গৌরাঙ্গ মোহান্তের গদ্যকবিতা—  নিশ্চলতার ভেতর...

বাতাসের নিশ্চলতার ভেতর থেমে যায় আহ্ণিক গতি। পৃথিবীর স্তব্ধতার পাশে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য মাঠের দিকে হাত বাড়িয়ে দিই—পদ্মসৌরভ থেকে উষ্ণ ধ্বনি বেরিয়ে আসে, আমার প্রত্যেকটি আঙুলে নেচে ওঠে পত্রাঙ্কুর। তাদের দারুচিনিবর্ণ থেকে সুর ফোটে, আমি চোখ বন্ধ করি—অন্তঃশ্রবণ আমার সমগ্র সত্তা হয়ে ওঠে। চোখ খুলে দেখি আমার সামনে ঘুমিয়ে আছে আবছা অরণ্য। দুয়েকটি পাখি সময়কে বেগশীল করে তোলে। আমার অস্তিত্ব থেকে ঝরে পড়ে মিথ্যা কোলাহল। অদৃশ্য সঞ্চারপথে তুমি ভেসে আসো, তোমার দেহের অদৃশ্যতাকে আমি স্পর্শ করি।  নিস্তব্ধতার ভেতর তুমি স্বরময় হয়ে ওঠো। তোমার অনুপস্থিতির অর্থ স্পষ্ট হয় ওঠে। তুমি দীর্ঘতম পথের মূঢ়তা উন্মোচন করেছো। যে কোনো সময় আমার ইঙ্গিতময় প্রশ্নের উত্তর দিতে জানো—উত্তরের জন্য তোমাকে স্বরযন্ত্রীর অপেক্ষায় থাকতে হয় না। আমি নিশ্চিত, বাজিকরের খেলা তোমার কাছে গুরুত্বহীন। যে ভাষায় বাক্যগুলো অন্ধকার আর আলোর সংগমস্থলে জেগে ওঠে তার কোনো ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই। পদ্মসত্তার ভেতরে থাকে সঙ্গীত প্রবাহ আর সে প্রবাহ ভাষাকে শ্রুতিগম্য করে তোলে। আমি যা স্পর্শ করি তা সংবেদন সূত্রে আবদ্ধ নয়, অশ্রুত জীবনক্রন্দনের ভেতর তা জাগ্রত।

গৌরাঙ্গ মোহান্তের গদ্যকবিতা—   নিশ্চলতার ভেতর...

বাতাসের নিশ্চলতার ভেতর থেমে যায় আহ্ণিক গতি। পৃথিবীর স্তব্ধতার পাশে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য মাঠের দিকে হাত বাড়িয়ে দিই—পদ্মসৌরভ থেকে উষ্ণ ধ্বনি বেরিয়ে আসে, আমার প্রত্যেকটি আঙুলে নেচে ওঠে পত্রাঙ্কুর। তাদের দারুচিনিবর্ণ থেকে সুর ফোটে, আমি চোখ বন্ধ করি—অন্তঃশ্রবণ আমার সমগ্র সত্তা হয়ে ওঠে।

চোখ খুলে দেখি আমার সামনে ঘুমিয়ে আছে আবছা অরণ্য। দুয়েকটি পাখি সময়কে বেগশীল করে তোলে। আমার অস্তিত্ব থেকে ঝরে পড়ে মিথ্যা কোলাহল। অদৃশ্য সঞ্চারপথে তুমি ভেসে আসো, তোমার দেহের অদৃশ্যতাকে আমি স্পর্শ করি। 

নিস্তব্ধতার ভেতর তুমি স্বরময় হয়ে ওঠো। তোমার অনুপস্থিতির অর্থ স্পষ্ট হয় ওঠে। তুমি দীর্ঘতম পথের মূঢ়তা উন্মোচন করেছো। যে কোনো সময় আমার ইঙ্গিতময় প্রশ্নের উত্তর দিতে জানো—উত্তরের জন্য তোমাকে স্বরযন্ত্রীর অপেক্ষায় থাকতে হয় না। আমি নিশ্চিত, বাজিকরের খেলা তোমার কাছে গুরুত্বহীন।

যে ভাষায় বাক্যগুলো অন্ধকার আর আলোর সংগমস্থলে জেগে ওঠে তার কোনো ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই। পদ্মসত্তার ভেতরে থাকে সঙ্গীত প্রবাহ আর সে প্রবাহ ভাষাকে শ্রুতিগম্য করে তোলে। আমি যা স্পর্শ করি তা সংবেদন সূত্রে আবদ্ধ নয়, অশ্রুত জীবনক্রন্দনের ভেতর তা জাগ্রত।


কোথাও শব্দের স্বনন নেই

শেষ দিনে পিতামহ সূর্যের আলোয় শুয়ে একটু হেসেছিলেন। একটি ঝাপসা ফটোগ্রাফে তার স্ফীত গালের দিকে অনেক দিন আমার দৃষ্টি পড়েছে। জীবনধারণের যুদ্ধ বড় যন্ত্রণাকর। পিতামহের যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক আগে মা মৃত্তিকার সাথে মিশে গেছেন। সার্সির কোনো নেক্রোম্যানটিক ক্রিয়া তাদের স্বরনালিকে আর সমুচ্ছল করতে পারবে না।

আমি শালবনের পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছি। ঝরা পাতার গানে রাস্তা মুখরিত। অদৃশ্য হাওয়ায় ভেসে চলে পৃথিবী। স্তব্ধতা থেকে জঙ্গমতার দিকে যেতে যেতে পুনশ্চ স্তব্ধতার ভেতর মহাকাশ দাঁড়িয়ে থাকে; কোথাও শব্দের স্বনন নেই বলে মনে হচ্ছে। স্তব্ধতার ভেতর শব্দের শ্রাব্যতা নিঃশেষিত—অহল্যার জমাট-বাঁধা ধ্বনির সাথে ওড়ে পথের ধুলো।

আমি একটি রাস্তার তেমাথায় দাঁড়িয়ে ভূ-প্রকৃতি নিরীক্ষণ করি। দূরে অগ্নিকুণ্ড থেকে ধোঁয়া উদ্গিরিত হচ্ছে; কোথাও ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মিত হচ্ছে বাড়ি। হারিয়ে যাওয়া কোনো সঙ্গীত মেঘের পেছনে ছুটে চলেছে। শব্দহীন পাখি কিংবা বিভ্রমের দিকে তাকিয়ে আমি বিস্মিত হলাম। এ বিস্ময়ের সম্ভাব্য অর্থ আমার গতিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য শ্লথ করে তুললো।

অস্তিস্তহীন সত্তায় আন্দোলিত হওয়ার অর্থ খুঁজি। আন্দোলিত হওয়ার পর এরূপ সত্তার প্রভাব বাড়তে থাকে। তখন পৃথিবীর ভেতর একটি ভূমণ্ডল বিস্তৃত হয় এবং কোনো বাসস্থানেই গৃহ নির্মাণ করা সম্ভব হয় না।

আকাশে আবির্ভূত হলো অগ্নিময় উল্কারেখা; কয়েক সেকেন্ডের ভেতর রেখাটির অস্তিত্ব হারিয়ে গেলো। বাতাসের উত্তপ্ত অণুর আন্দোলন কতো দূর বিস্তৃত হতে পারে ভাবলাম।দহনের পর ঘনিয়ে আসে শৈত্য। নিস্তব্ধতার ভেতর শ্রুত হলো তালারিয়ার অস্পষ্ট ধ্বনি। হার্মিজের বার্তা সুবোধ্য নয় বলে মনে হলো।
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow