চউকের ফাইলবন্দি দুর্নীতি, ইলিয়াসের ‘আলাদিনের চেরাগ’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে ঘিরে নকশা অনুমোদন জালিয়াতি, সরকারি জমি আত্মসাৎ, পাহাড় কাটা এবং ফাইলবন্দি হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চউকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২০ মার্চ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চউকে যোগদান করেন এ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গভাবে এ দায়িত্বে নিয়োজিত হন। ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর ড্যাপ, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইনের লঙ্ঘন করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নকশা অনুমোদনের এক ধরনের ‘মহোৎসব’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকাকালে ড্যাপ, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে নকশা অনুমোদনে অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা, সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় দেখানো, জাল খতিয়ান ব্যবহার ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরও দুদক কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে, যা ন

চউকের ফাইলবন্দি দুর্নীতি, ইলিয়াসের ‘আলাদিনের চেরাগ’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে ঘিরে নকশা অনুমোদন জালিয়াতি, সরকারি জমি আত্মসাৎ, পাহাড় কাটা এবং ফাইলবন্দি হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

চউকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২০ মার্চ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চউকে যোগদান করেন এ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গভাবে এ দায়িত্বে নিয়োজিত হন।

২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর ড্যাপ, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইনের লঙ্ঘন করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নকশা অনুমোদনের এক ধরনের ‘মহোৎসব’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকাকালে ড্যাপ, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে নকশা অনুমোদনে অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা, সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় দেখানো, জাল খতিয়ান ব্যবহার ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরও দুদক কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে, যা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, নগরীর অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা জামালখান আসকার দিঘির পাড়ে সংরক্ষিত পাহাড়ের ঢাল কেটে ১৪ তলা আবাসিক ভবনের অনুমোদনের অভিযোগ এই অনিয়মের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসে। অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই মোহাম্মদ ইলিয়াস ওই ভবনের চূড়ান্ত নকশা অনুমোদন দেন, যার নির্মাণ অনুমোদন নম্বর ২৫.৪৭.১৫০০.০৭৩.৪৩.১৭০.২৩। ড্যাপের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা নীতিমালা উপেক্ষা করে দেওয়া এই অনুমোদনকে সংশ্লিষ্টরা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্বপ্নীল আবাসন প্রকল্পে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয়।

একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্ত কমিটি নকশা বাতিলের সুপারিশ করলেও যিনি এই অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই অথরাইজড অফিসার ইলিয়াসের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতার নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই প্রকল্পের কারণে ৯২টি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, যারা জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে সেখানে আবাসনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

চউক সূত্রে জানা গেছে, আগ্রাবাদ বাদামতলী দাল্লা মেডিকেলের পেছনে অবস্থিত ‘মুনতাসির বিল্ডিং লিমিটেড’-এর ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী, কোনো বৈধ প্রবেশপথ বা নিজস্ব রাস্তা না থাকা সত্ত্বেও ভবনটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন জমিকে ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে এবং কোনো অনাপত্তি ছাড়াই ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর এই অনুমোদন দেওয়া হয়, যার নথি নম্বর ২৫.৪৭.১৫.০৭৩.৪৩.১৯১.২৩। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, এই একটি ফাইল থেকেই মোটা অংকের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির দিকটিও উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে, কারণ নিয়ম মেনে অনুমোদন হলে এককালীন বড় অঙ্কের ফি এবং ভবনের চলাচল পথ বাবদ নিয়মিত মাসিক রাজস্ব সরকার পেতে পারত, যা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে নগরের দক্ষিণ কাট্টলী এলাকার বিসি কেইস নম্বর ৭২২/২০২০–২০২১ ঘিরে, যেখানে সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে নকশা অনুমোদনের আবেদন করা হয়। নুরুল মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির আবেদনের বিষয়ে তৎকালীন ইমারত পরিদর্শক স্বপন কুমার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়ে খতিয়ান (নং ৬০৭৬, বিএস দাগ নং ১২৭২০) এসি (ল্যান্ড) অফিসে যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর সুপারিশ করেন।

তবে অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইলিয়াস ক্ষমতার অপব্যবহার করে আরেকটি জাল বিএস খতিয়ান (খতিয়ান নং ১৪৭৯/১,বিএস দাগ নং ৬৮৪৩ ও ৬৮৪৪) প্রস্তুত করিয়ে নকশা অনুমোদন করান এবং পরে অন্য ইমারত পরিদর্শক মো. আবু জাফর ইকবালকে ব্যবহার করে বেইজমেন্ট ১৩ তলা ভবনের নকশা পাস করিয়ে দেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তরের অভিযোগও উঠেছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের স্থায়ী ক্ষতির শামিল বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সকল অভিযোগের পাশাপাশি মোহাম্মদ ইলিয়াসের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও রয়েছে। তিনি দায়িত্ব পালনকালে হালিশহর এসি মসজিদ এলাকার ‘ডিজাইন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কনসালটিং ফার্ম পরিচালনা করতেন। ফলে যে কর্মকর্তা নকশা অনুমোদনের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখেন, তার নিজস্ব ফার্মই নকশা তৈরি ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, হালিশহর এলাকার ছোট জমিতে বড় ভবন নির্মাণের বহু বিতর্কিত ফাইল এই ফার্মের মাধ্যমে জমা দিলে দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যেত।

এছাড়া অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দেশের বাহিরে অবস্থানরত আত্মীয়দের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো বলে অভিযোগ উঠে সংশ্লিষ্ট মহলে, পরবর্তীতে সেই অর্থ আবার দেশে বৈধ রেমিট্যান্স হিসেবে ফিরে এসে সম্পত্তি ক্রয়ে ব্যবহৃত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সোনালী আবাসিক এলাকার ১ নম্বর রোডের ৪৫ ও ৪৭ নম্বরে মা ও শাশুড়ির নামে ফাতেমা মঞ্জিল ও রোকসানা মঞ্জিল নামে দুটি সাততলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তিনি আগে ২০ নম্বর রোডে শ্বশুরের শাহী ভবনে বসবাস করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা সংক্রান্ত মামলার তথ্যও রয়েছে, যেখানে আকবর শাহ থানার লেক সিটি আবাসিক এলাকায় শাশুড়ি রোকসানা বেগমের নামে কেনা প্লটে (বিএস দাগ নং ১৭৯, ১৮০) টিলা কাটার অভিযোগে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী মামলা দায়ের করে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তিনি ঘ-১১-২৬৮৮ নম্বরের একটি নিশান এক্সট্রেইল গাড়ি ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল-আমিন কালবেলাকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আমাদের কাছে আসে, সেগুলো নিয়ে কাজ করতে দুদক কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করে থাকি।’

আইনগত দিক থেকে অভিযোগগুলোর মধ্যে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন,১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৬১ ও ১৬৫ ধারা, ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ধারাসহ একাধিক ফৌজদারি বিধান প্রযোজ্য হতে পারে বলে আইনজ্ঞদের মত রয়েছে। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৫২-এর ৬(খ) ধারা, ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর ১৭ ও ৩১ বিধির লঙ্ঘনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইলিয়াস নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, দায়িত্বকালীন সময়ে হাজারের বেশি ভবনের অনুমোদন দিয়েছেন এবং কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেননি। আত্মীয়রা প্রবাসে থাকায় নিজেদের অর্থে সম্পত্তি কিনেছেন এবং তিনি এসবের মালিক নন বলে দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরির সীমিত বেতনে চলা কঠিন হওয়ায় বিকেল ৫টার পর এক বন্ধুর কনসালটিং ফার্মে সময় দিতেন, যা তার ভাষ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারের জন্য।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, সিডিএতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়তে আমরা কাজ করছি।

মোহাম্মদ ইলিয়াস বর্তমানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের পরও তিনি সংস্থাটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow