ক্ষতির মুখে সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটে এবার ঈদুল আযহার ছুটিতেও জমেনি পর্যটনকেন্দ্রগুলো। যদিও সড়ক যোগাযোগ ভালো থাকায় কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর ও উৎমাছড়ায় কিছুটা পর্যটকের উপস্থিতি ছিল। তবে শতকোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট ও স্থানীয় ব্যবসায়ী; তথা পর্যটন শিল্প। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটক আকৃষ্ট করতে এবার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুরবস্থা, সীমান্তে উত্তেজনা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পর্যটকরা সিলেটমুখী হননি। প্রতি বছর বর্ষার আগমনে পাহাড়, নদী, ঝরনা ও চা-বাগানের অপরূপ সৌন্দর্যে সাজে পর্যটননগরী সিলেট। ঈদুল আযহার দীর্ঘ ছুটি, বর্ষার মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি এবং পর্যটনের ভরা মৌসুম; সব মিলিয়ে পর্যটকদের ঢল নামার প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। ঈদের চারদিনেও সিলেটের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে দেখা যায়নি কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের উপস্থিতি। ফলে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নৌকা ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পড়েছেন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে। জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল, ভো

ক্ষতির মুখে সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটে এবার ঈদুল আযহার ছুটিতেও জমেনি পর্যটনকেন্দ্রগুলো। যদিও সড়ক যোগাযোগ ভালো থাকায় কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর ও উৎমাছড়ায় কিছুটা পর্যটকের উপস্থিতি ছিল। তবে শতকোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে সিলেটের হোটেল-রিসোর্ট ও স্থানীয় ব্যবসায়ী; তথা পর্যটন শিল্প।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটক আকৃষ্ট করতে এবার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুরবস্থা, সীমান্তে উত্তেজনা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পর্যটকরা সিলেটমুখী হননি।

প্রতি বছর বর্ষার আগমনে পাহাড়, নদী, ঝরনা ও চা-বাগানের অপরূপ সৌন্দর্যে সাজে পর্যটননগরী সিলেট। ঈদুল আযহার দীর্ঘ ছুটি, বর্ষার মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি এবং পর্যটনের ভরা মৌসুম; সব মিলিয়ে পর্যটকদের ঢল নামার প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। ঈদের চারদিনেও সিলেটের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে দেখা যায়নি কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের উপস্থিতি। ফলে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নৌকা ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পড়েছেন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে।

জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর, লাক্কাতুরা ও মালনীছড়াসহ জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় পর্যটকের সংখ্যা ছিল গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম। যেখানে ঈদের মৌসুমে পর্যটকদের সামলাতে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এবার অনেক পর্যটন স্পটই ছিল প্রায় ফাঁকা।

দৃষ্টিনন্দন লাক্কাতুরা চা-বাগান, কালাগুল, গুর্জন, বাইশটিলা ও খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে সাদাপাথর ও উৎমাছড়ার মতো মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পট। জৈন্তাপুরে রয়েছে লালাখাল, ডিবির হাওর ও শ্রীপুর। আর গোয়াইনঘাটে রয়েছে জাফলং, রাতারগুল, পান্তুমাই ও বিছানাকান্দি।

সিলেটের অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার খাত পর্যটন। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, ঈদ উপলক্ষে শত কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পর্যটক সমাগম না হওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট এবং নগরীর লাক্কাতুরা, মালনীছড়া ও তারাপুর চা-বাগানে কিছু দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখা গেলেও জাফলং, বিছানাকান্দি ও সাদাপাথরের মতো জনপ্রিয় স্পটগুলো ছিল তুলনামূলক ফাঁকা।

সিলেটের পর্যটন খাত শুধু ভ্রমণনির্ভর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। নৌকার মাঝি, হোটেল কর্মচারী, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র দোকানদার, গাইড, আলোকচিত্রী ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিছানাকান্দি পর্যটন ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন কালবেলাকে বলেন, ঈদের চতুর্থ দিনেও সারাদিনে মাত্র পাঁচ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য বছর ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, বর্ষাকালে সাদাপাথরের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু এবার পর্যটকরা কম আসছেন।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটক কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুরবস্থা এবং ট্রেনের টিকিট সংকট।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যাতায়াত ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, কোরবানিকেন্দ্রিক অতিরিক্ত খরচ এবং টানা বৃষ্টিপাতের কারণে অনেকেই এবার ঈদের ছুটিতে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। পাশাপাশি কিছু পর্যটনকেন্দ্রের সড়কের বেহাল অবস্থাও পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

জাফলংয়ের নৌকা মাঝি আব্দুল মালেক বলেন, গত ঈদে এই সময়ে পর্যটকের চাপ সামলাতে কষ্ট হতো। এবার মানুষ অনেক কম। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেকে আসতে ভয় পাচ্ছেন।

সাদাপাথরের নৌকার মাঝি সোহেল মিয়া বলেন, পর্যটক কম থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নৌকার মাঝি, ছোট দোকানদার ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আগে দিনে কয়েকবার ট্রিপ দিতে হতো, এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে।

সিলেট নগরীর আম্বরখানার হোটেল শেরাটনের ব্যবস্থাপক সুজন মিয়া বলেন, ঈদের পাঁচ দিনের ছুটি হলেও রুম বুকিং আশানুরূপ হয়নি।

সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও হোটেল স্টার প্যাসিফিকের পরিচালক সালেহীন এফ নাহিয়ান বলেন, সিলেটের পর্যটন ও ব্যবসায়িক খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুরবস্থা পর্যটন শিল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতির শহর হিসেবে সিলেটে আধুনিক সড়ক ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, কক্সবাজারের তুলনায় সিলেটের দূরত্ব কম হলেও অনেক সময় পরিবহন ভাড়া বেশি থাকে, যা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। একই সঙ্গে পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তা, আলোকসজ্জা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

হোটেল ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানান, এবারের ঈদে হোটেলগুলোর দখল হার ৪০ শতাংশেরও কম ছিল। পর্যটক কম আসায় হোটেল খাত প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন বলেন, এবার পর্যটক কম আসার প্রধান কারণ রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা ও চলমান সংস্কারকাজ। ভোগান্তির আশঙ্কায় অনেকেই ভ্রমণ থেকে বিরত থেকেছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাশ্মীর রেজা বলেন, যাতায়াত সংকট, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং পরিবেশের অবনতি পর্যটক কমে যাওয়ার বড় কারণ। ট্রেনের টিকিট সংকট, বিমানের উচ্চ ভাড়া এবং সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে অনেক পর্যটক ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পর্যটন এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে সাদাপাথরসহ কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিন মিয়া বলেন, এবার সাদাপাথর ও উৎমাছড়ায় প্রচুর পর্যটক ছিল। রাস্তা ভালো থাকায় সেখানে মানুষের ঢল নেমেছিল।

সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, গত ঈদুল ফিতরে সিলেটে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটেছিল। তবে কোরবানির ঈদে সাধারণত পর্যটক কম আসে, কারণ এ সময় মানুষ পারিবারিক ও ধর্মীয় ব্যস্ততায় থাকেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চলমান উন্নয়নকাজের কারণে যাতায়াতে বেশি সময় লাগছে, যা পর্যটনের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে সড়ক উন্নয়নকাজ শেষ হলে পর্যটক সমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

পর্যটকদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করা উচিত নয়।

বিমান ভাড়া ও ট্রেনের টিকিট সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিমান ভাড়া কমানো কঠিন হলেও পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভাড়া সহনীয় রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow