খাগড়াছড়িতে নিম্নমানের চাল বিতরণ, ৩ মাস অন্তর ৮ কোটির বানিজ্য

খাগড়াছড়ি জেলার ৮১টি গুচ্ছগ্রামের ২৬ হাজার ২২০ জন রেশনকার্ডধারীর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের খাদ্যশস্য বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি মাসে কার্ডপ্রতি ৩৫.৯৫ কেজি চাল ও ৪৯.১০ কেজি গম দেওয়া হয়। সে হিসাবে তিন মাসে প্রতিটি কার্ডের জন্য ১০৭.৮৫ কেজি চাল এবং ১৪৭.৫০ কেজি গম বরাদ্দ রয়েছে। তবে এই খাদ্যশস্য বিতরণে নানা অনিয়ম, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগর ভিত্তিতে বুধবার জেলার পানছড়ি উপজেলায় রেশন বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। বাঙ্গালী গুচ্ছগ্রামের এসব কার্ডধারীরা সিদ্ধ চাউল খেয়ে থাকেন। কিন্তু ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে জোর করে তাদের উপর আতপ চাউল এবং গমের বরাদ্দ চাপিয়ে দিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। প্রায় ১ দশকেরও বেশি সময় ধরে গুচ্ছগ্রামের অসহায় মানুষদের সাথে এ অনিয়ম হয়ে আসছে। রেশন বিতরণের আগে কারিগরি কর্মকর্তার মাধ্যমে খাদ্যশস্যের গুণগত মান যাচাই করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে একজন ট্যাগ অফিসারের সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা ঠিকমতো দা

খাগড়াছড়িতে নিম্নমানের চাল বিতরণ, ৩ মাস অন্তর ৮ কোটির বানিজ্য

খাগড়াছড়ি জেলার ৮১টি গুচ্ছগ্রামের ২৬ হাজার ২২০ জন রেশনকার্ডধারীর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের খাদ্যশস্য বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি মাসে কার্ডপ্রতি ৩৫.৯৫ কেজি চাল ও ৪৯.১০ কেজি গম দেওয়া হয়। সে হিসাবে তিন মাসে প্রতিটি কার্ডের জন্য ১০৭.৮৫ কেজি চাল এবং ১৪৭.৫০ কেজি গম বরাদ্দ রয়েছে। তবে এই খাদ্যশস্য বিতরণে নানা অনিয়ম, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগর ভিত্তিতে বুধবার জেলার পানছড়ি উপজেলায় রেশন বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় উপজেলা প্রশাসন।

বাঙ্গালী গুচ্ছগ্রামের এসব কার্ডধারীরা সিদ্ধ চাউল খেয়ে থাকেন। কিন্তু ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে জোর করে তাদের উপর আতপ চাউল এবং গমের বরাদ্দ চাপিয়ে দিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। প্রায় ১ দশকেরও বেশি সময় ধরে গুচ্ছগ্রামের অসহায় মানুষদের সাথে এ অনিয়ম হয়ে আসছে।

রেশন বিতরণের আগে কারিগরি কর্মকর্তার মাধ্যমে খাদ্যশস্যের গুণগত মান যাচাই করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে একজন ট্যাগ অফিসারের সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না। ফলে রেশনকার্ডধারী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৬ হাজার ২২০টি রেশনকার্ডের বিপরীতে তিন মাসে মোট ২ হাজার ৮২৮ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ হাজার ৮৬২ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গমের সংকট দেখিয়ে ১ কেজির বদলে ৭৯০ গ্রাম আতপ চাউল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে খাদ্যশস্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সিন্ডিকেটের আর্থিক লাভের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেশন বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটে স্থানীয় ডিলার, পরিবহন ঠিকাদার, কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তা এবং খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ভালো মানের খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নিম্নমানের চাল বা গম বিতরণ এবং বিভিন্ন অজুহাতে খাদ্যশস্য কম দেওয়া। বিশেষ করে ভাল খাদ্যশস্য পরিবর্তনের এই অনিয়মে বড় ভূমিকা রাখার অভিযোগ জেলা-উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

গুচ্ছগ্রামবাসীরা জানান, তারা সাধারণত সিদ্ধ চাল খেতে অভ্যস্ত হলেও রেশনে দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের আতপ চাল। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন। স্থানীয় বাজারে যেখানে চালের দাম প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, সেখানে রেশন থেকে পাওয়া চাল ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছেন ৩২ থেকে ৩৫ টাকায়। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৪-১৫ টাকা পর্যন্ত মুনাফা লুফে নিচ্ছে একটি শক্তিশালী বাজারচক্র। প্রতি কেজি চাউলে ১৫ টাকা ধরে মুনাফা হলে ২৬ হাজার ২২০টি রেশন কার্ড অনুযায়ী মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। যা ৩ মাস অন্তর অন্তর অনিয়মের মাধ্যমে এ মুনাফা জায়গায় হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেটটি।

স্থানীয়দের মতে, গুচ্ছগ্রামের রেশনকে কেন্দ্র করে একটি অপ্রকাশ্য বাজারচক্র গড়ে উঠেছে। প্রথম ধাপে নিম্নমানের খাদ্যশস্য পেয়ে অনেক পরিবার তা বিক্রি করে দেয়। দ্বিতীয় ধাপে ব্যবসায়ীরা কম দামে সেই খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে মজুত রাখে। তৃতীয় ধাপে তা পরিষ্কার বা শুকিয়ে বাজারে পুনরায় বিক্রি করা হয়। এতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য হাতবদল হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরের কুমিল্লা টিলা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, “আগে আমরা প্রতি কার্ডে প্রায় ৮৬ কেজি করে সিদ্ধ চাল পেতাম। এখন যে চাল দেওয়া হয় তা আতপ চাউল। এগুলো এত নিম্নমানের যে খাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়। অনেক সময় গমের বরাদ্দ থাকলেও বলা হয় গম নেই। আমরা আতপ চাউল ও গম চাইনা, আমরা সিদ্ধ চাউল খেতে চাই।"

রেশন বিতরণের সময় ট্যাগ অফিসাররা সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকার নিয়ম থাকলেও তারা থাকছেন না। দীঘিনালার রশিকনগর (পূর্ব) গুচ্ছগ্রামের ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত দীঘিনালা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা জানান, তিনি একটি কাজে মেরুং যাচ্ছেন। তিনি উপস্থিত না থাকলেও ঠিকমতো রেশন বিতরণ হচ্ছে বলে জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি কারিগরি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মীর মোহাম্মদ সেলিম বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন এবং এখনো কোনো খাদ্যগুদাম পরিদর্শন করতে পারেননি। আর সাবেক কারিগরি কর্মকর্তা ভুবতি বিকাশ চাকমা জানান, তিনি কিছুদিন আগে অবসরে গিয়েছেন। অবসরের আগে দীর্ঘ সময় তিনি খাদ্যগুদামের খাদ্যের মান যাচাই করতে পারেননি। বর্তমানে যে রেশন বিতরণ করা হচ্ছে সেগুলোর খাদ্যগুদামের চাউলের গুণগত মান যাচাই করা হয়নি। কিভাবে তা বিতরণ করা হচ্ছে তা তিনি জানেন না।"

এদিকে রেশন বিতরণে অনিয়ম বন্ধে ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন গুচ্ছগ্রামবাসী। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- পূর্বের মতো প্রতি কার্ডে ৮৬ কেজি সিদ্ধ চাল পুনর্বহাল, গমের বরাদ্দ বাতিল, নিম্নমানের খাদ্যশস্য বিতরণ বন্ধ, রেশন বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।

খাগড়াছড়ি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জ্ঞান প্রিয় বিদূর্শী চাকিমা বলেন, “ঢাকা থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আমরা সে অনুযায়ী বিতরণ করছি। আমি অসুস্থ থাকায় বাহিরে আছি। পরে কথা বলব।"

অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, গুচ্ছগ্রামের রেশন বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গুচ্ছগ্রামের কার্ডধারীদের জন্য আতপ চাল ও গমের পরিবর্তে সিদ্ধ চাল সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow