দিনাজপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বয়স্ক এক নারী সেদিন চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, বাবার মতোই ছেলে খাল কাটছে। কথাটা শুনতে সরল, কিন্তু ভেতরে এক গভীর আবেগ লুকিয়ে আছে। পাঁচ দশক আগে যে সাহাপাড়া খালের পাড়ে কোদাল হাতে নামা হয়েছিল, সেই একই মাটিতে দাঁড়িয়ে গত ১৬ মার্চ দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন হলো। ইতিহাস কখনো কখনো এভাবেই নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে; শুধু পোশাক পাল্টায়, চরিত্র বদলায় না।
পাঁচ দশক আগে যখন খাল কাটার ডাক দেওয়া হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ ছিল এক ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ। কৃষিজমিতে বছরে একটিমাত্র ফসল হতো, বর্ষায় মাঠ ডুবে যেত, খরায় মাটি ফেটে চৌচির হতো। সেই কর্মসূচিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাইল খাল খনন ও পুনঃখনন হয়েছিল। সেচ সুবিধা পেয়ে কৃষক একাধিক ফসল ফলাতে পারলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ল, ইতিহাস সেটাকে সবুজ বিপ্লব বলে মনে রেখেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই সফল উদ্যোগের পরও কেন আজ আবার নতুন করে একই কাজ করতে হচ্ছে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে অবহেলা আর দখলদারিত্বের দীর্ঘ ইতিহাসে। একসময় যে খালগুলো প্রাণ পেয়েছিল, দশকের পর দশক ধরে সেগুলো আবার ভরাট হয়ে গেছে, বেদখল হয়ে গেছে, শুকিয়ে গেছে। সাহাপাড়া খালই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এখন সেখানে গেলে প্রথম দেখায় মনে হবে এটা খাল নয়, এবড়োখেবড়ো মাটির স্তূপ। পানি শুকিয়ে গেছে, বর্ষায়ও আগের মতো প্রবাহ নেই, ফলে জলাবদ্ধতায় ভোগে এলাকার মানুষ। স্থানীয় এক গৃহবধূর কণ্ঠে তাই সেই হাহাকার, এই খাল আমাদের দুঃখ।
এই দুঃখ দূর করতেই বর্তমান সরকার হাতে নিয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলমান প্রকল্পে সাত হাজার চারশ দুই কিলোমিটার এবং নতুন প্রকল্পে আরও ১২ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। প্রথম ধাপে ৫৪টি জেলায় একযোগে কাজ শুরু হচ্ছে। প্রতি কিলোমিটারে আনুমানিক ব্যয় ২০ লাখ টাকা ধরলে পুরো প্রকল্পে খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
সংখ্যাগুলো শুনতে বড়, কিন্তু এর সুফল কি সত্যিই মাটির মানুষের কাছে পৌঁছাবে? এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এবং এ প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ অতীত আমাদের হাতে বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা রেখে গেছে।
বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে খাল ও নদী খনন হয়েছিল, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। উত্তরাঞ্চলের একটি বড় প্রকল্পের কথাই ভাবা যাক, ব্যাপক খনন কাজের পরও শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশ প্রায় শুকিয়ে যায়। কারণটা সহজ, শুধু খনন করলেই হয় না, উজান থেকে পানির প্রবাহ না থাকলে খনন করা জলপথ দ্রুতই আবার শুকিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের নদী, খাল ও বিল একটি অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খল। বড় নদী থেকে পানি ছোট নদীতে যায়, সেখান থেকে খালে, তারপর বিল বা জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ চক্রের কোনো এক জায়গায় বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। যশোরের ভবদহ এর সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২১টি প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, কিন্তু সেখানকার ১০ লাখ মানুষের জলাবদ্ধতা আজও ঘোচেনি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না ফিরিয়ে দিলে কী ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে, ভবদহ তার জীবন্ত প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি মনে করি, এই নতুন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পরিকল্পনার গভীরতার অভাব। খনন করা মানেই সমস্যার সমাধান, এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন বিশেষজ্ঞ ঠিকই বলেছেন, ডিজাইন ছাড়া নাট-বল্টু জোড়া দিলে গাড়ি হয় না। খনন যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রকল্প শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু খনন যদি উপায় হয়, তাহলে সেই উপায় ব্যবহার করে ঠিক কী অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে, সেটা আগে পরিষ্কার করতে হবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই খুঁজে নিয়েছে। একটি দেশে চারটি প্রধান নদী পুনরুদ্ধারের সময় শুধু খনন নয়, সঙ্গে ১৬টি বড় জলাধার নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে বর্ষার পানি ধরে রাখা যায়। ইউরোপের একটি নিচু দেশ তাদের পানি ব্যবস্থাপনায় নদী, খাল ও জলাভূমিকে আলাদাভাবে না দেখে একটি সমন্বিত জলাধার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে একই অবকাঠামো দিয়ে তারা বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং পরিবেশ রক্ষা তিনটি কাজই করতে পারছে। বাংলাদেশের জন্যও দরকার এমন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে খাল খনন হবে একটি বৃহত্তর পানি ব্যবস্থাপনার অংশ, কেবল মাটি কাটার প্রকল্প নয়।
তবে একেবারে হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। বর্তমান কর্মসূচিতে কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্ট। খনন করা মাটি যাতে আবার খালে না পড়ে, সেই নির্দেশনা আছে, খালের দুই পাড়ে ফলগাছ রোপণের পরিকল্পনা আছে, শুধু যন্ত্র নয় স্থানীয় মানুষের হাতেও খনন করানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে। মাছ চাষ, হাঁস পালন, বনায়ন মিলিয়ে এটিকে একটি বহুমাত্রিক গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এগুলো ভালো লক্ষণ।
কিন্তু আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়। দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নতুন করে খনন করা খালও যে দ্রুত বেদখল হয়ে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যদি সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নীতি না থাকে, তাহলে ৪ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ কয়েক বছরের মধ্যে আবার মাটিতে মিশে যাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি খালের অগ্রগতি জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার কোনো স্বচ্ছ পদ্ধতি না থাকলে কাজের মান নিশ্চিত করাও কঠিন হবে।
সেদিন সাহাপাড়ায় বিনা পারিশ্রমিকে কোদাল হাতে খাল কাটতে আসা এক নারী বলেছিলেন, আজকে আমাদের খুশির দিন। সেই খুশি ধরে রাখতে হলে উদ্বোধনের আনন্দে থেমে থাকলে চলবে না। খাল খনন প্রয়োজনীয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা তখনই কার্যকর হবে যখন নদীর উৎস থেকে শুরু করে খাল, বিল ও জলাভূমি পর্যন্ত পুরো পানি ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা হবে।
পাঁচ দশকের ব্যবধানে কোদাল আবার মাটিতে পড়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আবেগের এক অসাধারণ মুহূর্ত। কিন্তু ইতিহাস শুধু আবেগে লেখা হয় না, লেখা হয় কাজে। সাহাপাড়ার সেই ১২ কিলোমিটার খাল যদি সত্যিই আবার প্রবহমান হয়, যদি লাখো মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়, যদি গ্রামের কৃষক বছরে দুটি ফসল ঘরে তুলতে পারে, তাহলে এই উদ্যোগ ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেবে। আর যদি এই খালও একদিন আবার ভরাট হয়ে যায়, তাহলে সেটা হবে ইতিহাসের সঙ্গে এক নিষ্ঠুর পরিহাস। সেই পরিহাস এড়ানোর দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণভাবে কর্তৃপক্ষের।
লেখক : মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনীতি বিশ্লেষক