশি অটোরাইস মিলের মধ্যে অন্তত ১০টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং আরও ২৫ থেকে ৩০টির ছাড়পত্র নবায়ন হয়নি। এছাড়া প্রায় ২৫০টি হাসকিং মিলের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভোগান্তিতে স্থানীয়রা

খাজানগর এলাকার বাসিন্দা শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘রান্না করার আগেই তরকারি ও খাবারের ওপর ছাই পড়ে যায়। টেবিলে ভাত রেখে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে ছাই জমে যায়। এমনকি খাবার পানিতেও ছাই পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই কষ্ট সহ্য করছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

‘রান্না করার আগেই তরকারি ও খাবারের ওপর ছাই পড়ে যায়। টেবিলে ভাত রেখে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে ছাই জমে যায়। এমনকি খাবার পানিতেও ছাই পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই কষ্ট সহ্য করছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘সনি-৮, দাদা রাইস মিল, সুবর্ণ, হযরত হাসকিং মিলসহ একাধিক মিল বছরের পর বছর এলাকা দূষিত করছে। তারা বাতাসে ছাই উড়িয়ে দেয় এবং মিলের বর্জ্য সরাসরি জিকে ক্যানেলে ফেলে।’

এদিকে উড়ন্ত ছাইয়ের কারণে প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। খাজানগর এলাকার শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার মুন্নী জানান, চোখে ছাইয়ের কণা ঢুকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু এখনও পুরোপুরি সুস্থ হননি।

তিনি বলেন, ‘একটু বাতাস হলেই চোখ-মুখে ছাই ঢুকে যায়। বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।’

দূষণের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও

মিলগুলোর বর্জ্য ও দূষিত পানি সরাসরি জিকে ক্যানেলে ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে সেই পানি কৃষিজমিতে গিয়ে মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘মিল থেকে আসা দূষিত পানি মাঠে গিয়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। আগের তুলনায় কীটনাশক বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে, কিন্তু ফলন কমে যাচ্ছে। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মিলগুলোর বর্জ্যে জিকে ক্যানেলের পানি দূষিত হয়ে অনেক স্থানে কালো রং ধারণ করেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

‘মিল থেকে আসা দূষিত পানি মাঠে গিয়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। আগের তুলনায় কীটনাশক বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে, কিন্তু ফলন কমে যাচ্ছে। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

সচেতন নাগরিক নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক মিল মালিক দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

যা বলছেন মিল মালিকরা

অভিযোগের বিষয়ে দাদা রাইস মিলের মালিক হাজী আরশাদ আলী বলেন, পরিস্থিতি যেমন আছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। এ বিষয়ে সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।

আহাদ এগ্রোফুডের পরিচালক আহাদ বলেন, ‘অভিযোগ কেউ করতেই পারে। অন্য মিলে কী হয় জানি না, তবে আমাদের মিল থেকে ছাই ওড়ানো হয় না।’

কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়নাল আবেদিন পরিবেশ দূষণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় আমরা মিল মালিকরা বসে দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেব।’

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান জানান, জিকে ক্যানেল রক্ষায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় আইনগত সহযোগিতা চেয়ে অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইমদাদুল হক বলেন, পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মবহির্ভূত রাইস মিলগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জিকে ক্যানেলকে দূষণমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow