গরু কেনা থেকে মাংস সংরক্ষণ, যেসব বিষয়ে জানা জরুরি
সাইদ আহম্মদ, শেকৃবি আর মাত্র কয়েকদিন পরই দেশজুড়ে পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। এরইমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন কোরবানির হাটে জমে উঠেছে পশু কেনাবেচা। তবে গরম আবহাওয়া, দীর্ঘ পথ পাড়ি আর অযত্নের কারণে হাটে আসা অনেক পশুই পড়ছে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। অনেক ক্রেতার মধ্যেও থাকে সুস্থ গরু চেনা, স্টেরয়েড ব্যবহার বুঝে ওঠা কিংবা কিনে আনার পর কীভাবে যত্ন নিতে হবে এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা। কোরবানির পশুর ব্যবস্থাপনা ঈদুল আজহায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখে-শুনে সুস্থ পশু চেনাটাও একটা ঝক্কির কাজ। রাজধানীসহ দেশের সব জায়গাতেই গরু, ছাগল, ভেড়াসহ এ ঈদে কোরবানি দেওয়া হয় লাখ লাখ পশু। এর মধ্যে মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে গরুকে ঘিরে। শরিকরা বা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে হাটে গিয়ে গরু কেনা এবং তা বাসা পর্যন্ত হাঁটিয়ে নিয়ে আসাই যেন ঈদের আগে আরেক উৎসব। ‘ভাই কত নিলো?’, ‘লালটা না কালোটা?’, ‘ভাই জিতছেন’ এই কথাগুলোরও উদ্ভব কোরবানির হাট থেকে নিয়ে আসা পছন্দের গরুটিকে কেন্দ্র করেই। সুস্থ গরুসহ অন্যান্য পশু চেনার উপায় ও এর মাংস সংরক্ষণ নিয়ে জাগো নিউজের প্রতিবেদক কথা বলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিম্যাল প্রোডাকশন অ্যান
সাইদ আহম্মদ, শেকৃবি
আর মাত্র কয়েকদিন পরই দেশজুড়ে পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। এরইমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন কোরবানির হাটে জমে উঠেছে পশু কেনাবেচা। তবে গরম আবহাওয়া, দীর্ঘ পথ পাড়ি আর অযত্নের কারণে হাটে আসা অনেক পশুই পড়ছে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। অনেক ক্রেতার মধ্যেও থাকে সুস্থ গরু চেনা, স্টেরয়েড ব্যবহার বুঝে ওঠা কিংবা কিনে আনার পর কীভাবে যত্ন নিতে হবে এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা।
কোরবানির পশুর ব্যবস্থাপনা ঈদুল আজহায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখে-শুনে সুস্থ পশু চেনাটাও একটা ঝক্কির কাজ। রাজধানীসহ দেশের সব জায়গাতেই গরু, ছাগল, ভেড়াসহ এ ঈদে কোরবানি দেওয়া হয় লাখ লাখ পশু। এর মধ্যে মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে গরুকে ঘিরে। শরিকরা বা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে হাটে গিয়ে গরু কেনা এবং তা বাসা পর্যন্ত হাঁটিয়ে নিয়ে আসাই যেন ঈদের আগে আরেক উৎসব।
‘ভাই কত নিলো?’, ‘লালটা না কালোটা?’, ‘ভাই জিতছেন’ এই কথাগুলোরও উদ্ভব কোরবানির হাট থেকে নিয়ে আসা পছন্দের গরুটিকে কেন্দ্র করেই। সুস্থ গরুসহ অন্যান্য পশু চেনার উপায় ও এর মাংস সংরক্ষণ নিয়ে জাগো নিউজের প্রতিবেদক কথা বলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিম্যাল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে।
হাটে গিয়ে সুস্থ গরু চেনার উপায় কী- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রথমত আমরা দেখবো গরুটি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে কি না। সুস্থ গরু সাধারণত অ্যালার্ট থাকে, কাছে গেলে সাড়া দেয়। চোখ উজ্জ্বল থাকবে, চামড়া মসৃণ থাকবে এবং শরীরের মাংসের বিন্যাস স্বাভাবিক থাকবে। কোথাও অস্বাভাবিক ফোলা বা দেবে যাওয়া থাকবে না। গরু লেজ নাড়াবে, খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখাবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় গরু বসে থাকতে পারে। তখন খেয়াল করতে হবে সে জাবর কাটছে কি না এবং দাঁড় করাতে চাইলে সহজে উঠতে পারছে কি না। দাঁড়াতে বেশি সময় নিলে সেটি অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। পাশাপাশি গোবরও দেখতে হবে। সুস্থ গরুর গোবর খুব বেশি পাতলা বা শক্ত হবে না। এছাড়া, সুস্থ গরুর নাকের কালো অংশ ভেজা ও চকচকে থাকে।
বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে জোর
চলতি বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘স্টেরয়েড ও হরমোনমুক্ত’ হৃষ্টপুষ্ট ও সুস্থ গরু ও মহিষ সরবরাহ নিশ্চিত করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ৩ হাজার ৬৭৮টি কোরবানি পশুর হাটে ১৯ হাজার ৯৮টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে বলে নিশ্চিত করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞরা সবসময়ই কৃত্রিম পদ্ধতির পরিবর্তে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও সম্ভব হলে বেশিরভাগ সময় প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দেন। তারপরও স্থানীয় কিছু খামারি, ব্যবসায়ী ও গ্রাম্য পশুচিকিৎসক দ্রুত লাভের আশায় এই ক্ষতিকর ও অবৈধ পদ্ধতি বেছে নেন।
স্টেরয়েড ব্যবহার করা গরু কীভাবে চেনা যাবে- এ প্রশ্ন করা হলে প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সরকার স্টেরয়েডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। অধিকাংশ খামারি স্বাভাবিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করেন। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এখনও স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। এ ধরনের গরুর মধ্যে অলসতা বা অবসাদ দেখা যায়। অনেক সময় শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং মাংসের স্বাভাবিক বিন্যাস থাকে না। বিশেষ করে রানের মাংসে চাপ দিলে দেবে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। অতিরিক্ত স্টেরয়েড ব্যবহারে কোরবানির পশু মারাও যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, তবে শুধু স্ট্রেস দেখেই স্টেরয়েড বলা যাবে না। গরমের সময় বড় গরুগুলো স্বাভাবিকভাবেও হিট স্ট্রেসে থাকতে পারে।
আরও পড়ুন
একটু আগে কিনলে গরু নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে এবং স্ট্রেস কম হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সাধারণত ঈদের এক দুই দিন আগে গরু কিনে আনি। সবচেয়ে ভালো হয় যে খামারি থেকে গরু কেনা হয়েছে তার কাছ থেকে খাদ্যতালিকা জেনে নেওয়া। একই ধরনের খাবার দিলে গরু সহজে মানিয়ে নিতে পারে। এ সময় দানাদার খাবার কম দিয়ে ঘাসজাতীয় খাবার বেশি দিতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন গরু হিট স্ট্রেসে না পড়ে।
কোরবানির সময় জবাই ও পরে মাংস সংরক্ষণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ প্রসঙ্গে ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন প্রচণ্ড গরম। তাই জবাইয়ের স্থান অবশ্যই ঠান্ডা ও পরিষ্কার হতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় মাংস প্রসেস করার সময় রক্ত পুরোপুরি বের হয় না। এতে মাংসের গুণগত মান নষ্ট হয়। এজন্য, মাংস ঝুলিয়ে প্রসেস করতে হবে যেন রক্ত নিচে পড়ে যায়। জবাইয়ের প্রায় ১২ ঘণ্টা আগে খাবার বন্ধ রাখা ভালো। এতে মাংসের গুণগত মান ঠিক থাকে। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে রাখা ভালো। একবার ফ্রিজ থেকে বের করা মাংস পুনরায় জমিয়ে রাখা ঠিক না। এতে মাংসের গুণগত মান কমে যায়।
গরম ও স্ট্রেসে গরুর হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি
কোরবানির প্রাণীর স্বাস্থ্যঝুঁকি, হিটস্ট্রোক এবং সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কথা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষক ডা. মো. খাইরুল ইসলামের সঙ্গে। কোরবানির হাটে গরুর হিটস্ট্রোক কেন হয়- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রাম থেকে ঢাকায় গরু আনতে ১০-১২ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় লাগে। গরম আবহাওয়া, দীর্ঘ জার্নি ও না খেয়ে থাকার কারণে প্রাণীর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। পানিশূন্যতা দেখা দেয়, শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায় এবং মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় গরুর শরীরে ব্যথা, জ্বর, পা ফুলে যাওয়া এমনকি ক্ষতও দেখা দিতে পারে। গরম ও স্ট্রেসের কারণে গরু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে হিটস্ট্রোকের চান্স বেশি থাকে।
ডা. মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, হিটস্ট্রোক হলে গরুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, হাঁপাতে থাকে, মুখ দিয়ে লালা ঝরে, খাবার খেতে চায় না এবং দাঁড়াতে না পেরে শুয়ে পড়ে।
এমন অবস্থা হলে তখন কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ অবস্থায় কোনোভাবেই সঙ্গে সঙ্গে গোসল করানো যাবে না। এতে অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে, এমনকি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হতে পারে। প্রথমে গরুকে ঠান্ডা স্থানে নিতে হবে, স্যালাইন খাওয়াতে হবে। অনেক সময় গমের ময়দা স্যালাইনের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে উপকার পাওয়া যায়। কিছুটা স্বাভাবিক হলে ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। পরে অবস্থা স্থিতিশীল হলে গোসল করানো যেতে পারে।
সংক্রামক রোগ নিয়ে সচেতনতা জরুরি
কোরবানির হাটগুলোতে অসংখ্য মানুষের সমাগম, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পশু পরিবহন এবং অসুস্থ প্রাণী শনাক্তে অসচেতনতার কারণে এ সময় গবাদিপশুবাহিত সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। কোরবানির হাটগুলোতে এসব রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি, প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন এক মাথা ঘামাননা সাধারণ মানুষরা।
আরও পড়ুন
দেশে গত এক বছরের মধ্যে সংক্রামক রোগ অ্যানথ্রাক্সের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি এক্ষেত্রে একটি ভয়ের ব্যাপার। গত বছর রংপুর ও গাইবান্ধার পর মেহেরপুর জেলাতেও এ রোগে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ রোগে আক্রান্ত কয়েকজন মারাও যান। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমানে হাটগুলোতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কতটা- এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, হাটে গাদাগাদি করে পশু রাখার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বর্তমানে দেশে খুরা রোগ (এফএমডি) এবং লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, খুরা রোগে পশুর মুখ, জিহ্বা ও খুরের মাঝে ঘা হয়। আর এলএসডিতে শরীরে গুটি দেখা যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত প্রাণীকে দ্রুত আলাদা করে ফেলতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন হাটে আমাদের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য যেসব চিকিৎসক হাটে উপস্থিত থাকবেন তাদের শরনাপন্ন হয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
গাভী কোরবানি দেওয়া যাবে কি না এ ব্যাপারে তিনি বলেন, গাভী কোরবানি দিতে কোনো বাধা নেই তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন সেটা প্রেগন্যান্ট না হয়। প্রেগনেন্সি টেস্ট করানোর জন্য প্রাণিটির হিস্ট্রি নিতে হবে, আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হবে অথবা ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করা যেতে পারে। গাভীটি প্রেগন্যান্ট নয় এটা নিশ্চিত হওয়ার পরেই কুরবানির জন্য নির্বাচন করা যাবে, নচেৎ নয়।
এমডিএসএ/এএমএ
What's Your Reaction?