চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে নিত্যপণ্যের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা সাত দিন ধর্মঘটে অনেকটাই অচল ছিল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এ সাতদিনে সমস্ত পণ্য উঠা-নামা বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। সোমবার থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রমজানের ভোগ্যপণ্যে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, চিনি ও সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে গত সপ্তাহের তুলনায়। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি যাচ্ছে খুচরা ক্রেতাদের কাছে। শুধু এ ৩ পণ্যই নয়, প্যাকেটজাত খাবারের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় বেশি। দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, সেই বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ চেইন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইফতার ও সাহরির টেবিলে খাবার থাকবে কি না, বাজারে দাম কত বাড়বে এই প্রশ্নই এখন মানুষের মুখে মুখে। সচেতন মহল বলছেন, দাবি থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে কোনো আন্দোলন ন্যায়সংগত হতে পারে না। রমজানে বাজার অস্থিতিশীল হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না- এই বার্তাই এখন ক্রম
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা সাত দিন ধর্মঘটে অনেকটাই অচল ছিল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এ সাতদিনে সমস্ত পণ্য উঠা-নামা বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। সোমবার থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রমজানের ভোগ্যপণ্যে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, চিনি ও সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে গত সপ্তাহের তুলনায়। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি যাচ্ছে খুচরা ক্রেতাদের কাছে। শুধু এ ৩ পণ্যই নয়, প্যাকেটজাত খাবারের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় বেশি।
দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, সেই বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ চেইন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইফতার ও সাহরির টেবিলে খাবার থাকবে কি না, বাজারে দাম কত বাড়বে এই প্রশ্নই এখন মানুষের মুখে মুখে।
সচেতন মহল বলছেন, দাবি থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে কোনো আন্দোলন ন্যায়সংগত হতে পারে না। রমজানে বাজার অস্থিতিশীল হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না- এই বার্তাই এখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি শুরু হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে তা অনির্দিষ্টকালের লাগাতার কর্মসূচিতে রূপ নেয়। এর ফলে বন্দরের প্রায় সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস, ডেলিভারি, রপ্তানি পণ্যের শিপমেন্ট-সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। বহির্নোঙরে নোঙর করা জাহাজগুলো থেকেও পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যায়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানি খাতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
এই টানা অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সরকার বা কোনো বিদেশি কোম্পানি নয়- ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কারণ রমজানকে সামনে রেখে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বড় একটি অংশ এই বন্দরের মাধ্যমেই দেশে আসে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, খেজুর, পেঁয়াজ, গমসহ রমজানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সব নিত্যপণ্যের আমদানি ও খালাস সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বন্দরে কনটেইনার আটকে থাকার ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয় এবং এর সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু জেটি ও বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হয়নি। ক্রেন ও বার্থ অপারেশন বন্ধ থাকায় বন্দরের ইয়ার্ড ও শেডে ছয় দিনের বেশি সময় ধরে ৫০ থেকে ৬০ হাজার কনটেইনার আটকে পড়ে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য এতে স্থবির হয়ে গেছে, যার প্রভাব সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সফর করেন। তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, পবিত্র রমজানের আগে বন্দর বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। আপনাদের কথা আমি শুনব, কিন্তু আপনাদেরও আমার কথা শুনতে হবে।'উপদেষ্টার আশ্বাসের পর শ্রমিক নেতারা ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। তবে সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হতেই ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হয় এবং বন্দর ফের অচল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগ ও নগর কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, শ্রমিক–কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বিবৃতিতে বলা হয়, বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি ও খেজুরের মতো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে সাধারণ ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি আলহাজ আবদুল মান্নান ও ক্যাব যুব গ্রুপ চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফ নোমান।
ক্যাব নেতারা তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগমুহূর্তে টানা ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধ মিলিয়ে রমজানের আগে বন্দরের কার্যদিবস এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে যদি শ্রমিক আন্দোলনের কারণে পণ্য খালাস বন্ধ থাকে, তাহলে বাজারে অস্থিরতা অনিবার্য। তারা বলেন, প্রতিবছর রমজান এলেই একটি অসাধু সিন্ডিকেট পণ্য মজুত করে দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। বন্দরের অচলাবস্থা সেই সিন্ডিকেটকে নতুন অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। রমজান নাজাতের মাস হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা কষ্টের মাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এক চিঠিতে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ১৫ জন কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি ও তাদের স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-কে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এই কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির ও মো. ইব্রাহিম খোকনসহ মোট ১৫ জন। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি তাদের মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই বদলি ও তদন্তমূলক পদক্ষেপের কারণেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা অচল করে জনগণের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করার কোনো অধিকার কারও নেই।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বন্দর নয়, এটি দেশের কৃষক, শিল্পপতি, রপ্তানিকারক ও ভোক্তার জীবনরেখা। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একাই বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে এবং ২০২৫ সালে এই টার্মিনাল সিপিএর রাজস্ব আয়ে হাজার কোটি টাকার বেশি অবদান রেখেছে। এই টার্মিনাল অচল মানেই দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার বড় অংশ স্থবির হয়ে যাওয়া।
What's Your Reaction?